আল্লামা ইকবাল ভিন্নভাষী কবি হলেও বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ও প্রিয় কবি। তাঁকে ঘোরতরভাবে অপছন্দ করে এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কটাই মূলত ক্ষোভের কারণ। তবে কবিতামোদী পাঠকমাত্রই তাঁর অসাধারণ কবিপ্রতিভার প্রভাব স্বীকার করতে বাধ্য। বলা বাহুল্য তাঁর কবিতার বিস্তার অপরিমেয়, বহুমুখী ও বহুবর্ণিল। অনুবাদক জাভেদ হুসেন আল্লামা ইকবালের কবিতা নামের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ইকবালের লেখা উর্দু ও ফারসি কবিতার অনুবাদ৷ সেগুলো চয়ন করার ক্ষেত্রে প্রধানত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের নির্বাচনেই আস্থা রেখেছেন তিনি। ইকবালের সব উর্দু গজলের নির্বাচিত পঙ্ক্তি এ সংকলনজুড়ে রয়েছে। অনুবাদকের প্রধান সাফল্য এটাই যে ইকবালকে তিনি প্রশ্নহীন অপ্রতিরোধ্য আবেগ ও অনুরাগে অবিরাম আন্দোলিত করে উপস্থাপন করেননি। তিনি সচেষ্ট ছিলেন সর্বাধিক নির্মোহ থাকতে। পাঠক সে কারণে বিশ্বাস ও বেদনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক ইকবালকে এ বইতে পাবেন।
‘মুখবন্ধ’ অংশে ইকবালকে মূল্যায়নের কিছু প্রক্রিয়া উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে মূল্যায়নকারীদের মধ্যে চিন্তাগত ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। ঐতিহাসিকভাবেই ইকবালকে মূল্যায়নের সময় ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইকবাল’ তকমাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়৷ সমালোচনার ইটপাটকেল বর্ষিত হয় তখনই। বাংলা ভাষায় ইকবালের ওপর ব্যাপক লেখালেখি ও আলোচনা অনুষ্ঠান হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইকবালের কবিতার নন্দনতত্ত্ব বিশ্লেষণ উপেক্ষিত থেকেছে৷ ফয়েজ আহমদ ফয়েজের আক্ষেপ ছিল এটা নিয়ে৷ অনুবাদক তাঁর বিশদ আয়োজনে সে ঘাটতি পূরণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন।

যেকোনো প্রকারে ইকবালকে পাঠ করলে তাঁর কবিতার রসাস্বাদন সম্ভব নয়। ‘ইকবাল পাঠের প্রস্তাবনা’ অংশে অনুবাদক ইকবালকে পাঠ করার তাত্ত্বিক পদ্ধতির রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন। কেন ‘কবি ইকবাল’ বর্তমান সময়েও পাঠযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক, সে ব্যাখ্যা যেমন আছে এতে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ‘কবি’ হিসেবে তাঁকে গুরুত্ব কম দেওয়ার নেপথ্যের বিষয়গুলোও অনুবাদক তুলে এনেছেন মুনশিয়ানায়। তিনি দেখিয়েছেন, প্লেটোর তৈরি করা তাত্ত্বিক ছাঁচে আটকে পড়ে ইকবালকে শুধু তাঁর দর্শনের জালে বন্দী করলে আখেরে বঞ্চিত হতে হবে আমাদেরই। তাঁর মূল্যায়ন—‘একজন পাঠক যখন সব তকমা ঝেড়ে ফেলে ইকবালের কবিতার দরজায় দাঁড়াবেন, তখন তিনি এক বিশাল ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকার খুঁজে পাবেন। ইকবাল কোনো শূন্যস্থান থেকে কবিতা লেখেননি। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় পাঁচটি শক্তিশালী ধারাকে ধারণ করেছিলেন।’ সে পাঁচটি ধারার বিবরণও এ অংশে রয়েছে।
ইকবালের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করেছেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু ইকবালের নিজের দৃষ্টিতে তাঁকে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস তুলনামূলক বিরল। ফয়েজের ‘নিজের দৃষ্টিতে ইকবাল’ প্রবন্ধটি সেই আত্ম-অনুসন্ধানেরই একটি সূচনা। ইকবালের দর্শনের কেন্দ্রীয় ভাবনায় রয়েছে খুদি বা আত্মশক্তি, জ্ঞান, প্রেম, স্রষ্টা ও মানুষের সম্পর্ক। এসবের পাশাপাশি তাঁর নিজের সত্তাও তাঁর কাব্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর কবিতার প্রতিটি পর্যায়েই আত্মপরিচয়ের এ অনুসন্ধানের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ফয়েজের বিবেচনায়, ইকবালের আত্মসত্তাসম্পর্কিত কবিতাগুলো তাঁর সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে আন্তরিক ও হৃদয়গ্রাহী অংশ। সেখানে দার্শনিক জটিলতার চেয়ে অনুভূতির গভীরতা তীব্রতর। আত্মিক উপলব্ধির সৌন্দর্যও কিছু কম নয়। এ অংশেই তাঁর প্রকৃত কবিসত্তা সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ইকবালের দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ছিল ধীর, স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক। ইকবাল নিজেকে কখনো জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখেননি। তাঁর আত্মবিশ্লেষণ সব সময় প্রকৃতি, মানুষ, স্বদেশ, আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।
‘ইকবালের চোখে ইতিহাস ও সমাজ’ শীর্ষক লেখাটিতে ইকবালের ব্যাপক ও সুগভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। ইকবালের বোঝাপড়া ঐতিহাসিক জ্ঞানকাণ্ডের সীমা-পরিসীমা পুনর্বিবেচনায় একেবারে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন না করলেও, চিন্তাজগতের আরেক বাতায়ন খুলেছে নিঃসন্দেহে।
এ সংকলনের তৃতীয় অংশে স্থান পেয়েছে ইকবালের ফারসিতে রচিত ‘পায়াম-এ-মাশরিক’ থেকে ফয়েজের নির্বাচিত উর্দু অনুবাদ-সংকলন অবলম্বনে করা কবিতার তরজমা। চতুর্থ অংশে রয়েছে ইকবালের উর্দু গজলসমগ্র থেকে নির্বাচিত কিছু অনন্য পঙ্ক্তি। এগুলো বর্তমান অনুবাদকের নিজস্ব চয়ন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক:
‘পর্দার আড়ালে সুরের কারিগর কে,
তা আমি জানি না
তবে জীবনের সুর আসলে কী, আমি খুব
ভালো করেই জানি
আমি বাগানের বৃক্ষশাখায় এমন সুরে গান
গেয়েছি যে
ফুল এখন বাগানের পাখিকে জিজ্ঞেস করছে,
এই গায়কটি কে?’
অনুবাদকের পরিমিত শব্দজ্ঞান, শিল্পসুষমিত অনুবাদ পাঠককে সেই গায়কের সন্ধানই দেয়; তার দরবারেও নিয়ে যায়।
ইকবালকে ঘিরে বহুমাত্রিক পরিচয়ের আড়ালে যে কবিসত্তা অনেক সময় আচ্ছন্ন হয়ে যায়, এ সংকলন সেই ‘কবি ইকবাল’কে নতুন করে আবিষ্কারের একটি প্রয়াস। তাঁর কাব্যভাষা, ভাবনা, নির্মাণশৈলী ও সৃষ্টির অন্তর্লীন সৌন্দর্য পাঠকের সামনে উন্মোচিত করাই এর লক্ষ্য।
ইকবাল মানুষের অনুভূতির মানচিত্রে নির্মাণ করেছেন চেতনার নবতর অট্টালিকা; সৃষ্টি করেছেন অন্তরাত্মার নতুন ভাষা। জাভেদ হুসেনের দুর্দান্ত ও কেজো অনুবাদে বর্তমান গ্রন্থটি কবিতা-রাজ্যে ইকবালের সম্রাট হয়ে ওঠার শিল্পিত চিত্ররূপ। বইটি ইকবালের কাব্যজগতের গভীরে প্রবেশের জন্য পাঠকের মনে নতুন কৌতূহল ও অনুরাগের জন্ম দেবে, এ আশা করাই যায়।
আল্লামা ইকবালের কবিতা
অনুবাদ: জাভেদ হুসেন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
পৃষ্ঠা: ১৪৪; মূল্য: ৩২০ টাকা
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>