বিজ্ঞাপন
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে দেশে দেশে নেওয়া হচ্ছে কঠোর পদক্ষেপ। কিন্তু এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। গত ডিসেম্বরে চালু হওয়া এই আইন অভিভাবকদের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছিল।
আরও পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ায় বন্ধ হলো লাখ লাখ অ্যাকাউন্ট / ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর
কিন্তু ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের মা হারিনি নাইডুর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি ছেলের অনলাইন সময় নিয়ন্ত্রণে ওয়াই-ফাই অ্যাকসেস সীমিত করা থেকে শুরু করে রাতে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মতো নানা চেষ্টা করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা চালুর পর ভেবেছিলেন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
কিন্তু তার কথায়, এতে ‘আক্ষরিক অর্থেই কিছুই হয়নি’। ছেলের ইউটিউব অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অ্যাকাউন্ট ছাড়াই ইউটিউবের ভিডিও দেখা যাচ্ছে।
তার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ইশানার এক্স, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটক অ্যাকাউন্টও রয়েছে।
১৬ বছরের কম বয়সীরাও অনলাইনে
ইশানার মতে, নিষেধাজ্ঞা এতটাই অকার্যকর মনে হচ্ছে যে মানুষজন এর কথা ভুলেই গেছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কিশোরদের ভিপিএন ব্যবহারও করতে হচ্ছে না।
অনেকে ভুয়া জন্মতারিখ দিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলছে। কেউ কেউ বাবা-মা বা ভাইবোনের তথ্য ব্যবহার করছে। আবার কয়েকজন বন্ধু মিলে যৌথ অ্যাকাউন্টও খুলছে।
আরও পড়ুন
নিউজিল্যান্ডেও বন্ধ হচ্ছে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার
ইশানার ধারণা, এতে বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি বিভ্রান্ত হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার পর এগোচ্ছে অন্য দেশও
অস্ট্রেলিয়ার পদক্ষেপের পর অন্যান্য দেশেও একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
নিউজিল্যান্ড গত ২৪ আগস্ট ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের নানা ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখার চেষ্টা সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয়।
আরও পড়ুন
শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করছে যুক্তরাজ্য
যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নতুন বিধিনিষেধ আনার বিষয়ে মেটাও সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে দৈনিক সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্ক্রল করার সীমাও রয়েছে।
গবেষণাও বলছে একই কথা
অস্ট্রেলিয়ার নীতিকে এখনই পুরোপুরি ব্যর্থ বলা হয়তো ঠিক হবে না। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণায় এর প্রভাব খুব সীমিত বলেই দেখা যাচ্ছে।
গত জুনে প্রকাশিত ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা চালুর তিন মাস পরও ১৬ বছরের কম বয়সীদের ৮৫ শতাংশ নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছিল।
আরও পড়ুন
এবার শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করতে চায় ডেনমার্ক
১২ ও ১৩ বছর বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটানো সময়ও আগের তুলনায় কমেনি।
বিকল্প প্ল্যাটফর্মে শিশুদের চলে যাওয়ার আশঙ্কা অবশ্য খুব বেশি সত্যি হয়নি। কারণ অনেক কিশোর-কিশোরী আগের প্ল্যাটফর্মগুলোতেই থেকে গেছে।
বয়স যাচাই প্রযুক্তিতেও সমস্যা
নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মুখচ্ছবি বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুজনের মধ্যে শুধু মুখ দেখে পার্থক্য করা সব সময় সম্ভব হচ্ছে না।
ভিক্টোরিয়ার ১৫ বছর বয়সী লুসিনার অভিজ্ঞতাও এমন। স্ন্যাপচ্যাট তার মুখ স্ক্যান করে বয়স ১৮ বছর বলে শনাক্ত করেছিল।
পার্থের কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তামা লিভারের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে কার্যকর করা কঠিন হওয়ায় নীতিটির যথেষ্ট পরীক্ষা হয়নি।
আরও পড়ুন
শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে নরওয়ে
পরিচয়পত্র দিয়ে বয়স যাচাইয়ের প্রস্তাব
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় প্রকৃত পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মতো বিধিনিষেধ চালু করা অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে মালয়েশিয়াও রয়েছে। দেশটি বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রভিত্তিক পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
মালয়েশিয়ার যোগাযোগ ও মাল্টিমিডিয়া কমিশনের আইনি পরামর্শক এল এস লিওনার্ডের মতে, এটি অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহৃত বয়স যাচাই পদ্ধতির চেয়ে আরও নির্ভুল হতে পারে।
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্কুলে মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
তবে মালয়েশিয়াতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে না। প্ল্যাটফর্মগুলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দেওয়ার দাবি করলেও ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ
নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া শাখার ট্রিশিয়া ইয়োহ মনে করেন, প্ল্যাটফর্মগুলোর আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে।
পরিচয়পত্রের তথ্য সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব তথ্য হ্যাক হতে পারে।
আবার সরকার চাইলে এই তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে— এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নিরাপদ প্ল্যাটফর্মের দাবি
কেউ কেউ মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সমস্যার যথাযথ সমাধান নয়। কারণ এতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের সেবাকে আরও নিরাপদ করার দায়িত্ব থেকে আড়াল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কানাডা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি বিবেচনা করছে। দেশটি ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করতে চায়। তবে কোনো প্ল্যাটফর্ম নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মান পূরণ করলে সেখানে শিশুদের প্রবেশের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে কিশোরদের জন্য মেটার চালু করা নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে।
অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে।
শিশু-কিশোরদের কথাও শুনতে হবে
কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।
হারিনি নাইডুর ১৪ বছর বয়সী ছেলে মনে করে, অনেক কিশোরই অনলাইনে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয় তা জানে।
যেমন সে নিজে এক্স ব্যবহার করে না। তার মতে, সেখানে কনটেন্ট ‘খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত’। বরং সে রেডিট পছন্দ করে, যেটি তার কাছে তুলনামূলকভাবে কম বিশৃঙ্খল মনে হয়।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখা কঠিন।
বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা এবং তরুণদের ডিজিটাল সচেতনতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করেই কার্যকর নীতি তৈরি করতে হবে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/
বিজ্ঞাপন