বিজ্ঞাপন
একসময় যে শিশুটি সারা ঘরজুড়ে ছুটে বেড়াত, অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলত, সিঁড়ি ভাঙত অনায়াসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ যেন তার জীবনের ছন্দ বদলাতে শুরু করে। খেলতে গিয়ে সে অন্যদের তুলনায় বেশি পড়ে যায়। মাটিতে বসে থাকার পর উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে বারবার হাতের সাহায্য নিতে হয়। দৌড়াতে গেলে পিছিয়ে পড়ে, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যায়।
শিশুর এমন আচরণ দেখে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বিষয়টিকে স্বাভাবিক দুর্বলতা, অলসতা কিংবা বয়স অনুযায়ী বেড়ে ওঠার অংশ বলে মনে করেন। কিন্তু এটি মোটেও স্বাভাবিক নয়-এসব ঘটনাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ডুচেন মাসকুলার ডিস্ট্রফি (ডিএমডি)।
ডুচেন মাসকুলার ডিস্ট্রফি কী?
ডুচেন মাসকুলার ডিস্ট্রফি বা ডিএমডি একটি জিনগত রোগ, যা মূলত ছেলে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এই রোগের কারণে পেশী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। বিশেষ করে শরীরের বড় পেশিগুলো-পা, কোমর ও শরীরের কেন্দ্রীয় অংশের পেশি প্রথম দিকে বেশি আক্রান্ত হয়। একপর্যায়ে শরীর একদম অচল হয়ে পড়ে। এতে হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি ওঠা কিংবা শিশুর দৈনন্দিন চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ডিএমডির সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর মধ্য অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় খুব সাধারণ মনে হতে পারে।
শরীরের পেশি স্বাভাবিক রাখতে ডিস্ট্রোফিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন প্রয়োজন। এই প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা বহনকারী ডিএমডি জিনে ত্রুটি হলে শরীরে ডিস্ট্রোফিনের ঘাটতি বা অনুপস্থিতি তৈরি হয়।
আরও পড়ুন
মানুষ না খেয়ে কতদিন বাঁচে?
এক্স ক্রোমোজোমে অবস্থিত ডিস্ট্রোফিন জিনের মিউটেশনের কারণে ডিএমডি হয়। যেহেতু পুরুষদের শুধু একটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে, তাই একটি পরিবর্তিত কপির ফলে এই রোগ হয়। নারীরা বাহক হতে পারেন এবং দ্বিতীয়, সুস্থ এক্স ক্রোমোজোমের উপস্থিতির কারণে হালকা লক্ষণ দেখা দিতে পারে। জেনেটিক পরীক্ষা ডিস্ট্রোফিন জিনে মিউটেশনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে।
কখন দেখা দেয় রোগের লক্ষণ?
ডিএমডির লক্ষণ সাধারণত শৈশবেই দেখা দিতে শুরু করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ২ থেকে ৬ বছর বয়সের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্ট হতে থাকে। শিশু অন্যদের তুলনায় দেরিতে হাঁটা শুরু করতে পারে কিংবা হাঁটতে শেখার পরও বারবার পড়ে যেতে পারে। দৌড়ানোর সময় তার গতি কম থাকতে পারে, লাফ দিতে অসুবিধা হতে পারে কিংবা অন্য শিশুদের তুলনায় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময়ও বিশেষ ধরনের অসুবিধা দেখা যায়। শিশু প্রথমে হাত দিয়ে মেঝেতে ভর দেয়, এরপর নিজের উরুতে হাত রেখে ধীরে ধীরে শরীর ওপরে তোলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের উঠতে যাওয়ার ভঙ্গি ডিএমডির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কখনো কখনো শিশুর পায়ের পেশি অন্যদের তুলনায় শক্ত বা বড় দেখাতেও পারে। তবে এটি পেশির স্বাভাবিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ নয়। পেশি ক্ষয়ের সঙ্গে সেখানে চর্বি ও অন্যান্য টিস্যু জমে যাওয়ার কারণে পেশি তুলনামূলক বড় দেখাতে পারে।
তবে এসব লক্ষণের একটি বা দুটি দেখা দিলেই যে শিশুর ডিএমডি হয়েছে, এমন নয়। কিন্তু বয়স অনুযায়ী শিশুর শারীরিক বিকাশে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বা এসব লক্ষণ বারবার দেখা গেলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসা কি নেই?
ডিএমডিতে পেশির দুর্বলতা শুধু হাত-পায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সঙ্গে হৃদযন্ত্রের পেশি এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত পেশিও আক্রান্ত হতে পারে। তাই রোগটি দীর্ঘমেয়াদে শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ডিএমডির সম্পূর্ণ নিরাময় এখনো সম্ভব নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে আক্রান্ত শিশুর জন্য কিছুই করার নেই। রোগের অগ্রগতি ধীর করা, পেশির কার্যক্ষমতা যতটা সম্ভব ধরে রাখা এবং হৃদযন্ত্র ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতা মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও সহায়ক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, ফিজিওথেরাপি, উপযুক্ত শারীরিক কার্যক্রম ও ব্যায়াম এবং সুষম খাবার শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
মুঠোফোনের যুগে জোনাকি আর জোছনার হারিয়ে যাওয়া শৈশব
রোগ নির্ণয়ে দেরি কেন হয়?
ডিএমডির প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ শিশুর বেড়ে ওঠার কিছু সমস্যার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। ফলে অনেক পরিবার প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। কখনো শিশুকে দুর্বল, অলস বা খেলাধুলায় অনাগ্রহী মনে করা হয়। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে। শিশুর বয়স অনুযায়ী বিকাশে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কিংবা অস্বাভাবিক কোনো আচরণ বার বার দেখা গেলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডিএমডির ঝুঁকি কমানোর উপায়-
ডিএমডি একটি জিনগত রোগ হওয়ায় এর ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকে জানা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিবারে কারো ডিএমডির ইতিহাস থাকলে জেনেটিক কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় জিনগত পরীক্ষা সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। গর্ভাবস্থায়ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জিনগত পরীক্ষা করা হলে ভ্রূণের ডিএমডির ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তবে শুধু রোগের ঝুঁকি জানাই যথেষ্ট নয়। ডিএমডিতে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পরিবারকে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি শিক্ষা, খেলাধুলা এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এছাড়া ডিএমডি সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এই রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা থাকলে, মানুষ এর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।
সূত্র: অ্যাপোলো স্পিটাল
কেএসকে
বিজ্ঞাপন