বিজ্ঞাপন
মাথাটা সব সময় ভর্তি থাকে। ঘুমাতে গেলেও মনে মনে দিনের কাজের তালিকা ঘুরতে থাকে। তিন সন্তানের মা স্টেসি ম্যাথিয়াসের কথায় উঠে আসে এমন এক ক্লান্তির ছবি, যা অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। সংসারের কাজ শুধু রান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা ঘর পরিষ্কার করাতেই শেষ নয়। এর বাইরেও থাকে অসংখ্য ছোট ছোট বিষয় মনে রাখা, পরিকল্পনা করা, সময় ঠিক করা এবং আগেভাগে সবকিছু ভেবে রাখা।
এই অদৃশ্য দায়িত্বকেই বলা হয় ‘মানসিক বোঝা’।
সন্তানের স্কুলে কখন ছুটি, কবে শিক্ষা সফর, অভিভাবকদের বার্তা আদান-প্রদানের দলে নতুন কোনো তথ্য এসেছে কি না, কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, ঘরে কোন জিনিস শেষ হয়ে যাচ্ছে কিংবা সন্তানের কতটা ঘুম হচ্ছে—এসব বিষয়ও কারও না কারও মাথায় রাখতে হয়। গবেষণা বলছে, দম্পতিদের মধ্যে এই দায়িত্বের বড় অংশই অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ওপর পড়ে।
কাজ শেষ হলেও দায়িত্ব শেষ হয় না
সেপ্টেম্বর মাস এলেই স্টেসির মাথার ভেতর যেন কাজের তালিকা আরও দীর্ঘ হয়ে যায়।
তার ভাষায়, কখন কী মনে রাখতে হবে, কী আয়োজন করতে হবে, কী নিয়ে চিন্তা করতে হবে—এই অনুভূতিটাই সময়টাকে এত ব্যস্ত করে তোলে।
স্টেসি এই মানসিক চাপকে তুলনা করেন পানি ভরা একটি পাত্রের সঙ্গে। সারাদিন একের পর এক কাজ যোগ হতে থাকে। কেউ যদি সেই পাত্র থেকে কিছুটা পানি সরিয়ে না নেয়, দিনের শেষে সেটি উপচে পড়বেই।
তার মতে, তখন মানুষও একসময় নিজের সীমার কাছে পৌঁছে যায়।
মায়েদের ওপরই বেশি চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের ৩ হাজার অভিভাবককে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব গৃহস্থালি কাজে মানসিক পরিশ্রম বেশি প্রয়োজন, তার ৭১ শতাংশই সামলান মায়েরা।
কখন বিছানার চাদর ও তোয়ালে ধুতে হবে, ফ্রিজে রাখা খাবার কখন শেষ করতে হবে—এমন অসংখ্য বিষয় মনে রাখার দায়িত্বও তাদের ওপর বেশি থাকে।
অন্যদিকে বাবারা তুলনামূলকভাবে এমন কিছু কাজ বেশি করেন, যেগুলো নিয়মিত নয়। যেমন গাড়ির নির্দিষ্ট সময়ের রক্ষণাবেক্ষণ করানো।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিয়া রুপানার বলেন, মানসিক বোঝার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটি অদৃশ্য, দীর্ঘস্থায়ী এবং এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
কাজের জায়গায় গিয়ে মানুষ বাসনের কথা ভুলে থাকতে পারে। কিন্তু সংসারের মানসিক বোঝা সঙ্গে করেই তাকে চলতে হয়।
‘ডিফল্ট অভিভাবক’ হয়ে ওঠেন মায়েরা
অনেক মায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সন্তানের স্কুলসংক্রান্ত প্রায় সব যোগাযোগের দায়িত্ব ধীরে ধীরে তাদের ওপর চলে আসে।
স্কুলের অভিভাবকদের বার্তা আদান-প্রদানের দলে মাকে যুক্ত করা হয়। কখন স্কুলে নির্দিষ্ট পোশাক পরা যাবে না, কখন শিক্ষা সফর, কার জন্মদিন—সব খবরও পৌঁছায় মায়ের ফোনে।
পোর্টসমাউথের ৩৫ বছর বয়সী তিন সন্তানের মা সোফিয়া বলেন, সন্তানদের স্কুল সফরের টাকা দেওয়া থেকে শুরু করে স্কুলের মোবাইল ব্যবস্থায় দুপুরের খাবারের অর্ডার দেওয়া—সবই তিনি করেন। অথচ তার স্বামী সেই ব্যবস্থা নিজের ফোনে পর্যন্ত যুক্ত করেননি।
স্বামীকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু তার মনে হয়েছে, স্বামী এসবকে ‘ছোটখাটো কাজ’ হিসেবেই দেখেছেন।
সোফিয়ার প্রশ্ন, কাজটি করতে হয়তো কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু তার আগে সেই কাজের কথা মনে রাখা, পরিকল্পনা করা, সময় ঠিক করা এবং কীভাবে কাজটি হবে তা ভেবে রাখতেও তো সময় ও মানসিক শক্তি লাগে।
শুধু কাজ নয়, কাজের চিন্তাটাও ভাগ করতে হবে
লন্ডনের দুই সন্তানের বাবা স্যাম বেরি প্রথমবার স্ত্রী ‘মানসিক বোঝা’র কথা বলার সময় বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।
তার মনে হয়েছিল, তিনি তো অনেক কাজই করছেন—শিশুর ডায়াপার বদলানো, খাওয়ানোসহ নানা দায়িত্ব পালন করছেন।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি প্রায়ই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতেন, আমি কী করতে পারি?
পরে তিনি বুঝতে পারেন, এই প্রশ্নটিও কখনো কখনো দায়িত্বের একটা অংশ অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দেয়। কারণ তখন তাকেই ভাবতে হয়—কী কাজ করতে হবে, কখন করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে।
রাতের খাবারের উদাহরণ দিয়ে স্যাম বলেন, শুধু খাবার রান্না করাই দায়িত্ব নয়। ঘরে কী আছে, কী রান্না হবে, কী কী কিনতে হবে—এসব পরিকল্পনাও কাজের অংশ।
শত শত ছোট চিন্তাই বড় ক্লান্তি তৈরি করে
ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী নাতাশা ওয়ালেস বলেন, অনেক নারী তার কাছে এসে এমন চাপের কথা বলেন, যার পেছনে একটি বড় সমস্যা নয়; বরং থাকে শত শত ছোট ছোট দায়িত্ব।
একটির পর একটি ছোট সিদ্ধান্ত নিতে নিতে মস্তিষ্ক যেন আর বন্ধ হতে পারে না।
তার মতে, অনেক নারী দীর্ঘদিন ধরে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব কাজ করে যান। ফলে তারা নিজেরাই বুঝতে পারেন না, কতটা মানসিক চাপ তারা বহন করছেন।
এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ ঘুমের সমস্যা, বিরক্তি এবং বারবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করতে পারে।
অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞ আনিতা ক্লিয়ারও মনে করেন, এই মানসিক ক্লান্তির প্রভাব শুধু ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা কর্মক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় মানুষকে অসহনীয় ক্লান্তি বা কর্মদগ্ধতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আয় বাড়লেও কমে না মানসিক দায়িত্ব
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। পুরুষের আয় যত বেশি হয়, সংসারের শারীরিক ও মানসিক শ্রমে তার অংশগ্রহণ তত কমে—এমন প্রবণতা দেখা যায়।
অন্যদিকে নারীর আয় বাড়লে তারা শারীরিক গৃহস্থালি কাজ কিছুটা কম করলেও মানসিক দায়িত্ব একই রকম থেকে যায়।
এর প্রভাব পড়ে নারীর কর্মজীবনেও। পরিবারকে সামলাতে গিয়ে কেউ কর্মঘণ্টা কমান, কেউ খণ্ডকালীন কাজ বেছে নেন, আবার কেউ চাকরিই ছেড়ে দেন।
অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞ ক্লিয়ার মনে করেন, ঘরের মানসিক বোঝা কমানো গেলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি শক্তি, সময় ও মনোযোগ দিতে পারবেন।
এই বৈষম্যের শুরু কোথায়?
অনেক নারী মনে করেন, সন্তানের জন্মের পর থেকেই এই বৈষম্য তৈরি হতে শুরু করে।
ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ওয়ালেস বলেন, সাধারণত মায়েরা বাবাদের তুলনায় অনেক বেশি সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন। ফলে সন্তানের জীবনের শুরুতেই মা হয়ে ওঠেন ‘সবচেয়ে বেশি জানেন এমন অভিভাবক’।
কোথায় কী রাখা আছে, সন্তানের কী প্রয়োজন, কখন কী করতে হবে—সবকিছুর সঙ্গে মা বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর পরিবারের সবাই স্বাভাবিকভাবেই সবকিছুর জন্য তার কাছেই আসতে শুরু করে।
এমনকি মা আবার চাকরিতে ফিরে গেলেও সেই ভূমিকা সহজে বদলায় না।
যুক্তরাজ্যে মায়েরা সর্বোচ্চ ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত আইনগত মাতৃত্বকালীন ছুটি নিতে পারেন। বাবাদের জন্য আইনগত পিতৃত্বকালীন ছুটির সময় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অবশ্য বাবা-মা চাইলে নির্দিষ্ট নিয়মে ছুটি ভাগ করে নিতে পারেন।
সমাধান কি সব কাজ ৫০-৫০ ভাগ করা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান সব কাজ হুবহু অর্ধেক-অর্ধেক ভাগ করে নেওয়া নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো—দুজনের মধ্যে দায়িত্বের মালিকানা তৈরি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের তিন সন্তানের বাবা ও মানসিক বোঝা ভাগাভাগি নিয়ে কাজ করা কোচ জ্যাক ওয়াটসন বলেন, আগে তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতেন, রাতে কী রান্না করবো?
পরে বুঝেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও স্ত্রীর ওপর চাপ তৈরি করে। তাই এখন তিনি আগে ফ্রিজে কী আছে দেখেন, কয়েকটি খাবারের সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করেন এবং স্ত্রী চাইলে সেখান থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন।
অর্থাৎ শুধু কাজটি করে দেওয়া নয়, কাজটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নেওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।
দায়িত্বের একটি পুরো অংশ নিজের করে নেওয়া
স্যাম বেরির মতে, অনেক পুরুষ আসলে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে চান। কিন্তু তারা হয়তো বুঝতে পারেন না কীভাবে করতে হবে।
তাই তিনি ‘একটি কাজ’ নয়, বরং ‘একটি কাজের পুরো বিভাগ’ নিজের দায়িত্বে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
যেমন, বাবা সন্তানের স্কুলসংক্রান্ত সব প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব নিতে পারেন। মা সামলাতে পারেন খাবারের বিষয়টি।
এভাবে কে কোন দায়িত্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখবে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে একজনকে আর অন্যজনকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হয় না।
তবে সব পরিবারে একই নিয়ম কাজ করবে না। কারও একজন বেশি সময় কাজ করেন, আবার কারও একজন রান্না করতে বেশি পছন্দ করেন। তাই সমতা মানে সবকিছু সমান ভাগ নয়; বরং দুজনের জন্য কার্যকর একটি ব্যবস্থা তৈরি করা।
মানসিক বোঝা কমানোর কিছু উপায়
বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের পরামর্শ অনুযায়ী, সংসারের এই অদৃশ্য চাপ কমাতে কয়েকটি বিষয় কাজে আসতে পারে—
সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন—কোন দায়িত্বগুলো মানসিকভাবে আপনাকে বেশি চাপে ফেলছে, তা স্পষ্ট করুন। কোন কাজগুলো সত্যিই জরুরি, আর কোনগুলো বাদ দেওয়া যায়, তা ঠিক করুন। সন্তানের অভিভাবকদের সব বার্তা আদান-প্রদানের দলে সবসময় সক্রিয় থাকার প্রয়োজন আছে কি না, তা ভেবে দেখুন। দুজন মিলে একটি যৌথ ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে পারেন। এতে জন্মদিন, স্কুলের অনুষ্ঠান, চিকিৎসকের সময়সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুজনেরই জানা থাকবে। যে দায়িত্ব নেবেন, সেটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের দায়িত্বে নিন। বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন না। সবকিছু নিখুঁতভাবে করার চাপ কমান। সংসারকে আরও ‘দক্ষ’ করে তোলাই সবকিছু নয়।অদৃশ্য কাজের স্বীকৃতিই প্রথম পদক্ষেপ
সংসারের অনেক কাজ চোখে দেখা যায়—ঘর পরিষ্কার করা, রান্না করা, কাপড় ধোয়া। কিন্তু কোন কাজ কখন করতে হবে, কী শেষ হয়ে আসছে, সন্তানের কী প্রয়োজন—এসবের হিসাব থাকে মানুষের মাথার ভেতরে।
সমস্যা হলো, এই কাজগুলো চোখে দেখা যায় না বলেই অনেক সময় এগুলোকে ‘কাজ’ হিসেবেও ধরা হয় না।
অথচ দিনের শেষে ক্লান্তির বড় একটি অংশ আসে এই অদৃশ্য দায়িত্ব থেকেই।
তাই সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করার প্রথম ধাপ হয়তো কাজের তালিকা ভাগ করা নয়; বরং কে কতটা ভাবছে, পরিকল্পনা করছে এবং মনে রাখছে—সেটি স্বীকার করা।
কারণ একটি পরিবার শুধু যে কাজগুলো হাতে করে সম্পন্ন করা হয়, সেগুলোতেই চলে না। অনেক সময় একটি পরিবার টিকে থাকে এমন শত শত চিন্তার ওপর, যেগুলো কেউ একজন নীরবে নিজের মাথায় বয়ে বেড়ান।
সূত্র: বিবিসি
এমএসএম
বিজ্ঞাপন