জাতীয়

অনুর্বর পাথুরে ভূমি মক্কায় কীভাবে জনবসতি গড়ে উঠল?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
দুধের শিশু হজরত ইসমাইল (আ.) ও তাঁর মা হাজেরাকে মক্কার মতো জনমানবহীন প্রান্তরে নির্বাসন দেওয়া ছিল আল্লাহ তাআলারই নির্দেশ। আল্লাহ মক্কাকে ইসমাইলের (আ.) বংশধরদের মাধ্যমে আবাদ করবেন, এবং সেখানে আবার নির্মিত হবে তাঁর ইবাদতের প্রথম ঘর কাবা—এ জন্যই হজরত ইবরাহিম (আ.) স্ত্রী-সন্তানকে সেখানে রেখে যেতে প্রত্যাদিষ্ট হয়েছিলেন। বিখ্যাত তাবেঈ ও মুফাসসির মুজাহিদের (রহ.) বর্ণনা অনুযায়ী হজরত ইবরাহিম (আ.) তখন শাম দেশে (বর্তমান ফিলিস্তিনের কানআন অঞ্চল) বসবাস করতেন। তাঁরা সেখান থেকে বিশেষ বাহন বোরাকের সাহায্যে মক্কায় এসেছিলেন। (আখবারু মাক্কাহ ১/৫৪) পথে হজরত ইবরাহিম (আ.) যখনই কোনো জনপদ দেখতেন, তখন বলতেন, ‘হে জিবরাইল, আপনাকে কি এখানেই তাঁদের রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?’ জিবরাইল তাঁকে বলতেন, ‘চলতে থাকুন।’ অবশেষে তিনি মক্কায় পৌঁছলেন। তখন মক্কা সলম ও সামুর গাছে পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে কিছু মানুষও ছিল, যাদের আমালিকা বলা হতো। অবশ্য তারা মক্কার বাইরে আশপাশের এলাকায় বসবাস করত। আর তখন কাবাঘরের স্থানে ছিল লালচে মাটির একটি উঁচু ঢিবি। ইবরাহিম (আ.) জিবরাইলকে বললেন, ‘আপনাকে কি এখানেই তাঁদের রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ এরপর ইবরাহিম (আ.) তাঁদের নিয়ে পাথরের স্থানটির কাছে গেলেন এবং সেখানে তাঁদের নামিয়ে দিলেন। তিনি বিবি হাজেরাকে সেখানে একটি ছাপড়া ঘর তৈরি করতে বললেন। (আখবারু মাক্কাহ ১/৫৪) ইবরাহিম (আ.) তাঁদের কাছে একটি চামড়ার থলে রেখে গেলেন, যাতে কিছু খেজুর ছিল। আর একটি পানির মশক দিলেন, যেখানে সামান্য পানি ছিল। এরপর ইবরাহিম (আ.) সেখান থেকে ফিরে চললেন। হাজেরা (আ.) তাঁর পেছনে ছুটতে ছুটতে বললেন, ‘হে ইবরাহিম, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এমন এক প্রান্তরে আমাদের রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোনো সাহায্যকারী আর না আছে কোনো ব্যবস্থা।’ তিনি বারবার একই কথা বলতে লাগলেন। কিন্তু ইবরাহিম (আ.) তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন না। শেষ পর্যন্ত হাজেরা (আ.) বললেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এমন আদেশ দিয়েছেন?’ ইবরাহিম (আ.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তখন হাজেরা (আ.) বললেন, ‘তাহলে তিনি নিশ্চয় আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।’ এই কথা বলে তিনি ফিরে এলেন। ইবরাহিম (আ.) সামনে এগিয়ে চললেন। অবশেষে তিনি এমন একটি গিরিপথে পৌঁছলেন, যেখান থেকে হাজেরা ও ইসমাইলকে আর দেখা যাচ্ছিল না। সেখানে তিনি বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করলেন। তারপর দুই হাত তুলে এই দোয়া করলেন: ‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার সন্তানাদির একাংশকে ফসলহীন উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে পুনর্বাসিত করলাম। হে আমাদের রব, যাতে তারা নামাজ কায়েম করে। কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিজিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, যেন তারা শুকরিয়া আদায় করে।’ (সুরা ইবরাহিম: ৩৭) এদিকে হাজেরা ইসমাইলকে দুধ পান করাচ্ছিলেন এবং মশক থেকে নিজেও পানি পান করছিলেন। এভাবে কিছুদিন চলার পর একসময় মশকের পানি শেষ হয়ে গেল। পিপাসায় হাজেরার দুধ শুকিয়ে গেল। ইসমাইলও পিপাসায় কাতর হয়ে উঠল। হাজেরা দেখলেন, তাঁর ছোট্ট ছেলে তৃষ্ণায় ছটফট করছে। তাঁর কষ্ট আর দেখতে না পেরে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন। তিনি দেখলেন, কাছেই সাফা পাহাড়। তিনি সেখানে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন কোথাও কোনো মানুষ দেখা যায় কি না। কিন্তু কাউকেই দেখা গেল না। তিনি সাফা থেকে নেমে উপত্যকায় পৌঁছলেন। তারপর নিজের পোশাকের এক পাশ একটু তুলে নিয়ে খুব দ্রুত দৌড়াতে লাগলেন যেভাবে একজন অসহায় ও ক্লান্ত মানুষ প্রাণপণে দৌড়ায়। এভাবে তিনি উপত্যকা পার হয়ে মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছলেন। সেখানেও উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। তিনি এভাবে সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাতবার আসা-যাওয়া করলেন। হাজেরা যখন শেষবার মারওয়ার ওপর উঠলেন, তখন হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি নিজেকে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো’। তারপর মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। এবারও সেই আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, ‘আমি তোমার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। তোমার কাছে যদি কোনো সাহায্য থাকে, তাহলে আমাকে সাহায্য করো।’ তখন তিনি দেখলেন, শিশু ইসমাইলের পাশে একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছেন। ফেরেশতা তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি তাঁর ডানা দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে পানি বেরিয়ে এলো। হাজেরা ছুটে এসে পানির চারপাশে মাটি দিয়ে বাঁধ দিতে লাগলেন। তিনি একদিকে হাত দিয়ে পানি আটকে রাখছিলেন, অন্যদিকে পানির পাত্রে পানি ভরছিলেন। পানি অবিরাম উথলে উঠছিল। তিনি যতই পানি তুলছিলেন, পানি আবার বেরিয়ে আসছিল। হাজেরা নিজে পানি পান করলেন এবং তাঁর সন্তানকে দুধ পান করালেন। ফেরেশতা তাঁকে বললেন, ‘ভয় পাবেন না। আপনারা ধ্বংস হবেন না। এখানে আল্লাহর ঘর আছে। এই ছেলে এবং তার বাবা মিলে এই ঘর নির্মাণ করবেন। আল্লাহ তাআলা কখনও তাঁর ঘরের মানুষদের ধ্বংস হতে দেন না।’ কিছুদিন পর জুরহুম গোত্রের একটি কাফেলা ‘কাদা’ নামক পথ ধরে মক্কার দিকে আসছিল। তারা মক্কার নিচু এলাকায় এসে যাত্রাবিরতি করল। হঠাৎ তারা একটি পাখি আকাশে উড়ে বেড়াতে দেখল। তারা বলল, ‘এই পাখিটি নিশ্চয় পানির ওপর চক্কর দিচ্ছে। অথচ আমরা তো জানি, এই উপত্যকায় কোনো পানির কূপ বা ঝরনা নেই।’ তারা খোঁজ নেওয়ার জন্য কয়েকজনকে পাঠাল। তারা গিয়ে দেখল, সত্যিই সেখানে পানির কূপ হয়েছে। তারা ফিরে গিয়ে সবাইকে পানির খবর দিল। জুরহুমের পুরো কাফেলা কূপের কাছে এসে দেখল, হাজেরা (আ.) কূপের পাশে বসে আছেন। তারা তাঁকে বলল, ‘আমরা কি এখানে বসবাস করতে পারি?’ হাজেরা বললেন, ‘হ্যাঁ, পারেন। তবে এই পানির ওপর আপনাদের কোনো অধিকার থাকবে না।’ তারা বলল, ‘ঠিক আছে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৪) হাজেরা (আ.) মক্কায় একা বসবাস করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন তাঁর আশপাশে লোকজন থাকুক। তাই জুরহুম গোত্রকে সেখানে বসতি স্থাপন করতে দেন। তারা সেখান থেকে নিজেদের গোত্রের অন্যদেরকেও খবর পাঠায়। তারা এসে তাদের সঙ্গে বসবাস শুরু করে। এভাবে সেখানে জুরহুম গোত্রের বেশ কয়েকটি পরিবার মক্কায় বসবাস করতে শুরু করে। হজরত ইসমাইল জুরহুম গোত্রের শিশুদের সঙ্গে বড় হতে থাকেন। তিনি তাদের কাছ থেকেই আরবি ভাষা শেখেন। জুরহুম গোত্রের লোকেরা ইসমাইলকে নিজেদের একজন বলেই মনে করত। হজরত ইসমাইল যখন বিয়ের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছান, তখন তারা নিজেদের গোত্রের একজন মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেয়। (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৪) পরবর্তীতে হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) মিলে সেখানে পবিত্র কাবা নির্মাণ করেন। জুরহুম গোত্র ও হজরত ইসমাইলের (আ.) বংশধরদের মাধ্যমে মক্কা আবাদ হয়। (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৪) ওএফএফ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>