জাতীয়

সরকার নাকি জনগণ খারাপ?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
সবাই আমরা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি। সরকার খারাপ, মন্ত্রীরা খারাপ, আমলারা খারাপ, রাজনীতিবিদরা খারাপ, প্রশাসন খারাপ, পুলিশ খারাপ, আইনশৃঙ্খলা খারাপ, দুর্নীতি সর্বত্র। অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমরা খুব সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছি। সমস্যাটা আসলে কোথায়? এই সরকার তো আকাশ থেকে নেমে আসেনি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ও তাদের মিত্ররা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছে। অর্থাৎ সংসদে তাদের যে শক্তি, তার রাজনৈতিক ভিত্তি এসেছে জনগণের ভোট থেকেই। তাহলে প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করি। সরকার কি জনগণের বাইরে কোনো আলাদা জাতি? রাষ্ট্রের সংবিধানই বলে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই ক্ষমতা জনগণের পক্ষে সংবিধানের অধীনেই প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে আমরা যখন বলি, ‌‘সরকার খারাপ’, তখন কি একবারও নিজেদের দিকে তাকাই? সরকার কি আমাদের সমাজ থেকেই উঠে আসে না? রাজনীতিবিদ কি অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসে? মন্ত্রী, এমপি, আমলা, পুলিশ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারক, ঠিকাদার, কর্মকর্তা, কর্মচারী, কেউ কি বাংলাদেশের বাইরে থেকে আমদানি করা? না। আমাদের সমাজ থেকেই তারা উঠে আসে। কখনো ভোট দিয়ে, কখনো সুপারিশ করে, কখনো তেল মেরে, কখনো টাকা দিয়ে, কখনো চুপ থেকে, কখনো অন্যায় দেখেও চোখ বন্ধ করে আমরা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখি। অপ্রিয় সত্যটি এখানেই। একটি রাষ্ট্রের সরকার শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিরই কোনো না কোনো প্রতিফলন। অবশ্যই সরকার ও জনগণ এক জিনিস নয়। ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান, আইন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় সরকারেরই। কিন্তু জনগণের চরিত্র, মূল্যবোধ ও আচরণকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত করে শুধু সরকারকে দোষারোপ করলে আমরা সমস্যার অর্ধেকও বুঝতে পারব না। আরও পড়ুন লাল-সাদা-নীল রঙে সেজেছে মালয়েশিয়া আর এই জায়গাতেই আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা। আমরা পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজেদের পরিবর্তন করতে চাই না। আমরা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, কিন্তু নিজের কাজটি দ্রুত করিয়ে নিতে ঘুষ দিতে আপত্তি নেই। আমরা মেধার মূল্য চাই, কিন্তু নিজের ছেলে-মেয়ের চাকরির জন্য পরিচিত লোক খুঁজি। আমরা স্বচ্ছ রাজনীতি চাই, কিন্তু নিজের পছন্দের রাজনৈতিক নেতা অন্যায় করলে বলি, “ওরা তো আমাদের লোক।” আমরা আইনের শাসন চাই, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য আইন ভাঙতে পারলে সেটাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করি। আমরা চামচামি ঘৃণা করি, কিন্তু ক্ষমতাবানের সামনে গিয়ে নিজের মেরুদণ্ড কোথায় রেখে এসেছি, তা নিজেরাই জানি না। এই সংস্কৃতি আজকের নয়। আমার বয়স ষাটের বেশি। আমি আমার জীবনে যে বাংলাদেশ দেখেছি, তারও আগে আমার বাবা-মা, দাদা-নানা যে বাংলাদেশের কথা বলেছেন, সেখানেও ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পৃষ্ঠপোষকতা, তোষামোদ, সুবিধা আদায় এবং প্রভাবশালীর ছায়ায় নিরাপদ থাকার প্রবণতা ছিল। এগুলোকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের আবিষ্কার বলে চালিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় হবে। আর ইতিহাসের পাতায় তাকালেও দেখা যায়, বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো বহু শতাব্দী ধরে এমন এক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলেছে, যেখানে শাসক, রাজস্ব সংগ্রাহক, জমিদার, স্থানীয় ক্ষমতাবান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা স্তরের নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল। মুঘল আমলে জমিদাররা শুধু ভূমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, রাজস্ব সংগ্রহ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলার সঙ্গেও তাদের ক্ষমতা জড়িত ছিল। অর্থাৎ ক্ষমতার কাছে থাকা, ক্ষমতার কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া এবং ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করা কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়। এমনকি ব্রিটিশ আমলের পুলিশব্যবস্থার ইতিহাসও আমাদের জন্য অস্বস্তিকর শিক্ষা বহন করে। ১৭৯২ সালের থানাদারি ব্যবস্থায় দারোগা ছিলেন থানার প্রধান কর্মকর্তা। সেই ব্যবস্থায় স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের দুর্বল বেতন ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রবণতাও দেখা দিয়েছিল। অর্থাৎ আজকের ‘দারোগা বাবুর সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে কাজ সহজ হবে’ মানসিকতার শিকড় যে একেবারে গতকাল তৈরি হয়েছে, তা বলা যাবে না। আমাদের গ্রামবাংলার পুরোনো গল্পগুলোতে তাই দারোগা, জমিদার, নায়েব, গোমস্তা কিংবা ক্ষমতাবানের বাড়িতে উপঢৌকন নিয়ে যাওয়ার গল্প অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। আমার নিজের শোনা সেই পুরোনো কথাটাই মনে পড়ে। পদ্মা নদীর ইলিশ মাছ ধরে কেউ দারোগা বাবুর বাড়িতে গিয়ে বলছে, “নিজ পুকুরের ইলিশ স্যার, আপনার জন্য এনেছি।’ ইলিশটা হয়তো পদ্মার, কিন্তু মুখে বলা হচ্ছে নিজ পুকুরের। কেন? কারণ সত্য বললে যে কাজটি হবে না, তেল মারলে সেটি হয়ে যেতে পারে। এই একটি ছোট্ট দৃশ্যের মধ্যেই আমাদের সামাজিক চরিত্রের একটি বড় ছবি লুকিয়ে আছে। আমরা যেন ক্ষমতার কাছে গিয়ে নিজের শরীরে তেল মেখে নিই। আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডু। খেলায় প্রতিপক্ষের এলাকায় ঢুকে পড়তে হয়, কিন্তু ধরা পড়লে শরীরে তেলের কারণে চিংড়ি-বিড়িং করে বেরিয়ে আবার নিজের দলে ফিরে আসার কৌশলও আমরা জানি। কথাটা মজা করে বলছি, কিন্তু এর ভেতরে একটি কঠিন সত্য আছে, আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান বদলাতে অসাধারণ দক্ষ। আজ এই দল, কাল ওই দল। আজ এই নেতা, কাল অন্য নেতা। আজ যার বিরুদ্ধে স্লোগান, কাল তারই পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি। আজ যে অন্যায়কে জাতির ধ্বংস বলছি, কাল নিজের লোক করলে সেটাই ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’। এখানেই আমাদের আত্মসমালোচনা দরকার। আমরা ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢুকি, আবার ঘুষ দিয়ে চাকরিতে সুবিধা নেওয়ার পথও খুঁজি। আমরা পরীক্ষায় নকল করি, তারপর সেই সার্টিফিকেট দিয়ে জীবন গড়ি। আমরা ভেজাল খাবার তৈরি করি, আবার নিজের সন্তানকে সেই খাবার থেকে দূরে রাখি। আমরা ওষুধে ভেজাল দিই, খাদ্যে ভেজাল দিই, ব্যবসায় ভেজাল দিই, কাগজপত্রে ভেজাল দিই, তথ্যের মধ্যে ভেজাল দিই, তারপর রাষ্ট্রের ভেজাল দেখে চিৎকার করি। আমাদের সমস্যা শুধু দুর্নীতি নয়। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা দুর্নীতিকে অনেক ক্ষেত্রে অন্যায় হিসেবে দেখি না, যতক্ষণ না দুর্নীতির শিকার হচ্ছি আমরা নিজেরা। এই মানসিকতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো দ্বৈত নীতি। নিজের জন্য নিয়ম এক রকম, অন্যের জন্য আরেক রকম। নিজের লোক চাকরি পেলে ‘যোগ্যতা’। অন্যের লোক চাকরি পেলে ‘তদবির’। নিজের নেতা সুবিধা নিলে ‘দেশের স্বার্থ’। অন্যের নেতা সুবিধা নিলে ‘লুটপাট’। নিজের সন্তান পরীক্ষায় নকল করলে ‘একটু সাহায্য’। অন্যের সন্তান করলে ‘জাতি শেষ’। এই দ্বৈত চরিত্র নিয়েই আমরা রাষ্ট্রকে সৎ হতে বলি। কীভাবে? আমরা কি কখনো ভেবেছি, যে সমাজে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে সার্টিফিকেট, জমির কাগজ, চাকরির কাগজ, ব্যবসার কাগজ, এমনকি নিজের পরিচয় পর্যন্ত সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেই সমাজের রাষ্ট্রীয় কাগজপত্র একদিনে নির্ভুল হয়ে যাবে কীভাবে? সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২৪ আগস্ট তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি নথিভিত্তিক উত্তর না দিয়ে নিজের বাংলাদেশিত্ব ও দেশপ্রেমের কথা বলেন। পরদিন আইনমন্ত্রী জানান, হুমায়ুন কবীর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং তার শপথ গ্রহণে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়নি। এখানে ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রশ্ন নেই। বরং ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব, আনুগত্য ও আইনি যোগ্যতার মতো বিষয়গুলো কি আবেগের ভাষায়, নাকি পরিষ্কার নথি ও আইনের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা উচিত? আমার উত্তর পরিষ্কার। সভ্য রাষ্ট্রে ব্যক্তির দেশপ্রেম নিয়ে বিতর্ক নয়, প্রয়োজন তথ্য, নথি এবং আইনের পরিষ্কার ব্যাখ্যা। কারণ আইন যদি সবার জন্য হয়, তাহলে প্রশ্নের উত্তরও সবার জন্য একই মানদণ্ডে হওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তি দেশপ্রেমিক কি না, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু একজন রাষ্ট্রীয় পদধারীর আইনি যোগ্যতা যাচাই করা নাগরিকের অধিকার। কিন্তু আমরা কি সেটিই চাই? নাকি আমরা চাই, ‘আমি দেশপ্রেমিক, অতএব আমাকে প্রশ্ন করা যাবে না’? যদি দ্বিতীয়টি চাই, তাহলে সমস্যাটা শুধু সরকারের নয়, আমাদেরও। কারণ প্রশ্ন করার অধিকার না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না। আর প্রশ্নের উত্তর নথি দিয়ে না দিয়ে প্রশ্নকারীকে আক্রমণ করার সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে। কিন্তু এখানেও আয়নাটা আমাদের নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। আমরা কি আমাদের সন্তানকে বলি, ‘সত্য বলবে, যদিও তাতে তোমার ক্ষতি হয়’? নাকি বলি, ‘আগে নিজের কাজটা উদ্ধার করো, তারপর নীতির কথা বলবে’? আমরা কি তাকে বলি, ‘পরীক্ষায় নকল করবে না’? নাকি ফল ভালো হলে বলি, ‘কীভাবে করেছিস, সেটা বড় কথা নয়, ফলটাই আসল’? আমরা কি তাকে বলি, ‘ঘুষ দেবে না’? নাকি বলি, ‘সবাই দেয়, তুমি না দিলে তোমার কাজ হবে না’? এই জায়গায় এসে সরকারকে একা দোষ দেওয়া কি সৎ আত্মসমালোচনা? না। সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। অন্যায় করলে সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে। দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দিতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন করতে হবে। নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। প্রশাসনকে পেশাদার করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদেরও বদলাতে হবে। কারণ আমরা যদি একই মানুষ থাকি, তাহলে নতুন সরকার এসে কী করবে? নতুন মুখ আসবে, পুরোনো সংস্কৃতি থাকবে। নতুন মন্ত্রিসভা হবে, পুরোনো তদবির থাকবে। নতুন সংসদ হবে, পুরোনো চামচামি থাকবে। নতুন প্রশাসন হবে, পুরোনো ঘুষ থাকবে। নতুন স্লোগান হবে, পুরোনো মানসিকতা থাকবে। তাহলে পরিবর্তন কোথায়? সরকার বদলেছে, কিন্তু বাংলাদেশ বদলায়নি। এই একটি বাক্য হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি ভয় দেখানো উচিত। আমরা বহুবার সরকার বদলেছি। নেতা বদলেছি। দল বদলেছি। স্লোগান বদলেছি। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছি। কিন্তু আমরা কি নাগরিক হিসেবে নিজেদের বদলেছি? এখন সময় এসেছে সেই প্রশ্ন করার। আর এই আত্মসমালোচনা কোনো জাতিকে ছোট করার জন্য নয়। বরং যে জাতি নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে পারে, সেই জাতিই নিজেকে শক্তিশালী করতে পারে। আমাদের বলতে হবে, হ্যাঁ, আমাদের রাজনীতিতে সমস্যা আছে। কিন্তু আমাদের সমাজেও সমস্যা আছে। আমাদের প্রশাসনে সমস্যা আছে। কিন্তু আমাদের সামাজিক আচরণেও সমস্যা আছে। আমাদের নেতাদের মধ্যে সমস্যা আছে। কিন্তু নেতাকে দেবতা বানানোর প্রবণতাতেও সমস্যা আছে। আমরা দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ চাই না। কিন্তু দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদকে ভোট দিয়ে জেতানোর দায়ও আমাদের। আমরা চামচা চাই না। কিন্তু ক্ষমতাবানের চারপাশে দাঁড়িয়ে চামচামি করে সুবিধা নেওয়া মানুষকে আমরা অনেক সময় সম্মানও করি। এখন তাই আর কূটনৈতিক ভাষার সময় নয়। আর “সব দোষ ওদের” বলার সময় নয়। আর “আমরা তো নির্দোষ” বলার সময় নয়। এখন আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময়। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে হবে। রাজনীতিবিদকে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশাসনকে প্রশ্ন করতে হবে। কিন্তু একই প্রশ্ন নিজের কাছেও করতে হবে। আমি কি ঘুষ দিই? আমি কি মিথ্যা বলি? আমি কি তদবির করি? আমি কি অন্যায় সুবিধা নিই? আমি কি নিজের লোকের অন্যায়কে সমর্থন করি? আমি কি ক্ষমতাবানের সামনে নত হয়ে যাই? আমি কি আইন মানি শুধু যখন আইন আমার পক্ষে? আমি কি সন্তানকে সততা শেখাই, নাকি সফল হওয়ার শর্টকাট শেখাই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমরা নিজেদের কাছে সৎভাবে দিতে না পারি, তাহলে আগামী নির্বাচনেও আমরা হয়তো আবার এমন একটি সরকারই পাব, যার বিরুদ্ধে আবার আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অভিযোগ করব। কারণ সরকার শুধু নির্বাচন থেকে তৈরি হয় না। সরকার তৈরি হয় পরিবার থেকে, শিক্ষা থেকে, সামাজিক মূল্যবোধ থেকে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে, নাগরিকের আচরণ থেকে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্মিলিত পছন্দ থেকে। তাই আজ আমার প্রশ্ন সরকারের কাছে যতটা, জনগণের কাছেও ততটাই। সরকার নাকি জনগণ খারাপ? আমার উত্তর, শুধু সরকারকে খারাপ বললে আমরা সত্যের অর্ধেক বলব। আমাদের সমস্যার একটি অংশ রাষ্ট্রে, আর একটি বড় অংশ আমাদের নিজেদের মধ্যে। এখানেই সবচেয়ে কঠিন কথাটি বলতে হবে। আমরা যদি বদলাতে না চাই, তাহলে কোনো সরকারই আমাদের বাঁচাতে পারবে না। পরিবর্তন চাইলে শুধু ভোটের বাক্সে হাত দিলেই হবে না, নিজেদের চরিত্রের ভেতরেও হাত দিতে হবে। চামচামি ছাড়তে হবে। ঘুষ ছাড়তে হবে। নকল ছাড়তে হবে। মিথ্যা ছাড়তে হবে। ভেজাল ছাড়তে হবে। অন্যায় সুবিধা নেওয়া ছাড়তে হবে। নিজের লোক বলে অন্যায়কে সমর্থন করা ছাড়তে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে অন্যায় আমি নিজের জন্য গ্রহণযোগ্য মনে করি, একই অন্যায় অন্য কেউ করলে সেটিকে অপরাধ বলার ভণ্ডামি ছাড়তে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ সংসদ থেকে শুরু হতে পারে। আইন থেকে শুরু হতে পারে। প্রশাসন থেকে শুরু হতে পারে। কিন্তু তার স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হবে মানুষের চরিত্রে। তাই এবার প্রশ্নটা অন্যভাবে করি। আমরা কেমন সরকার চাই, তার আগে কি আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করেছি, আমরা কেমন নাগরিক হতে চাই? কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র আমাদেরই। ক্ষমতা আমাদেরই। ভোট আমাদেরই। আর আগামী বাংলাদেশও আমাদের হাতেই। সরকার বদলানোর আগে যদি নাগরিক না বদলায়, তাহলে সরকার বদলাবে, কিন্তু বাংলাদেশ বদলাবে না। এবার সিদ্ধান্ত আমাদের। আর কতদিন অন্যকে আয়নায় দেখাব? এবার নিজের মুখটা দেখি। রহমান মৃধাগবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com এমআরএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>