বিজ্ঞাপন
রাস্তায় তাকে সবাই চিনতো ‘নূর’ নামে। কখনো ব্যস্ত সড়কের মোড়ে দাঁড়িয়ে, কখনো মসজিদের বাইরে বসে পথচারীদের কাছে হাত পাততেন তিনি। বয়স বাড়লেও বদলায়নি তার জীবনযাপন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবেই কেটে গেছে।
প্রায় ৪০ বছর ধরে ভিক্ষা করেই জীবন কাটিয়েছেন ভারতের কর্ণাটকের মান্ডিয়ার ৭০ বছর বয়সী নূরুন্নিসা। স্থানীয়দের চোখে তিনি ছিলেন অসহায় এক নারী। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায়ও ভুগছিলেন।
কিন্তু মৃত্যুর পর তার ঘর থেকে যা পাওয়া গেল, তাতে হতবাক পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিবেশীরা। একটি তালাবদ্ধ কক্ষের ভেতর ১০টি বস্তায় পাওয়া গেল ৮ লাখ ৪০ হাজার রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ টাকা। এখানে ১ ভারতীয় রুপি সামান ১.২৯ বাংলাদেশি টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে।
শেষ কয়েক দিন তাকে দেখা যায়নি
নূরুন্নিসা একাই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তার অবিবাহিত বোন দুই বছর আগে মারা যাওয়ার পর আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন তিনি।
রোববার প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়, কয়েক দিন ধরে নূরুন্নিসাকে বাইরে দেখা যাচ্ছে না। তারা বিষয়টি স্বজনদের জানান।
পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে নূরুন্নিসাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
এরপর শুরু হয় ঘর পরিষ্কার করার কাজ। একপর্যায়ে স্বজনদের নজরে আসে একটি আলাদা কক্ষ। বহু বছর ধরে কক্ষটির দরজা তালাবদ্ধ থাকতো।
নূরুন্নিসা কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতেন না।
স্বজনেরা তালা ভেঙে কক্ষটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে কয়েকটি বস্তা। খুলে দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে জমা রয়েছে বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা কয়েন ও নোট।
প্রথমে পরিবারের সদস্যরাও বুঝতে পারেননি, সেখানে আসলে কত টাকা রয়েছে।
গুজব ছড়াল কোটি টাকার
টাকার বস্তাগুলো সাময়িকভাবে স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের আসার অপেক্ষায় সেখানে টাকা নিরাপদে রাখা ও গোনার ব্যবস্থা করা হয়।
এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। কেউ কেউ দাবি করেন, নূরুন্নিসার ঘরে ১ কোটি রুপির বেশি পাওয়া গেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই দাবি সত্যি হয়নি।
দুই দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সামনে গোনার পর মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, মোট অর্থের পরিমাণ ৮ লাখ ৪০ হাজার রুপি।
স্থানীয় মসজিদের সহসভাপতি মুক্তার আহমেদ বলেন, পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই অর্থ গোনা হয়েছে। পরে পুরো অর্থ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের কাছেও ছিল অজানা
নূরুন্নিসা ছিলেন ছয় ভাইবোনের একজন। পরিবার তার সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগহীন ছিল না। স্বজনেরা মাঝেমধ্যে তার কাছে যেতেন, খাবার দিতেন এবং গোসল করতেও সাহায্য করতেন।
কিন্তু এত বছরের ভিক্ষা থেকে তিনি যে এত টাকা জমিয়েছেন, তা ছিল সবার অজানা।
তার ভাগনে ফিরোজ আহমেদ বলেন, যে ঘরে টাকা পাওয়া গেছে, সেটি সবসময় তালাবদ্ধ থাকত।
নূরুন্নিসা কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতেন না। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কথা বলতেন।
পরিবার তাঁকে বহুবার ভিক্ষা ছেড়ে স্বজনদের সঙ্গে থাকার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি নিজের মতো করেই জীবন কাটিয়েছেন।
রাস্তাই ছিল তার ঠিকানা
স্থানীয়দের স্মৃতিতে নূরুন্নিসার জীবন মানেই শহরের রাস্তা।
সকাল ১০টার পর তাকে প্রায়ই প্রধান সড়কের আশপাশে ঘুরতে দেখা যেত। শুক্রবার স্থানীয় মসজিদের বাইরে বসে থাকতেন তিনি।
পথচারীরা কেউ তাকে টাকা দিতেন, কেউ খাবার।
এভাবেই একদিন, দুইদিন নয়—চার দশক ধরে মানুষের দেওয়া ছোট ছোট অর্থ ও খাবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিলেন তিনি।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ছোট শিশুরা খাবার খেতে না চাইলে বা বড়দের কথা না শুনলে মজা করে তাদের ভয় দেখানো হতো—‘নূর এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।’
শিশুদের ভয় দেখানোর সেই পরিচিত চরিত্রটিই ছিল এলাকার মানুষের কাছে নূরুন্নিসা।
ছোট ছোট সঞ্চয়ের বড় গল্প
নূরুন্নিসার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে থাকল তার সঞ্চয়।
একদিনে কেউ তাকে লাখ লাখ রুপি দেয়নি। বরং দীর্ঘ ৪০ বছরে পথচারীদের দেওয়া ছোট ছোট নোট ও কয়েন জমতে জমতেই তৈরি হয়েছিল ৮ লাখ ৪০ হাজার রুপির সঞ্চয়।
যে নারীকে মানুষ প্রতিদিন রাস্তায় অসহায় অবস্থায় দেখেছে, তার ঘরের অন্ধকার কক্ষে এত বড় সঞ্চয় ছিল—মৃত্যুর আগে সেটি কেউ জানতেই পারেনি।
এই অর্থ কীভাবে এবং কেন তিনি জমিয়েছিলেন, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর আর পাওয়া যাবে না।
তবে পরিবার জানিয়েছে, নূরুন্নিসার রেখে যাওয়া পুরো ৮ লাখ ৪০ হাজার রুপি অভাবী আত্মীয়দের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।
মৃত্যুর পর তাই নূরুন্নিসার জীবনের শেষ গল্পটি শুধু টাকার অঙ্কের নয়। এটি চার দশক ধরে রাস্তায় কাটানো এক নারীর নীরব জীবন, একাকিত্ব এবং অজানা সঞ্চয়ের গল্প—যার হিসাব তিনি নিজেই ছাড়া আর কেউ জানতেন না।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এমএসএম
বিজ্ঞাপন