বিজ্ঞাপন
এ ইউ দৌলা
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর; বিকেলের নরম রোদ খেজুরগাছের সরু পাতার বাধা অতিক্রম করে ছুটে আসা আলোয় মসজিদ প্রাঙ্গণটি অত্যন্ত শান্ত। কিন্তু এই বাহ্যিক শান্তির আড়ালে মদিনার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন বেশ অস্থির, আর সব অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে এক ব্যক্তি, যার নাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল। ইসলামপূর্ব মদিনার মুকুটহীন সম্রাট হওয়ার সব প্রস্তুতিই তাঁর সম্পন্ন হয়েছিল; কিন্তু হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আসার কারণে তাঁর সেই ক্ষমতা ও সিংহাসনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। নেতৃত্ব হারানোর তীব্র যন্ত্রণা তাঁকে ভেতর থেকে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে তুলেছিল, যার ফলে বাহ্যিকভাবে মুসলিম হলেও ভেতরে ভেতরে ইসলামের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই অবশ্যই একটি বড় গোত্রের নেতৃত্ব গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত, বুদ্ধিমান ও চতুর ব্যক্তি ছিলেন; তাই তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন কীভাবে মুসলিম সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করা যায়। সমরনীতিতে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শত্রুকে তার ভেতর থেকে ধ্বংস করাই যুদ্ধজয়ের সেরা কৌশল, যা প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি সবচেয়ে সেরা নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এটা এমন এক কৌশল, যা শত্রুর সেনাপ্রধান বুঝতে পারার আগেই সব শেষ করে দেয়। এতে খরচ অত্যন্ত কম, সবচেয়ে নিরাপদ এবং এর ফলাফল দীর্ঘমেয়াদি। ইতিহাসে এমন কৌশলের নানা উদাহরণ রয়েছে; যেমন, হাজার বছরের গড়া রোমান সাম্রাজ্যের পতন, সোভিয়েত রাশিয়ার পতন, লিবিয়ার ধ্বংস, সিরিয়ার মুছে যাওয়া আর সিরাজউদ্দৌলার গল্প তো সকলেই জানেন।
তো, সেই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বনু মুস্তালিকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে একটি সুযোগ পেয়ে যান। একজন মুসলিম মুহাজির পানি সংগ্রহের সময় অন্য একজন আনসার মুসলিমের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। মুহূর্তেই সেই ছোট্ট ব্যাপারটিকে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মুসলিম শিবিরের মধ্যে আনসার বনাম মুহাজির—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার জন্য উসকে দিতে থাকেন। মদিনার আনসার সাহাবিদের উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি অত্যন্ত কৌশলে আনসারদের সম্মানিত এবং মুহাজিরদের বহিরাগত বলে বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দিতে থাকেন। তিনি বলেন, “মদিনায় ফিরে যাওয়ার পর আমাদের মধ্যে যারা অধিক সম্মানিত, তারা অবশ্যই অপমানিত মুহাজিরদের সেখান থেকে বের করে দেবে।” তাঁর এই উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—মুহাজির ও আনসারদের মজবুত ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরানো এবং মদিনার ভেতর গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া।
অবশ্য এটাই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের একমাত্র মুনাফেকি আচরণ ছিল, তা নয়; ঐতিহাসিক ইফকের ঘটনায় যখন উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হয়, তার প্রধান উসকানিদাতাও ছিলেন এই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। উহুদের যুদ্ধে যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মদিনা থেকে বের হওয়ার পর মদিনার বাইরে ‘শাওত’ নামক স্থানে পৌঁছানোর পর প্রায় ৩০০ জন যোদ্ধা নিয়ে মাঝপথে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ান, তিনিও ছিলেন এই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। আসলে তিনি মুসলমানদের নৈতিক ভিত্তিকে আঘাত করার জন্য কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতেন না। আর এটা কি রাসূল (সা.) জানতেন? হ্যাঁ, তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন। আজ আমাদের চারপাশে কে ঈমানদার আর কে মুনাফিক, তা কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়; কারণ সেই বিচারজ্ঞান আমাদের কারও নেই। আসলে সেই বিচার করার কোনো অধিকার কোনো মানুষেরই নেই, কারণ এমন বিচার কেবল আল্লাহর। কিন্তু রাসূল (সা.) মহান আল্লাহর নিকট থেকে যে জ্ঞান পেতেন, সেই জ্ঞান দিয়েই তিনি জানতেন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই আসলে একজন ভয়ংকর মুনাফিক।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ঔদ্ধত্য এবং ষড়যন্ত্রের কারণে সাহাবিদের অনেকেই তীব্র ক্ষোভে ফুঁসতেন। ইসলামের পক্ষে তাঁদের ভালোবাসার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, এই মুনাফিকের প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকতা সাহাবিদের হৃদয়ে গভীর আঘাত হানত। বনু মুস্তালিকের ঘটনার পর যখন ইবনে উবাইয়ের এই বিষাক্ত মন্তব্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কানে পৌঁছাল, তখন সাহাবিদের তলোয়ার খাপের ভেতর ছটফট করতে শুরু করে। বিশেষ করে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সহ্য করতে না পেরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে অত্যন্ত আকুলভাবে আবেদন জানালেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের গর্দান উড়িয়ে দিই!”
হজরত ওমরের সেই আবেগময় ও রাগান্বিত অনুরোধের উত্তরে রাসূল (সা.) অত্যন্ত শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন, “ওমর, তাকে হত্যা করার অনুমতি আমি দিতে পারি না। এমন হলে জগতের নানা প্রান্তের মানুষ বলাবলি করবে যে, মুহাম্মদ বিজয়ের পর নিজের সাহাবিদেরই হত্যা করছে।” এমন হলে আরব সমাজের গোত্রপ্রথায় ইবনে উবাইয়ের মৃত্যুর ভুল বার্তা চলে যেতে পারে। বাইরের সাধারণ মানুষ ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝবে না; তারা মনে করবে ইসলামে আসার পর মুহাম্মদ নিজের সঙ্গীদের ওপরই খড়্গহস্ত হয়েছেন, যা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের পথে এক মনস্তাত্ত্বিক অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞার অধিকারী সেরা জেনারেল। হজরত ওমরের সেই আবেগময় ও রাগান্বিত অনুরোধের উত্তরে রাসূল (সা.) অত্যন্ত শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন, “ওমর, তাকে হত্যা করার অনুমতি আমি দিতে পারি না। এমন হলে জগতের নানা প্রান্তের মানুষ বলাবলি করবে যে, মুহাম্মদ বিজয়ের পর নিজের সাহাবিদেরই হত্যা করছে।” এমন হলে আরব সমাজের গোত্রপ্রথায় ইবনে উবাইয়ের মৃত্যুর ভুল বার্তা চলে যেতে পারে। বাইরের সাধারণ মানুষ ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝবে না; তারা মনে করবে ইসলামে আসার পর মুহাম্মদ নিজের সঙ্গীদের ওপরই খড়্গহস্ত হয়েছেন, যা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের পথে এক মনস্তাত্ত্বিক অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
তাছাড়া যদি তাকে মুসলিমদের দল থেকে বের করে দেওয়া হয়, তবে সে বাইরের শত্রুদের আরও বেশি সাহায্য করা শুরু করবে। কিংবা যদি তাকে হত্যা করা হয়, তবে তার গোত্রের লোকেরা এবং অন্যান্য মুনাফিক একত্রিত হয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে, যা সদ্য গড়ে ওঠা ইসলামী রাষ্ট্রটির ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই রাসুল (সা.) নমনীয়তা, ধৈর্য এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে পরিস্থিতি প্রতিহত করার কৌশল হিসেবে সেই মুনাফিক সর্দারকে নিজের কাছেই রাখলেন।
এবার একটু থামুন আর একটু চিন্তা করুন:
প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতা শব্দটির অর্থ আসলে কী?
রাসূল (সা.) আসলে কেমন দূরদর্শী জেনারেল ছিলেন?
প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতা ছাড়া কি মৌলিকভাবে কোনো জাতি উন্নত হতে পারে?
কোনো জাতি কীভাবে সম্মান অর্জন করবে, যদি তারা অন্যদের জীবন নকল করতেই বেশি ভালোবাসে?
আজ আমরা সভ্যতার স্বর্ণযুগে বাস করছি বলে মনে করি; আমরা ইতিহাসে সেরা শিক্ষিত সমাজ গঠন করেছি বলে দাবি করি; কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা আজ সত্যিই কোথায় দাঁড়িয়েছি, সেই সূচকটা বুঝতে পারা দরকার। চলুন উন্নত ও শক্তিশালী জাতি গঠনের লক্ষ্যে কিছু মৌলিক প্রশ্নের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান বুঝে নিই:
প্রশ্ন ১: আমরা কি দিনে দিনে আরও দূরদর্শী মুসলিম সমাজে পরিণত হচ্ছি? যদি না হই, তবে কোন শক্তি আমাদের সেই পথ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে?
প্রশ্ন ২: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কি ইসলামে বর্ণিত দূরদর্শিতার চর্চা আগের চেয়ে বেড়েছে, নাকি কমেছে? যদি কমে যাচ্ছে বলে মনে হয়, তবে তার মূল কারণ আসলে কী?
প্রশ্ন ৩: আজকের মুসলিমরা কি কয়েক দশক আগের চেয়ে বেশি সহমর্মী মানুষ? যদি না হয়, তবে ইসলামের প্রচার বলতে আসলেই কী বোঝায়?
প্রশ্ন ৪: আজকের মুসলিমরা কি কয়েক দশক আগের তুলনায় বেশি দায়িত্ববোধসম্পন্ন? যদি না হয়, তবে মুসলিম জাতি হিসেবে আমরা কোন পথে চলেছি?
প্রশ্ন ৫: আজকের মুসলিমরা কি কয়েক দশক আগের তুলনায় বেশি মানবিক? যদি না হয়, তবে কীভাবে আমরা নিজেদের সেরা বলার অধিকার রাখি?
লেখক পরিচিতি: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক গবেষক।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন