বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ইমরান খানের মুক্তির দাবি তুললেন জাভেদ মিয়াঁদাদ। সাবেক সতীর্থকে জেলবন্দি করে রাখার কারণ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ইমরানের সততা নিয়ে সংশয় নেই তার।
ইমরান খানের দুই ছেলে সুলেমান খান এবং কাসেম খানের সাক্ষাৎকার নিয়ে নতুন বিতর্কে পাকিস্তানের ক্রিকেট। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে সুলেমান এবং কাসেমের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা হয়।
তাতে জেলবন্দি ইমরানের শারীরিক এবং মানসিক দুরবস্থা, পাকিস্তান সরকারের নির্যাতন নিয়ে মুখ খোলেন সাবেক পাক প্রধানমন্ত্রীর ছেলেরা। তারপরই দল না নামানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) পক্ষ থেকে। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুলেছেন পাকিস্তানের কোচ সরফরাজ আহমেদ। এই বিতর্কের মধ্যেই ইমরানের জেলমুক্তির দাবিতে সরব জাভেদ মিয়াঁদাদ। কথা বলার সময় কেঁদে ফেলেন তিনি।
ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট সিরিজের সম্প্রচারকারী স্কাই স্পোর্টসে সুলেমান-কাসেমের সাক্ষাৎকার নেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইক আথারটন। দুই ভাই এমন কিছু কথা বলেন, যেগুলি পাকিস্তানের শাহবাজ শরিফ সরকারের পক্ষে অস্বস্তির।
পিসিবি চেয়ারম্যান মাহসিন নাকভি আবার শরিফ মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। স্বভাবতই বিরক্ত হলেন তিনিও। স্কাই স্পোর্টসকে ওই সাক্ষাৎকার সম্প্রচার বন্ধ করতে বলে পিসিবি। কিন্তু চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
এরপর ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) সঙ্গে যোগাযোগ করেন পিসিবি কর্মকর্তারা। সম্প্রচার বন্ধ করা না হলে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর দল না নামানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ইসিবির মধ্যস্থতায় খেলা শুরু হলেও বিতর্ক মেটেনি। সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে কোচ সরফরাজকে।
লর্ডসে কি সত্যিই দল না নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আপনারা? সরফরাজ় বলেছেন, ‘আমি কিছু জানি না। আমি শুধু ম্যাচ নিয়ে রয়েছি। আপনারা কি একটি সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে কথা বলছেন? এ ব্যাপারে আমাদের কিছু জানা নেই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘দলে সব ঠিকঠাক আছে। ওই সময় আমরা মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত ছিলাম। সাক্ষাৎকারটার ব্যাপারে কিছু জানা নেই আমাদের।’
পাক সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়েছেন মিয়াঁদাদ। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক অবিলম্বে সতীর্থের জেলমুক্তির দাবি তুলেছেন। মিয়াঁদাদ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কখনও কোনওরকম শত্রুতা ছিল না। আমরা বছরের পর বছর একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি। বছরে ছয় মাসের বেশি একসঙ্গেই থাকতাম। বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে গিয়েছি। পাকিস্তানের হয়ে একসঙ্গে খেলেছি। দুজনেই দুজনের নেতৃত্বে খেলেছি। আমাদের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক ছিল। ক্রিকেটজীবনের অনেকটা পথ আমরা ভাগাভাগি করে নিয়েছি।’
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মিয়াঁদাদ। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, ‘আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম। এখন ইমরানের কথা ভাবলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। জানি না জেলের মধ্যে ও কী অবস্থায় রয়েছে। পাকিস্তানকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল ইমরান। আমার মন বলছে, ওর সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। ওকে মুক্তি দিলে সমস্যা কী? আমাকে কেউ কি বুঝিয়ে বলবেন? ইমরানকে মুক্তি দিলে কি পাকিস্তান মুছে যাবে? সকলের বোঝা উচিত, আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমি ইমরানকে খুব ভালভাবে চিনি। অত্যন্ত সৎ মানুষ। কোনও দুর্নীতি বা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কখনও জড়িত ছিল না। না হলে আরও অনেক কিছু করতে পারত। ইমরান দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিল। ওর বিরুদ্ধে তো চুরি বা আর্থিক দুর্নীতির কোনও অভিযোগ নেই।’
সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আবেদন জানিয়েছেন তিনি। মিয়াঁদাদ বলেছেন, ‘বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর সমাধান পাওয়া যেতে পারে। ইমরান অসম্ভব শ্রদ্ধার মানুষ। পাকিস্তানের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। আমাদের বোধহয় একটু ভাবা দরকার। ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে জীবনযাপন করা ওর প্রাপ্য। ঈশ্বর না করুন, জেলের ভিতরে ওর কিছু হয়ে গেলে গোটা পাকিস্তান কাঁদবে। তখন মানুষই প্রশ্ন তুলবে, ইমরানের মতো একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হল? আরে ইমরান তো চুরি করেনি। যা করেছে, পাকিস্তানের স্বার্থে করেছে। নিজের সব কিছু দেশের জন্য দিয়েছে। দেশের জাতীয় নায়কের সঙ্গে এমন আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। অত্যন্ত দুঃখের। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব, যাতে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়।’
ইমরানের পরিস্থিতি নিয়ে সুনিল গাভাস্কার, কপিল দেব, ক্লাইভ লয়েড, অ্যালান বর্ডারের মতো সাবেক ক্রিকেটারাও উদ্বিগ্ন। পাকিস্তান সরকারকে ইমরানের জন্য যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে একাধিক বার অনুরোধ করেছেন তারা। ইমরানকে যথাযথ সম্মান দেওয়ার দাবি তুলেছেন প্যাট কামিন্সও। মিয়াঁদাদ সরাসরি ইমরানের প্রশংসা করে মুক্তি দেওয়ার দাবি তুললেন। পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের মধ্যে মিয়াঁদাদই প্রথম সাবেক অধিনায়ক এবং প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির দাবি তুললেন। যা শাহবাজ, নাকভিদের অস্বস্তি আরও বৃদ্ধি করতে পারে।
একাধিক অভিযোগে ২০২৩ সাল থেকে জেলবন্দি ইমরান। জেলে তার উপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে বহুবার। সাবেক পাক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যেরা নানা অভিযোগ করেছেন। অসুস্থ ইমরানের ঠিক মতো চিকিৎসা না করানো, দিনে ২৩ ঘণ্টার বেশি একটি ছোট্ট ঘরে আটকে রাখা, একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া, পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের ঠিক মতো দেখা করতে না দেওয়ার মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। তার দল পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফকে নির্বাচনে লড়াই করতে দেয়নি বর্তমান সরকার। পাকিস্তানের নাগরিকদের একাংশও ইমরানকে জেলবন্দি করে রাখায় ক্ষুব্ধ।
একমাত্র ইমরানের নেতৃত্বেই বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাকিস্তান। বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসাবে বিবেচনা করা হয় তাকে। ক্রিকেটমহলে এখনও যথেষ্ট জনপ্রিয় তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই টেস্ট ম্যাচের বিরতিতে ইমরানের পরিস্থিতি নিয়ে তার দুই ছেলের বক্তব্যের সঙ্গে শাহবাজ সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িত। স্কাই স্পোর্টস খেলাধুলোর মধ্যে দেশের আভ্যন্তরীণ এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়কে টেনে আনায় ক্ষুব্ধ পিসিবি। বিষয়টিকে দেশের মর্যাদাহানী হিসাবে দেখছেন নাকভিরা।
আইএইচএস/
বিজ্ঞাপন