বিজ্ঞাপন
হুদাইবিয়ার সন্ধির সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে যুক্ত একটি ঘটনা বাইয়াতে রিদওয়ান। এমন কি এই বাইয়াতকে হুদাইবিয়ার সন্ধি হওয়ার একটা প্রত্যক্ষ কারণও বলা যায় যে সন্ধি পরবর্তীতে মুসলিমদের জন্য কল্যাণ ও বিজয়ের দুয়ার খুলে দিয়েছিল।
খন্দকের যুদ্ধে মক্কাসহ পুরো আরবের সম্মিলিত মুশরিক শক্তির শোচনীয় ব্যর্থতা ও পরাজয়ের পর মদিনায় যখন মুসলিমদের অবস্থান সুসংহত হলো এবং তাদের নতুন রাষ্ট্রটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াল, তখন মুসলমানরা মক্কায় আল্লাহর ঘরে গিয়ে ইবাদত করার সুযোগ উন্মুক্ত করার কথা ভাবতে শুরু করল। মুসলমানদের বাইতুল্লাহ ও মসজিদুল হারামে যেতে বাঁধা দেওয়ার কোনো অধিকার মুশরিকদের ছিল না।
এই সময় একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নে দেখলেন, তিনি ও তার সাহাবিরা নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করছেন, বায়তুল্লাহ তওয়াফ করছেন। তিনি সাহাবিদের এই স্বপ্নের কথা জানালে তাদের মন আনন্দে ভরে উঠল। সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের জন্য তারা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং ভাবলেন খুব জলদিই হয়তো তারা মক্কায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন।
এই শুভ স্বপ্ন বর্ণনার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জানালেন, তিনি সাহাবিদের নিয়ে ওমরাহ করতে যাবেন। সফরের প্রস্তুতি শুরু হলো। ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসের প্রথম তারিখে মদিনার সার্বিক দায়িত্ব ইবনে উম্মে মাকতুমকে (রা.) দিয়ে রাসুল (সা.) মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। এই সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমা (রা.) এবং সব মিলিয়ে প্রায় ১৪০০ জন সাহাবি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু ওমরাহ, যুদ্ধ নয়। তাই কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া কোনো ধরনের যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র কেউ সাথে নেননি।
ওদিকে রাসুলের (সা.) মক্কার দিকে আসার খবর পেয়ে মক্কার মুশরিকরা এক জরুরি বৈঠক ডেকে বসল। সেই বৈঠক থেকে তারা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
রাসুলুল্লাহর (সা.) সাথে কথা বলতে এবং তাঁকে মক্কায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে তারা একের পর এক প্রতিনিধি পাঠাতে লাগল।
কিন্তু মক্কার যেসব উগ্র মেজাজের তরুণরা যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল, তারা নেতাদের এই কূটনৈতিক আলোচনা মেনে নিতে পারছিল না। তারা নিজেদের উদ্যোগে এমন কিছু করার চিন্তা করল যাতে সন্ধির পথ বন্ধ হয়ে যুদ্ধ বেঁধে যায়। তারা সিদ্ধান্ত নিল রাতে লুকিয়ে মুসলিমদের ঘাঁটিতে ঢুকে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে যাতে যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমেও পড়ল। সত্তর বা আশি জনের একটি সশস্ত্র দল রাতের আঁধারে তানঈম পাহাড় থেকে নেমে মুসলিম শিবিরে ঢোকার চেষ্টা করল।
কিন্তু মুসলিম প্রহরীরা ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। তরুণদের দলটি তাঁবুর কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্রই সবাইকে গ্রেপ্তার করা হলো। ফলে তাদের এই ধ্বংসাত্মক চক্রান্ত ভেস্তে গেল। তাদের ব্যাপারে ফয়সালার জন্য সবাইকে রাসুলের (সা.) দরবারে হাজির করা হলো।
রাসুল (সা.) যেহেতু শান্তি বজায় রেখে ওমরাহ করতেই চাচ্ছিলেন, তাই তিনি উদারতা ও ক্ষমার পরিচয় দিয়ে সবাইকে বিনাশর্তে ছেড়ে দিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা কোরআনে নাজিল করলেন, ‘তিনিই মক্কা উপত্যকায় তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করার পর তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন। আর তোমরা যা আমল কর, আল্লাহ হলেন তার সম্যক দ্রষ্টা।’ (সুরা ফাতহ: ২৪)
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) মুশরিকদের কাছে তার সফরের মূল উদ্দেশ্য আবারও পরিষ্কার করার জন্য একজন দূত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমে তিনি হজরত ওমরকে (রা.) নির্বাচন করলে ওমর (রা.) বিনয়ের সাথে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! মক্কায় আমার গোত্রের এমন কেউ নেই যে আমি বিপদে পড়লে আমার পাশে দাঁড়াবে। আপনি বরং ওসমানকে পাঠান, কারণ সেখানে তার শক্তিশালী পরিবার ও আত্মীয়স্বজন রয়েছে।
রাসুল (সা.) তখন হজরত ওসমানকে (রা.) বললেন, তুমি মক্কায় যাও এবং তাদের বলো, ‘আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি; কেবল ওমরাহ করতে এসেছি। আর তাদের ইসলামের দাওয়াত দাও।’ এ ছাড়া মক্কায় লুকিয়ে থাকা ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কাছে বিজয়ের সুসংবাদ পৌঁছে দিতে বললেন, যেন তারা জানতে পারে যে খুব শীঘ্রই আল্লাহ তার দ্বীনকে মক্কায় বিজয়ী করবেন এবং কাউকেই আর ইমান গোপন রাখতে হবে না।
হযরত ওসমান (রা.) রওনা হয়ে মক্কায় পৌঁছালেন এবং মুশরিক নেতাদের কাছে রাসুলের (সা.) বার্তা হুবহু পৌঁছে দিলেন। মুশরিকরা তাকে বলল, ‘তুমি চাইলে বায়তুল্লাহ তওয়াফ করে নিতে পারো।’ কিন্তু ওসমান (রা.) বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি কাবা তওয়াফ করব না।’
রাসুলের (সা.) প্রতি ওসমানের (রা.) এই ভালোবাসা মুশরিকদের ভালো লাগল না। তারা তাকে আটক করল। হয়তো তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য সময় নিচ্ছিল, কিংবা ওসমানকে আঁটকে রেখে মুসলিমদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ওসমানের (রা.) ফিরতে দেরি হওয়ায় মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
রাসুল (সা.) যখন এই খবর শুনলেন, তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘এদের সাথে একটা চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখান থেকে নড়ব না।’
তিনি তৎক্ষণাৎ সাহাবিদের বাইআত বা আনুগত্যের শপথ নেওয়ার আহ্বান জানালেন যে, ওসমান হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে আমরা মদিনায় ফিরবো না। সব সাহাবি শপথ নেওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের এক হাত অন্য হাতের ওপর রেখে বললেন, ‘এই হাত ওসমানের পক্ষ থেকে।’
কোরআন মাজিদে এই শপথের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হলেন যখন তারা গাছের নিচে তোমার কাছে বাইয়াত নিচ্ছিল। তাদের অন্তরে কী ছিল তা তিনি জানতেন, তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাদের পুরস্কৃত করলেন এক নিকটবর্তী বিজয় দিয়ে।’ (সুরা ফাতহ: ১৮)
এই আয়াতের সূত্র ধরেই এই ঐতিহাসিক শপথের নাম হয় \'বাইয়াতে রিদওয়ান\' বা আল্লাহর সন্তুষ্টির শপথ। হুদাইবিয়ার প্রান্তরে একটি সায়ল বা বাবলা গাছের নিচে এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শপথের সময় হজরত ওমর (রা.) রাসুলের (সা.) হাত ধরে ছিলেন এবং মা\'কিল ইবনে ইয়াসার (রা.) রাসুলের (সা.) মাথার ওপর গাছের ডাল উঁচু করে ধরে রেখেছিলেন।
ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনার বিবরণ বিভিন্ন সূত্রে এসেছে। তাবারিতে হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হুদাইবিয়ায় রাসুলের (সা.) একজন ঘোষণাকারী ডেকে উঠলেন, ‘লোক সকল! বাইয়াত করো, বাইয়াত করো! জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়েছেন।’ সালামা (রা.) বলেন, আমরা রাসুলের (সা.) দিকে ছুটে গেলাম, তিনি তখন একটি বাবলা গাছের নিচে ছিলেন এবং আমরা তাঁর হাতে বাইয়াত নিলাম।
সর্বপ্রথম যিনি এগিয়ে এসেছিলেন, সেই আবু সিনান (রা.) রাসুলকে (সা.) বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! হাত বাড়ান, আমি আপনার হাতে বাইয়াত নেব।’ রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিসের ওপর?’ তিনি বললেন, ‘আপনার অন্তরে যা আছে তার ওপর।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার অন্তরে কী আছে?’ তিনি বললেন, ‘বিজয় অথবা শাহাদাত।’ এরপর বাকীরাও এসে বলতে লাগল, ‘আমরাও আবু সিনানের মতো বাইয়াত নিচ্ছি।’
এই বাইয়াতের খবর শুনে মক্কার মুশরিকরা ভয় পেয়ে গেল। তারা ওসমানকে (রা.) মুক্ত করে দিল এবং সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু করল।
কোরআনের আয়াত ও একাধিক হাদিস থেকে বোঝা যায়, বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ নেওয়া সমস্ত সাহাবি জান্নাতি। উম্মে মুবাশশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছেন, ‘গাছের নিচে যারা শপথ নিয়েছে, তাদের কেউই ইনশাআল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করবেন না।’ (সহিহ মুসলিম)
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন