বিজ্ঞাপন
একটি শিশুর পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়ে আলো দেখার আনন্দময় প্রক্রিয়ার পেছনে থাকে একজন নারীর দীর্ঘ ত্যাগ, শারীরিক রূপান্তর এবং মানসিক লড়াই। মাতৃত্ব শুধু জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নয়, এটি আগামী প্রজন্মের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মূল ভিত্তি।
তবে সঠিক সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতায় এই আনন্দ অনেক সময় পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি বা জীবনের ঝুঁকিতে। প্রসূতি মৃত্যুর হার কমাতে এবং মা-শিশু উভয়কেই নিরাপদ রাখতে গর্ভধারণের পূর্ব মুহূর্ত থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ তার এক নিবন্ধে তুলে ধরেছেন যে, বিশ্বজুড়ে মাতৃত্বকালীন জটিলতায় অনেক নারীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। বাংলাদেশে প্রসব-পরবর্তী প্রথম ২৪ ঘণ্টা মা ও নবজাতকের জন্য সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়।
প্রসবজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি বা এক্লাম্পসিয়া, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং তীব্র রক্তশূন্যতা মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ। এ ছাড়া অনিরাপদ ডেলিভারি এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার মায়ের স্বাস্থ্যে নতুন জটিলতা তৈরি করছে।
তাই একটি সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে গর্ভধারণের আগে থেকেই সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন-
গর্ভপূর্ব পরীক্ষা ও পরিকল্পনা
সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের শুরুতেই রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। জন্মগত ত্রুটি রোধে গর্ভধারণের আগেই চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক এসিড গ্রহণ করা দরকার।
নিয়মিত চেকআপ করা
পুরো গর্ভাবস্থায় অন্তত ৪ বার অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং শিশুর অবস্থান, রক্তচাপ ও গ্লুকোজ নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি।
সুষম পুষ্টি ও বিশ্রাম নেওয়া
খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়াম (দুধ, ছোট মাছ), আয়রন সমৃদ্ধ খাবার এবং নিয়মিত আয়রন-ক্যালসিয়াম বড়ি রাখা আবশ্যক। পাশাপাশি কায়িক পরিশ্রম বর্জন করে দিনে অন্তত ২ ঘণ্টা এবং রাতে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ
তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, হঠাৎ শরীর ফুলে যাওয়া বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।
প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য
সন্তান জন্মের পর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না, বরং প্রসবের পরবর্তী ৬ সপ্তাহ মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
প্রসব-পরবর্তী চেকআপ
প্রসবের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা, ৩য় দিন, ৭ম দিন এবং ৪২তম দিনে বাধ্যতামূলকভাবে মায়ের শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন
প্রসবের পর হরমোনের দ্রুত পরিবর্তন ও ক্লান্তির কারণে অনেক মা তীব্র মানসিক অবসাদে ভোগেন। মায়ের বিষণ্নতা বা অতিরিক্ত কান্নাকে অবহেলা না করে সহানুভূতিশীল আচরণ ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ক্ষত স্থান ও পুষ্টির যত্ন
সিজার বা নরমাল ডেলিভারির ক্ষত স্থান পরিষ্কার-শুষ্ক রাখা এবং বুকের দুধ উৎপাদনের জন্য প্রসূতিকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্যালরি ও তরল খাবার দেওয়া আবশ্যক।
আরও পড়ুন
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সত্যিই কি উপকারী, যা বলছে গবেষণা
পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য পারিবারিক সহযোগিতা প্রধান শর্ত। গর্ভাবস্থার ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময়ে শিশুর যত্নে স্বামীর সক্রিয় ও সহমর্মিতাপূর্ণ অংশগ্রহণ মায়ের মানসিক চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন
ভারী খাবারের সঙ্গে শসা-লেবু কেন খাবেন?
একই সঙ্গে প্রসূতিকে ঘরের কাজের চাপ থেকে মুক্ত রাখা এবং প্রসব-পরবর্তী কুসংস্কার নির্মূল করার মাধ্যমেই একটি সুস্থ মা ও নবজাতকের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
এসএকেওয়াই
বিজ্ঞাপন