ব্রেকিং নিউজ
যুবলীগ নেতা হত্যায় ২৩ জনকে আসামি করে মামলা গ্রামবাসীর ধাওয়ায় অস্ত্র ফেলে পালাল বিএসএফ, ফেরত দিল বিজিবি যুক্তরাষ্ট্রে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির মামলা মীমাংসায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের রফা মেটার নেপালে ভয়াবহ বন্যায় কেমন আছেন অপু বিশ্বাসসহ পুরো শুটিং ইউনিট শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণের আহ্বান পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ২৫ যে কারণে নেপালে ঘটলো ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর ছাত্রদল নেতা আজীবনের জন্য বহিষ্কার কিশোরগঞ্জে ফেসবুকে ‘পরাজিত’ লিখে কলেজ ছাত্রের আত্মহত্যা জবিতে ৮ বিভাগে ১৪ শিক্ষক নিয়োগ, আবেদন শেষ ১৬ সেপ্টেম্বর
জাতীয়

আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট জনসংখ্যা নাকি সুশাসন?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
একসময় বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও দরিদ্র দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশ্লেষণে প্রায়ই বলা হতো, এত সীমিত ভূখণ্ডে এত বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিদেশি অর্থনীতিবিদদের অনেকেই জনসংখ্যাকে দেশের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলেছে। যে দেশকে একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অবজ্ঞা করা হয়েছিল, সেই দেশই আজ খাদ্য উৎপাদন, তৈরি পোশাকশিল্প, নারীর ক্ষমতায়ন, টিকাদান কর্মসূচি, ক্ষুদ্রঋণ এবং মানব উন্নয়নের নানা সূচকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জনসংখ্যা নিজে কখনো সংকট নয়; সংকট হলো সেই জনসংখ্যাকে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে সম্পদে রূপান্তর করতে না পারা। আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই জনসংখ্যার আকার নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মান। আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সুশাসন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সচেতনতা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দেশের মোট প্রজনন হার প্রতিস্থাপন-স্তরের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা বিস্ফোরণের যে আশঙ্কা একসময় ছিল, তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু একই সময়ে নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে—দ্রুত নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সুশাসন বলতে কেবল দুর্নীতির অনুপস্থিতিকে বোঝায় না। এটি একটি বিস্তৃত ধারণা, যার মধ্যে রয়েছে আইনের শাসন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষ প্রশাসন, ন্যায়ভিত্তিক সেবা, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। বিশ্বব্যাংক বহু বছর ধরে Worldwide Governance Indicators-এ যে ছয়টি সূচকের কথা বলছে—জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারি কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রণের মান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—এসবই মূলত একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, দারিদ্র্য হ্রাস, ডিজিটাল সেবা এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের গতি যত বাড়ছে, সুশাসনের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। কারণ উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। দুর্বল প্রতিষ্ঠান নিয়ে বড় অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হলেও সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সুশাসনের প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায়। একজন মানুষ জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে ভূমি রেকর্ড, পুলিশি সেবা, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা, পৌরসেবা কিংবা কর প্রদান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। যদি এসব সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা, অসচ্ছতা, দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বিশ্বব্যাংক এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের বিভিন্ন সূচক বহু বছর ধরে দেখিয়ে আসছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দুর্নীতি ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অন্যতম বড় বাধা। বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। দুর্নীতি শুধু অর্থের অপচয় ঘটায় না; এটি যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবকে প্রতিষ্ঠিত করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, সেবার মান কমায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। বাংলাদেশের আগামী দিনের ইতিহাস নির্ধারিত হবে জনসংখ্যার সংখ্যা দিয়ে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার গুণগত মান দিয়ে। উন্নয়নের নতুন যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে বিশ্বাস—নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস, বিনিয়োগকারীর নীতির প্রতি বিশ্বাস এবং তরুণের ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস গড়ে ওঠে কেবল সুশাসনের ভিত্তির ওপর। শুধু দুর্নীতিই নয়, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সরকার উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করল, আরেকটি এসে তা পরিবর্তন করল—এভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতাই তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় সুযোগ হলো জনমিতিক সুবিধা বা Demographic Dividend। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী আগামী দুই দশক পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় শক্তি হতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান। অন্যথায় এই তরুণ জনগোষ্ঠীই বেকারত্ব, হতাশা এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং সংকট জনসংখ্যা নয়; সংকট সেই জনসংখ্যাকে দক্ষ সম্পদে রূপান্তর করার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি সেবার অনেক ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি একাই সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না। যদি ডিজিটাল ব্যবস্থার পেছনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কাগজের দুর্নীতি ডিজিটাল দুর্নীতিতে রূপ নিতে পারে। প্রযুক্তির সঙ্গে স্বচ্ছতা, তথ্যের উন্মুক্ততা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। বিচারব্যবস্থার দক্ষতা এবং স্বাধীনতাও সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট কিংবা ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। একইভাবে প্রশাসনে মেধা, পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করাও সময়ের দাবি। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি থাকে। এতে নাগরিকের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং সেবা মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বাংলাদেশেও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে আরও সক্ষম করা প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তথ্যের স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী গণমাধ্যম। স্বাধীন সাংবাদিকতা শুধু সরকারের সমালোচনা করে না; বরং রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করে। একইভাবে নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আজকের বিশ্বে বিনিয়োগকারীরা শুধু কম শ্রমমূল্য বা বড় বাজার দেখেন না; তাঁরা আইনের শাসন, নীতির স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশও বিবেচনা করেন। অর্থাৎ সুশাসন এখন কেবল রাজনৈতিক আদর্শ নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতারও অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা শুধু অর্থ বরাদ্দ বা উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন তথ্যনির্ভর নীতি, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। অর্থাৎ সুশাসনই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ সুশাসনের পথও তেমনই কঠিন। কারণ এটি কেবল আইন প্রণয়ন নয়; এটি ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। এটি কেবল দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার, যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে; আনুগত্য নয়, যোগ্যতা মূল্যায়িত হবে; এবং সুবিধাভোগী নয়, নাগরিক হবে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের আগামী দিনের ইতিহাস নির্ধারিত হবে জনসংখ্যার সংখ্যা দিয়ে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার গুণগত মান দিয়ে। উন্নয়নের নতুন যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে বিশ্বাস—নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস, বিনিয়োগকারীর নীতির প্রতি বিশ্বাস এবং তরুণের ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস গড়ে ওঠে কেবল সুশাসনের ভিত্তির ওপর। তাই আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট জনসংখ্যা নয়; সুশাসনের ঘাটতি। আর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাও সেখানেই—যদি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, যেখানে উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোয় নয়, প্রতিষ্ঠানেও দৃশ্যমান হবে; শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে নয়, প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং আস্থায় প্রতিফলিত হবে। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। | drharun.press@gmail.com এইচআর/এমএফএ/জেআইএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>