বিজ্ঞাপন
প্রতি দুই বছরে দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। অথচ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণে পিছিয়ে বাংলাদেশ। ভারতের ২০টি ও পাকিস্তানের সাতটি সাবমেরিন ক্যাবল থাকলেও বাংলাদেশের রয়েছে মাত্র দুটি। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে ইন্টারনেট খাতের ভবিষ্যৎ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন নতুন সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণে এগিয়ে চললেও বাংলাদেশের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি বেসরকারিভাবে নির্মাণাধীন একটি সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানই। রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রভাবও।
এদিকে আইটিএস থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানিতে গত ১৩ বছরে প্রতিবেশী দেশ ভারতকে প্রায় ৩শ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণ সম্ভব ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তথ্য পর্যালোচনা ও খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
আরও পড়ুন
নতুন সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হলে ইন্টারনেটের দাম কমবে ৫০ শতাংশ
দেশে বর্তমানে দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল- সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। সরকারিভাবে আরেকটি নির্মাণের প্রক্রিয়া চললেও তাতে গতি নেই। এমনকি বেসরকারিভাবে সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণের প্রক্রিয়াও আটকে রয়েছে। দেশে বর্তমানে ব্যান্ডউইথের কোনো সংকট না থাকলেও নতুন সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যান্ডউইথের সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করতে ২০২৩ সালের শেষ দিকে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণের লাইসেন্স পাওয়া তিনটি কোম্পানি।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেমের (বিপিসিএস) অধীনে থাকা সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড, সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেড, মেটাকোর সাবকম লিমিটেড যৌথভাবে সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণের কাজ অনেকটাই এগিয়ে এনেছে। এরই মধ্যে দেশের সাতটি মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি পেলেও বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণের অনুমতি আটকে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থায় (এনএসআই)।
আর বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পে এরই মধ্যে ৩২ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছে কনসোর্টিয়ামটি।
বেসরকারি উদ্যোগে সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ফরওয়ার্ডিং না পাওয়ায় আটকে আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) অনুমোদনের বিষয় থাকলেও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে ফরওয়ার্ডিং না দেওয়ায় তারা প্রক্রিয়াটি শুরু করতে পারছে না।-সিডিনেট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের সিইও মশিউর রহমান
জানতে চাইলে সিডিনেট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মশিউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি উদ্যোগে সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ফরওয়ার্ডিং না পাওয়ায় আটকে আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) অনুমোদনের বিষয় থাকলেও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে ফরওয়ার্ডিং না দেওয়ায় তারা প্রক্রিয়াটি শুরু করতে পারছে না।
আরও পড়ুন
সাবমেরিন ক্যাবল রক্ষণাবেক্ষণে চারদিন বিঘ্নিত হতে পারে ইন্টারনেট সেবা
সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে সরাসরি এখনো কোনো আলোচনা বা যোগাযোগ হয়নি। তারা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বিভিন্ন বিষয়ে বিটিআরসির সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আমাদের কাছে সরাসরি কিছু চাওয়া হয়নি। আমরা বেসরকারি কোম্পানি হওয়ায় আমাদের ফোকাল পয়েন্ট হলো বিটিআরসি।’
সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিন কোম্পানি মিলে কনসোর্টিয়ামটি গঠন করা হয়। এর পর থেকেই বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছিল।
দেশ প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে। ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ কমে যাবে। কোয়ালিটি অব সার্ভিস ২৫-৩০ শতাংশ বাড়বে, ল্যাটেন্সি কমবে।-মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম
এ বিষয়ে মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশ প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে। ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ কমে যাবে। কোয়ালিটি অব সার্ভিস ২৫-৩০ শতাংশ বাড়বে, ল্যাটেন্সি কমবে। নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০-৩০ শতাংশ বাড়বে। আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি নয়, আইটিসি (ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল)।’
দেশে সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেন, ‘আগামী ২০৩০ সালে ৫০টিবিপিএস ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হবে। ১২টিবিপিএস থেকে ৫০টিবিপিএস, এটি একটি সাবমেরিন ক্যাবল না, দুটি না, নতুন তিনটি সাবমেরিন ক্যাবল প্রয়োজন। এটি পূরণের জন্য আগামী ৩-৫ বছরের মধ্যে শুধু একটি না, একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল দেখা যাবে। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে যেমন হবে তেমনি বেসরকারিভাবেও এগিয়ে আসবে।’
মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রকার পূর্বানুমোদন ছাড়া আলাদাভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথভাবে কনসোর্টিয়াম গঠন করার কোনো সুযোগ নেই। আমি শুনেছি যে এই কোম্পানিগুলোকে স্বতন্ত্র লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তারা নিজেদের যে কনসোর্টিয়ামটা করেছে, উইদাউট দ্য পারমিশন অব দ্য মিনিস্ট্রি।-ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম
তবে কনসোর্টিয়াম গঠন নিয়ে আপত্তির কথা বলেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রকার পূর্বানুমোদন ছাড়া আলাদাভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথভাবে কনসোর্টিয়াম গঠন করার কোনো সুযোগ নেই। আমি শুনেছি যে এই কোম্পানিগুলোকে স্বতন্ত্র লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তারা নিজেদের যে কনসোর্টিয়ামটা করেছে, উইদাউট দ্য পারমিশন অব দ্য মিনিস্ট্রি।’
সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ প্রকল্পের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল এলে সরকারের ১২শ কোটি টাকার কী হবে।
প্রতি দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে ব্যান্ডউইথের চাহিদা
২০১৬ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ২৫০ জিবিপিএস, ২০১৮ সালে তা বেড়ে ০ দশমিক ৭৬ টেরাবিট, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টেরাবিট, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টেরাবিট ও ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ, ১৩ বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ। বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৪ সালে ২১৬ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।
আরও পড়ুন
সাবমেরিন ক্যাবলের কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হলো বাংলাদেশ
ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, এআই, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও শিল্পখাতে ডিজিটালাইজেশনের কারণে এ চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের মূল ভরসা বর্তমানে দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল- সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ আইটিসির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। ঝুঁকি আরও বাড়ছে দুটি ক্যাবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায়। কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা হলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে ব্যান্ডউইথ ঘাটতি প্রায় ২০ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।
সাবমেরিন ক্যাবলে পিছিয়ে বাংলাদেশ
তথ্য বলছে, বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে, ব্যান্ডউইথের চাহিদা ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট। ভারতের রয়েছে ২০টি এবং আরও তিনটি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। তাদের ব্যান্ডউইথের চাহিদা ২০০ টেরাবিট। পাকিস্তানের সাতটি সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে, নির্মাণাধীন দুটি। তাদের চাহিদা ১০ টেরাবিট।
সিঙ্গাপুরের ৩০টি সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে, নির্মাণাধীন ১৩টি, দেশটির ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৩০০ টেরাবিট। মালয়েশিয়ার রয়েছে ২৪টি সাবমেরিন ক্যাবল, কাজ চলছে আরও পাঁচটির, দেশটির ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৪০ টেরাবিট। আর শ্রীলঙ্কার সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে আটটি, নির্মাণের পথে আরও একটি, দেশটির চাহিদা ৫ টেরাবিট।
পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারত অনেক এগিয়ে থাকলেও সরকারি-বেসরকারি কোনো খাতেই সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণে কাজ করছে না বাংলাদেশ।
দেশীয় দুই সাবমেরিন ক্যাবলের বর্তমান চিত্র
দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের প্রধান ভরসা বর্তমানে সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। কিন্তু দুটিই এখন ঝুঁকির মুখে। সি-মি-উই-৪ ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হয়। এর ডিজাইন লাইফ ছিল ২০ বছর। দুই ফাইবার পেয়ার থাকা ক্যাবলটির প্রাথমিক সক্ষমতা ছিল ১ দশমিক ২৮ টেরাবিট/সেকেন্ড, যা ২০১৫ সালে উন্নীত করে ৪ দশমিক ৬ টেরাবিট করা হয়।
তবে বর্তমানে এর এক্সপ্রেস ফাইবার পেয়ারের সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহৃত, ক্যাবলটি মূল নকশাগত আয়ুষ্কাল পার করেছে ও ঘন ঘন ত্রুটির কারণে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্পেয়ার কম্পোনেন্টও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন
ফরিদপুর / সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে চরবাসীর নতুন জীবনে পুরোনো দুর্ভোগ
সি-মি-উই-৫ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চালু হয়। এর প্রাথমিক সক্ষমতা ছিল ২৪ টেরাবিট, যা ২০১৯ সালে ৩৮ টেরাবিটে উন্নীত করা হয়। সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫ এ এখন পর্যন্ত ১৭টি ত্রুটি ধরা পড়েছে। সি-মি-উই-৪ এ রিপোর্টেড হয়নি এমন ত্রুটি তিনটি। একটি ক্যাবল অচল হলে সেটি পুনরুদ্ধারে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে। এছাড়া সি-মি-উই-৬ নির্মাণের বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
১৩ বছরে ব্যান্ডউইথ কিনতে ভারতে গেছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার
প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ২০১৭-২০২৫ সময়ে আইটিসি ব্যান্ডউইথ আমদানি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬-২৭ সালে তা ৩৩৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ দেশে রেখে সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
ভারতের তিনটি কোম্পানি থেকে আইটিসি ব্যান্ডউইথ আমদানি করা হয়। তথ্য বলছে, গত ১৩ বছরে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানির জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারতে পাঠানো হয়েছে- এর মধ্যে গত ৮ বছরেই প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেই বাংলাদেশ এমন সাবমেরিন সিস্টেম নির্মাণ করতে পারে, যা দেশের অর্থ দেশের ভেতরেই ধরে রাখতে সহায়তা করবে।
বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণের অগ্রগতিও অনেক
বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পটি নির্মাণে এরই মধ্যে মেরিন রুট সার্ভে শেষ হয়েছে। মেরিন ক্যাবল ও অরবিটাল অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম (ওএমএম) ম্যানুফেকচারিং শেষ হয়েছে। সম্পন্ন হয়েছে শিপ বুকিংয়ের কাজ। বাংলাদেশের বাইরে মেরিন লেয়িংয়ের কাজ চলমান। প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় প্রায় দুই হাজার ৭শ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। তিনটি কোম্পানি ৯শ কোটি টাকা করে ব্যয় বহন করবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন ৪২ মিলিয়ন ডলার। বিটিআরসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে এরই মধ্যে ৩২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ১০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করার কথা রয়েছে। আর এ প্রকল্পটি সিঙ্গাপুর থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত দুই হাজার ২২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইউএমও’ ক্যাবল সিস্টেমের প্রধান রুটের সঙ্গে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৩শ কিলোমিটারের একটি সংযোগ শাখা তৈরি করবে।
আরও পড়ুন
তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ
তবে এখন সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চূড়ান্ত কাজ আটকে আছে। চূড়ান্ত অনুমোদন না থাকায় বঙ্গোপসাগর এলাকায় তারা ক্যাবল স্থাপন করতে পারছে না। বাংলাদেশ অংশে মাত্র ১৬৫ কিলোমিটার এলাকায় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের কাজ বাকি।
কেন সাবমেরিন ক্যাবল প্রয়োজন
সাবমেরিন ক্যাবল শুধু দ্রুত ইন্টারনেটের জন্য নয়, এটি কম দামে ইন্টারনেট, ডিজিটাল অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও বাংলাদেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সাবমেরিন ক্যাবল হলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের সরবরাহ বাড়বে। ফলে পাইকারি ইন্টারনেটের দাম কমবে ও সাধারণ মানুষ কম খরচে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে।
সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ল্যাটেন্সি কমে। ফলে ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিং, ক্লাউড সেবা ও অনলাইন শিক্ষায় গতি ও মান উন্নত হবে। একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল থাকলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিকের চাপ ভাগ হয়ে যায়। এতে ব্যস্ত সময়ে ধীরগতি ও নেটওয়ার্ক সমস্যা কম হবে। মানুষের মাথাপিছু ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বাড়লে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারিত হবে এবং জিডিপি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উন্নত আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকলে সিডিএন, ক্লাউড, ওটিটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রতিষ্ঠান ও সেবা বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে স্থাপিত হতে পারে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট থাকলে ফ্রিল্যান্সার ও বিপিও প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ভালোভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করতে পারবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে।
এছাড়া নতুন সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণ হলে ঢাকা-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম করিডোরকে একটি আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ইন্টারনেট ট্রানজিট দেশ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্যাটেলাইটের চেয়ে সাবমেরিন ক্যাবল কেন গুরুত্বপূর্ণ
স্যাটেলাইটের তুলনায় সাবমেরিন ক্যাবল আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিপুল পরিমাণ ডেটা পরিবহনে এর সক্ষমতা বেশি, ল্যাটেন্সি কম ও প্রতি টেরাবিটে খরচ তুলনামূলক কম। বিশ্বের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ডেটার ৯৯ শতাংশের বেশি সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফাইবার-অপটিক এসব ক্যাবল দীর্ঘ দূরত্বে বিপুল ব্যান্ডউইথ দ্রুত পরিবহন করতে পারে। সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যাটেন্সি প্রায় ৭৫ মিলিসেকেন্ড এবং স্যাটেলাইটের প্রায় ৫১০ মিলিসেকেন্ড ।
স্যাটেলাইট দুর্গম এলাকা বা বিকল্প/ব্যাকআপ যোগাযোগে কার্যকর হলেও, দেশের মূল আন্তর্জাতিক ডেটা পরিবহনের বিকল্প হিসেবে সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা, গতি ও ব্যয়ের সুবিধা বেশি।
ইএইচটি/এএসএ
বিজ্ঞাপন