লতা মঙ্গেশকর না আশা ভোসলে—কে সেরা? রাহুল দেববর্মনও বোধ হয় এই প্রশ্নের সহজ উত্তর খুঁজে পাননি। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মতে, আশাকে দিয়ে যেকোনো গান গাওয়ানো যায়। কিন্তু কিছু গান আবার লতা ছাড়া হয় না!’
দুই বোনকে নিয়ে গীতিকার ও পরিচালক গুলজারের তুলনাটি ছিল আরও চমৎকার। তাঁর ভাষ্যে, চাঁদে দুজন মানুষ একই সঙ্গে নামলেন। প্রথম যিনি পা রাখলেন, তাঁকে নিয়ে এত মাতামাতি হলো যে দ্বিতীয়জনের কথা প্রায় ভুলেই গেল সবাই। অথচ তিনিও তো একই সঙ্গে চাঁদে গিয়েছিলেন! গুলজারের সেই ‘দ্বিতীয় মানুষটি’ ছিলেন আশা ভোসলে।
গতকাল ৮ সেপ্টেম্বর আশা ভোসলের জন্মদিন ছিল। ১৯৩৩ সালের এই দিনে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্মেছিলেন ভারতীয় সংগীতের এই কিংবদন্তি। বেঁচে থাকলে মঙ্গলবার ৯৩ বছর পূর্ণ করতেন তিনি।
কিন্তু এবারের জন্মদিনটি অন্য রকম, আশা ভোসলে নেই। গত ১২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে মারা যান তিনি। প্রচণ্ড ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণ নিয়ে আগের দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংগীতের আট দশকের এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
মাত্র ১০ বছর বয়সে গান শুরু করেছিলেন আশা। এরপর আট দশকের বেশি সময়ের সংগীতজীবনে হিন্দি, মারাঠি, বাংলা, তামিল, গুজরাটিসহ বিভিন্ন ভাষায় ১১ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেন। ধ্রুপদি, গজল, রোমান্টিক গান থেকে ক্যাবারে, পপ—কণ্ঠের বৈচিত্র্য তাঁকে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ। গ্র্যামি পুরস্কারের জন্যও দুবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের বিপুল জনপ্রিয়তার ছায়ায় যাত্রা শুরু করলেও নিজের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন আশা। বিশেষ করে ও পি নাইয়ার ও রাহুল দেববর্মনের সুরে তাঁর গান হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতে নতুন ভাষা তৈরি করে।

‘পিয়া তু আব তো আজা’র উচ্ছ্বাস যেমন তাঁর কণ্ঠে মানিয়েছে, তেমনি ‘উমরাও জান’–এর ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’র মতো গজলেও শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছেন। তাঁর এই বহুমুখিতাই তাঁকে কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে প্রাসঙ্গিক রেখেছিল।
নিজের পছন্দের ১০ গান
আট দশকের ক্যারিয়ারে হাজার হাজার গান গেয়েছেন আশা ভোসলে। এত বড় ভান্ডার থেকে তাঁর সেরা ১০ গান বেছে নেওয়া সহজ নয়। তবে কাজটি একবার সহজ করে দিয়েছিলেন শিল্পী নিজেই। এক সাক্ষাৎকারে নিজের গাওয়া গান থেকে পছন্দের ১০টি গানের কথা জানিয়েছিলেন আশা। সেই তালিকায় ছিল তাঁর সংগীতজীবনের বিভিন্ন সময় ও ভিন্ন স্বাদের গান।
১. ‘ইয়ে কায়া জাগা হাই দোস্তন’ ও ‘ইন আনখন কি মাস্তি কে’
আশা ভোসলে নিজের সেরা ১০ গানের তালিকার শীর্ষে রেখেছিলেন ‘উমরাও জান’ সিনেমার গান দুটিকে। মোহাম্মদ জহুর খৈয়ামের সুরে তিনি স্বাভাবিকের চেয়ে নিচু স্বরে গেয়েছিলেন—যা গানগুলোকে দিয়েছে এক রহস্যময়, আবেগঘন আবহ। চরিত্রে ঢুকতে পরিচালক মুজাফফর আলী তাঁকে উপন্যাস পড়তে দেন—এই প্রস্তুতিই গানে এনে দেয় অভিনব গভীরতা।

২. ‘জুঠে ন্যায়না’
১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘লেকিন’ সিনেমার গানটিকে নিজের পছন্দের দুইয়ে রেখেছেন আশা ভোসলে। হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের সুরে এই গান ছিল তাঁর জন্য এক চ্যালেঞ্জ। ক্লাসিক্যাল ঘরানার জটিলতা, দীর্ঘ রাতের রেকর্ডিং—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে তাঁর প্রিয় একটি সৃষ্টির স্মৃতি। সিনেমাটিতে এই একটি গানই গেয়েছিলেন তিনি, অন্যগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তাঁর বোন লতা মঙ্গেশকর।
৩. ‘কালি ঘাটা ছায়ে’
১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সুজাতা’ সিনেমার গান এটি। এস ডি বর্মনের সুরে গাওয়া গানটিকে আশা বলতেন ‘সাধারণভাবে অসাধারণ’। অভিনেত্রী নূতনের অভিনয় গানের আবেগকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

৪. ‘আয়ে মেহেরবান’
ও পি নায়ারের সুরে গানটি আশার কণ্ঠে হয়ে ওঠে কালজয়ী। ১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হাওড়া ব্রিজ’ সিনেমার গানটিতে পর্দায় মধুবালার উপস্থিতি গানটিকে অন্য মাত্রা দেয়—আশার মতে, ‘দর্শনেই অর্ধেক কাজ সারা।’
৫. ‘শোখ নজর কি বিলিয়া’
প্রখ্যাত সুরকার মদন মোহনের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের হিট গানের সংখ্যা বেশি, আশার সে তুলনায় কম। তবে এ গানটি ছিল ব্যতিক্রম। ‘ও কৌন থি’ সিনেমার গানটির স্কেটিং রিঙ্কে চিত্রায়ণ আলাদা বিশেষত্ব তৈরি করে।
৬. ‘রোজ রোজ আখো তলে’
‘জিবা’ সিনেমার গানটির কথা কে না জানে। স্বামী আর ডি বর্মনের সুরে গানটি গেয়েছিলেন আশা। তিনি বলতেন, পঞ্চমের (আর ডি বর্মনের ডাকনাম) অনেক গানই সময়মতো মূল্যায়ন হয়নি। এটি তেমনই একটি অবমূল্যায়িত রত্ন।
৭. ‘চেইন সে হামকো কাভি’
‘প্রাণ জায়ে পার বচান না জায়ে’ সিনেমার গানটিকে আশা বলতেন দুঃখের মুহূর্তের ‘উপশম’। গানের লিরিকস তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টের প্রতিফলন—যা গায়কিতে এনে দেয় সত্যিকারের আবেগ।
৮. ‘সাজনা হ্যায় মুঝে’
‘সওদাগর’ সিনেমার গানটিতে সুর করেছিলেন রবীন্দ্র জৈন। মেলোডিয়াস এবং চিত্রায়ণেও ছিল আবেগময় আবেদন, যা তাঁকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।

৯. ‘কাতরা কাতরা’, ‘ছোটি কি কাহানি সে’ ও ‘মেরা কুছ সামান’
গুলজার পরিচালিত ‘ইজাজত’ সিনেমার সব কটি গানই গেয়েছিলেন আশা ভোসলে। আর ডি বর্মনের সুরে সিনেমার গানগুলো ব্যাপক প্রশংসিত হয়। গানগুলোর মধ্যে এ তিনটি আশার একটু বেশিই প্রিয়। ‘ডাবল ভয়েস ইফেক্ট’ ব্যবহার করে ‘কাতরা কাতরা’ তৈরি করা হয়েছিল, যা সেই সময়ে ছিল একেবারে নতুন পরীক্ষা। গুলজারের জটিল লিরিকস নিয়ে রেকর্ডিংয়ের সময় নানান বিতর্কও হয়েছিল।
১০. ‘রাজ কি বাত হ্যায়’
রোশনের সুরে এই কাওয়ালি গানটি ছিল আশা ভোসলের অন্যতম প্রিয়। এমনকি বড় বোন লতা মঙ্গেশকরও এই গান পছন্দ করতেন। এটি ১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিল হি তো হ্যায়’ সিনেমার।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>