জাতীয়

‘পাগল’ বলতেন স্ত্রী, সেলিমের সংগ্রহশালায় এখন ইতিহাসের ছোঁয়া

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
শখের বশে স্কুলজীবনে ডাকটিকিট সংগ্রহ শুরু করেছিলেন। সেই শখই সময়ের সঙ্গে রূপ নিয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে। টাঙ্গাইলের ৭৩ বছর বয়সি ইসমাইল হোসেন সেলিমের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় রয়েছে জিম্বাবুয়ের ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যাংক নোট, ১৭২ দেশের মুদ্রা, ১১৭ দেশের দিয়াশলাই ও ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সালের তিন শতাধিক টেলিফোন। সঙ্গে আছে শতবর্ষী নানা প্রযুক্তিপণ্য, অটোগ্রাফ ও ঐতিহাসিক স্মারক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এসব সংরক্ষণই এখন তার একমাত্র স্বপ্ন। বর্তমানে নিজের বাসভবনের একটি কক্ষকে তিনি পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। সেলিমের সংগ্রহশালাটি এখন জেলায় সাধারণ মানুষের কাছে কৌতূহলের বিষয়। তার এ সংগ্রহশালাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন টাঙ্গাইলবাসী। ১১৭ দেশের দিয়াশলাইতার সংগ্রহে আছে নানা ধরণের ১১৭ দেশের বিভিন্ন সাইজের ও বিভিন্ন আকৃতির দিয়াশলাই। সংগ্রহে আছে ১৮৯৮ সালের এডিসন ফোনোগ্রাফের অরিজিনাল সিলিন্ডার রেকর্ড, ফোনোগ্রাফ রেপ্লিকা, ১৯৩৪ সালের ইংল্যান্ডের তৈরি এবং ১৯৪২ সালের এইচএমভি গ্রামোফোন, ১৯৪০ সালের ৮মি.মি. সাইলেন্ট মুভি প্রজেক্টর, ১৯৬০ সালের জার্মানের তৈরি রিল টু রিল টেপ রেকর্ডার বিভিন্ন দেশের তৈরি হ্যাজাক, হারিকেন, টাইপরাইটারসহ নানা সামগ্রী। সেলিমের সংগ্রহশালায় বিভিন্ন দেশের ডাক টিকিট ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সালের টেলিফোন টেলিফোন সেটগুলো ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সাল সময়ের। এর মধ্যে রয়েছে প্রিন্স, ক্যান্ডেলস্টিক, মেরিন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, রোটারি, মাইনিং, পিবিএক্সসহ বিভিন্ন ধরনের টেলিফোন। বাংলাদেশ টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)-এর তৈরি টেলিফোন এবং পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জাপান, জার্মানি, চায়না, কোরিয়া, হাঙ্গেরি সহ বিভিন্ন দেশের টেলিফোন। রয়েছে প্রথম সময়ের মোবাইল ফোন। খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অটোগ্রাফতার সংগ্রহে রয়েছে মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা, উডারল্যান্ড, রাদিচে, কফি আনান, বুট্রোস ঘালি, এডমন্ড হিলারি, ব্রজেন দাস, ভারতের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সুবীর সেন সহ দেশ বিদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ। টাঙ্গাইলের ৭৩ বছর বয়সি ইসমাইল হোসেন সেলিমের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় রয়েছে জিম্বাবুয়ের ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যাংক নোট, ১৭২ দেশের মুদ্রা, ১১৭ দেশের দিয়াশলাই ও ১৯২০ থেকে ১৯৯০ সালের তিন শতাধিক টেলিফোন। সেলিমের জন্ম টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকায় ১৯৫৫ সালে। বাবা গোলাম সরোয়ার ছিলেন টাঙ্গাইল পৌরসভার সচিব। সেলিম লেখাপড়া করেছেন শহরের বিন্দুবাসিনী বালক উচ্চ বিদ্যালয়, কাগমারীর মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ ও সরকারি সা’দত কলেজে। সরকারি সা’দত কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে স্নাতক পাশ করেন তিনি। কলেজ পাশ করে ১৯৭০ সালে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি চাকরি ছেড়ে যোগ দেন টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে। পরে ২০১৩ সালে ওই পৌরসভার সচিব হিসেবে অবসর নেন। ছোটোবেলা থেকেই সেলিমের শখ বিভিন্ন দেশের ডাক টিকিট জমানোর। ছবি আঁকায় তার দক্ষতা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও, তার আছে দারুণ সব চিত্রকর্ম। এর অধিকাংশই টাঙ্গাইলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপর। ক্যালিওগ্রফিতেও দক্ষ তিনি। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে নিজ বাড়িতে রাখা তার সংগ্রহগুলো। সেলিম অনেক সময় বাজারের টাকা বাঁচিয়ে কিংবা নিজের পেনশনের অর্থ খরচ করে এসব অমূল্য জিনিস সংগ্রহ করেছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো টাঙ্গাইলে একটি স্থায়ী এবং বড় পরিসরের প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালা বা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের এই উপাদানগুলো সহজে দেখতে ও জানতে পারে। বর্তমানে নিজের বাসভবনের একটি কক্ষকে তিনি পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। সেলিমের সংগ্রহশালাটি এখন জেলায় সাধারণ মানুষের কাছে কৌতূহলের বিষয়। তার এ সংগ্রহশালাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন টাঙ্গাইলবাসী সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের কলেজ পাড়ায় তার বাসভবনের একটি রুমে এই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন। দেয়ালের একটি ভবনে পুরাতন অনেক টেলিফোন, অন্যদিকে দেয়াল জুড়ে রয়েছে ডিসপ্লে বোর্ড এবং লম্বা টেবিল। শোকেস, টেবিল এবং ডিসপ্লে বোর্ডে সাজানো বিভিন্ন রকম ল্যান্ড লাইন ও মোবাইল টেলিফোন সেটগুলো রাখা আছে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের টাকার নোটও দেখা যায়। আরও পড়ুন ১৩ বছরেও শেষ হয়নি চেয়ারম্যান ফারুক হত্যার বিচার, স্বজনদের ক্ষোভ কবি ও লেখক অরণ্য ইমতিয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ইসমাইল হোসেন সেলিম ডাকটিকিট, অটোগ্রাফ এবং পুরোনো বিভিন্ন স্মারক শতবর্ষী পুরোনো বই, সাময়িকী, চিঠিপত্র, কয়েন, পদক, পুরোনো প্রযুক্তির জিনিসপত্রসহ স্থানীয় ইতিহাসের নানা দুর্লভ উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তার এই বিশাল সংগ্রহ নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। নতুন প্রজন্মের কাছে ইসমাইল হোসেন সেলিমের উদ্যোগ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। তার সংগ্রহশালা থেকে নতুন এবং অজানা অনেক কিছু জানা যাবে। গীতিকার মাসুম ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, সেলিমের এ সংগ্রহ শালাটি অসাধারণ। এটি অতীত এবং বর্তমানের সেতুবন্ধন বলে আমি মনে করি। বর্তমান প্রজন্মের ধারণাও নেই, অতীতের মানুষের জীবন যাপন কেমন ছিলো। এই সংগ্রহ শালায় কেউ যদি আসে তাহলে বিভিন্ন সামগ্রী দেখে তাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে। ইসমাইল হোসেন সেলিমের স্ত্রী জাহানারা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, আগে আমি এসব জিনিস পছন্দ করতাম না। আমি তাকে অনেক সময় পাগলও বলতাম। বর্তমানে আমার স্বামীর এ কার্যক্রমে আমি অনেক খুশি। তার এ সংগ্রহশালায় প্রাচীন কালের অনেক জিনিস রয়েছে। ইসমাইল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘শখ থেকেই সংগ্রহ শুরু। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সামগ্রী, যা সময়ের কারণে বিলুপ্তির পথে, সেগুলোই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংগ্রহ জরুরি মনে করে আমার এ সংগ্রহ। যাতে অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করবে। এক সময় এই সংগ্রহগুলো শোয়ার ঘরে রাখা হতো। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে শোয়ার জায়গাই থাকলো না। অনেক আপত্তির পর শেষে সেগুলো অন্য রুমে রাখা হয়েছে। আরও পড়ুন প্রেমের টানে চীন থেকে টাঙ্গাইলে লিয়াং, বিয়ে করা হলো না যে কারণে ইসমাইল বলেন, ছোটোবেলা থেকেই পুরোনো ও দুর্লভ জিনিস সংগ্রহের প্রতি আগ্রহ ছিল আমার। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসব সংগ্রহ করেছি। আমি যখন এসব সংগ্রহ শুরু করলাম তখন অনেক সংগ্রাহকদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। আমার কাছে ১১৭ টি দেশের দিয়াশলাই এবং ১৭২টি দেশের ব্যাংক নোট রয়েছে। সুলতানি, মোগল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমলের মুদ্রা রয়েছে। বাংলাদেশের সব ধরনের স্মারক নোট এবং ব্যাংক নোট রয়েছে আমার সংগ্রহ শালায়। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের হ্যাজাক এবং পিতলের হারিকেন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমার সংগ্রহের মূল বিষয় ম্যাচ বক্স এবং টেলিফোন সেট। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে সেটাই মূল উদ্দেশ্য। কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তি, মুদ্রা আর ঐতিহ্যের অমূল্য স্মৃতিগুলো এক ছাদের নিচে আগলে রেখেছেন ইসমাইল হোসেন সেলিম। এখন তার একটাই স্বপ্ন টাঙ্গাইলেই গড়ে উঠুক একটি পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহশালা, যেখানে অতীতকে ছুঁয়ে দেখবে আগামী প্রজন্ম এমনটাই প্রত্যাশা সকলের। আব্দুল্লাহ আল নোমান/এসজেডএইচ/জেআইএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>