বিজ্ঞাপন
নেপালে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় এখন পর্যন্ত ৬১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনো নিখোঁজ দুই হাজারের মতো মানুষ।
জানা গেছে, নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজ হওয়া অনেক পর্যটক তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন। তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রীদের কাছে বহু আগে থেকেই জনপ্রিয় একটি গন্তব্য। বিশেষ করে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থস্থান। প্রতি বছর ধরে হাজার হাজার মানুষ এসব পবিত্র স্থান দর্শনে সেখানে যান।
আরও পড়ুন
নেপালের বন্যায় নিহত বেড়ে ৬১৬, এখনো নিখোঁজ ১৯২৪
জানা গেছে, আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তাদের অনেকেই তীর্থযাত্রায় সেখানে গিয়েছিলেন। অনেক ভারতীয় পর্যটক নেপাল হয়ে তিব্বতের কৈলাস পর্বতে যান। প্রায় ৬ হাজার ৪০০ মিটার (২১ হাজার ফুট) উচ্চতার এই পর্বত হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। তবে নেপাল শুধু তীর্থযাত্রীদের কাছেই জনপ্রিয় নয়, সারা বিশ্বের পর্বতারোহীদেরও কাছে জনপ্রিয় একটি দেশ। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলা হাইকিংয়ের জন্য জনপ্রিয় একটি এলাকা। আগস্ট মাস হাইকিংয়ের মৌসুম না হলেও বন্যার সময় সেখানে কিছু পবর্তারোহী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে চার হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতার হলো মানস সরোবর। এর পাশেই কৈলাস পর্বত। দুর্গম উঁচু পাহাড়ি অমসৃণ আঁকাবাঁকা পথ, তীব্র ঠাণ্ডা, বৈরী আবহাওয়া, অক্সিজেন স্বল্পতাসহ নানা কারণে কৈলাস-মানস সরোবরে পৌঁছানো খুবই কঠিন কাজ। তারপরও ধর্মীয় অনুভূতির কারণে সেখানে যান তীর্থযাত্রীরা। তবে তাদের বিশ্বাসের জায়গা এক নয়। কোনো ধর্মে কৈলাস মানে দেবতার আবাস, কারও কাছে এটি আবার আধ্যাত্মিক সাধনার পবিত্র ভূমি। মানস সরোবরের পানিকে অনেকে পবিত্র মনে করেন।
আরও পড়ুন
তিব্বতে ফের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ
কৈলাস ও মানস সরোবর কোথায় অবস্থিত?
কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর দুটোই তিব্বতে অবস্থিত, যা চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। তবে অঞ্চলটি একইসঙ্গে আবার নেপাল ও ভারতের সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত। তিব্বত রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জায়গা। চীন ১৯৫০ সালে তিব্বতকে নিজেদের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় এবং তখন থেকেই এটিকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
কৈলাস পর্বতের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার মিটার বা ২১ হাজার ফুট। কৈলাসের কাছেই, দক্ষিণে হলো মানস সরোবর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় থাকা একটি স্বাদু পানির হ্রদ এটি, যা এশিয়ার উচ্চতম স্বাদু পানির হ্রদগুলোর মধ্যে একটি।
চীনের সরকারি তথ্য বলছে, মানস সরোবরের আয়তন প্রায় ৪১২ বর্গকিলোমিটার এবং গভীরতা প্রায় ৪৬ মিটার। হ্রদটিতে প্রায় দুই হাজার কোটি ঘনমিটার পানি রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেসকো বলছে, এখান থেকেই এশিয়ার চারটি বড় নদীর উৎপত্তি আর সেগুলো হলো সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র এবং কর্ণালী।
কেন তীর্থযাত্রীদের কাছে পবিত্র তিব্বতের স্থান?
ইউনেস্কো বলছে, এই অঞ্চলে ধর্মীয় উপাসনার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো। হিন্দু ধর্মে কৈলাসকে দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। হিন্দু পুরাণ ও ধর্মীয় সাহিত্যেও কৈলাসের কথা উল্লেখ আছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘শিব বৈদিকযুগ থেকেই উপাসিত। ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলে কৈলাস পর্বতের স্বর্ণশিখরে বসবাসকারী দেবতা শিবের উল্লেখ আছে। হিন্দুদের পঞ্চমতের সবাই এটা বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে শৈব ও শাক্ত কৈলাসকে পরম গন্তব্য হিসেবে মনে করে।’
কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, ‘মন্ত্রের মাঝেই কৈলাস শব্দটি আছে। ঋগ্বেদের যুগ থেকে যদি স্থানটি এতটা পবিত্র বিষয় হয়, তাহলে সেই পরম্পরাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।’ অন্যদিকে, মানস সরোবরও হিন্দুদের কাছে পবিত্র হ্রদ। তারা মানস সরোবরের তীরে প্রার্থনা ও পূজা করেন এবং হ্রদের পানিকে পবিত্র মনে করে তা সংগ্রহ করেন।
তবে চীনা কর্তৃপক্ষ পরিবেশ দূষণ রোধে সরাসরি সেখানে পানিতে নেমে স্নানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার সরকারি গাইডেও মানস সরোবরে ধর্মীয় আচার ও পবিত্রতার এই বিশ্বাসের কথা উল্লেখ আছে।
আরও পড়ুন
নেপালে বিপর্যয়ের মধ্যেই আরও একটি বন্যার শঙ্কা
ইউনেস্কোর নথি বলেছে, কৈলাস পর্বতের চারদিকে চারটি বড় গোম্পা বা বৌদ্ধ মঠ রয়েছে। আর মানস সরোবরের চারদিকে আটটি মঠ রয়েছে। বৌদ্ধদের কাছেও কৈলাস অত্যন্ত পবিত্র। তিব্বতি ভাষায় পর্বতটি ‘কাং রিনপোচে’ নামে পরিচিত, যার অর্থ অনেকটা ‘তুষারের মূল্যবান রত্ন’। হিমালয় অঞ্চলের শিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের রুবিন মিউজিয়াম অব হিমালয়ান আর্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, বৌদ্ধদের একটি অংশ বিশ্বাস করেন, কৈলাসই পৌরাণিক মেরু পর্বত বা মহাবিশ্বের কেন্দ্র।
বৌদ্ধদের কাছে কৈলাসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, ‘ভুটান, চীন, তিব্বত, ভারতের সিকিম ও দার্জিলিং-এ, কাশ্মীরের লাদাখে, মঙ্গোলিয়ার মহাযানপন্থি বৌদ্ধরা বিভিন্ন দেব-দেবতার উপাসনা করে। বাংলায়ও পালযুগে মহাযানপন্থি বৌদ্ধরা ছিল। সেজন্য বাংলার জাদুঘরগুলোতে বৌদ্ধদের প্রচুর দেব-দেবতার মূর্তি আছে।’
বন ধর্মে কৈলাসের গুরুত্ব আরও পুরোনো। বন ধর্মের অনুসারীদের কাছে কৈলাস তাদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ও উপাসনার অন্যতম পবিত্র স্থান। হিন্দু ও বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটার দিকে কৈলাস প্রদক্ষিণ করেন। হিন্দু ধর্মে এই প্রদক্ষিণকে পরিক্রমা বলা হয়। আর তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এই প্রদক্ষিণকে ‘কোরা’ বলা হয়। অন্যদিকে, বন ও জৈন অনুসারীরা প্রদক্ষিণ করেন ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে। জৈন ধর্মেও কৈলাসকে পবিত্র স্থান হিসেবে দেখা হয়। জৈনদের বিশ্বাস, তাদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এই স্থানে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ইউনেস্কোর নথিতেও এটি উল্লেখ আছে।
এ প্রসঙ্গে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, ‘ভগবান ঋষভদেব যেমন জৈনদের আদি তীর্থঙ্কর, উনি সনাতন ধর্মে (ভাগবত পুরাণ) বিষ্ণুরও অবতার। আবার, ২৩-তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের যে শক্তি, তিনি হলেন পদ্মাবতী। এই পদ্মাবতীই হলেন মনসা। ভারত বর্ষে উৎপন্ন ধর্মগুলোকে আলাদা করা কঠিন এবং আগে এতটা বিভাজন ছিল না। সে কারণেই এই স্থানটি একাধিক ধর্মের অনুসারীদের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।’
কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা কঠিন কেন?
তীর্থযাত্রীরা কৈলাস-মানস সরোবরে যেতে পারেন কয়েকটি পথে। একটি হলো ভারতের উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস, অন্যটি সিকিমের নাথু লা পাস দিয়ে। এর বাইরে আরেকটি পরিচিত রুট হলো কাঠমান্ডু (নেপাল)। তবে ভারতের লিপুলেখ ও নাথু লা পাস দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় শুধু বৈধ ভারতীয় পাসপোর্টধারী ভারতীয় নাগরিকরা অংশ নিতে পারেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতি বছর জুন থেকে আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মাঝে এই আয়োজন করে। লিপুলেখ পাস দিয়ে যেতে হলে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। আর নাথু লা পাস দিয়ে গেলে তুলনামূলক কম হাঁটতে হয়। তবে এই পথ দিয়ে সময় লাগে ২০ দিনেরও বেশি। বাংলাদেশিসহ অন্যান্য বিদেশি তীর্থযাত্রীরা সাধারণত নেপাল হয়ে তিব্বতে প্রবেশ করেন। এক্ষেত্রে তীর্থযাত্রীদের চীনের ভিসার পাশাপাশি তিব্বতে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয় এবং অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে যাত্রার ব্যবস্থা করতে হয়।
আবার, চীনের ভেতর থেকে লাসা হয়েও কৈলাস-মানস সরোবর সরোবর যেতে পারেন অনেকে। তবে তাদের তিব্বত ভ্রমণের প্রয়োজনীয় বিশেষ অনুমতি লাগে। তীর্থযাত্রীরা যে কৈলাশ পর্বতের দিকে যান তার জন্য বিশেষ অনুমতিপত্র লাগে। নেপালের দিক থেকেও যে হাজারো মানুষ তীর্থযাত্রায় যান তাতেও একটি স্বীকৃত কোম্পানির মাধ্যমে চারটি ভিন্ন অনুমতিপত্র লাগে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি, ইউনেস্কো, বিবিসি বাংলা, ওয়ান্ডার্স অব তিব্বত
এসএনআর
বিজ্ঞাপন