বিজ্ঞাপন
লক্ষ্মীপুরে কাজের অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রীণ ডট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং একই ধরনের নতুন প্রকল্পে প্রায় ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকাদাররা।
অভিযোগ রয়েছে, এর আগে প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় আড়াই হাজার টুইন-পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে নির্ধারিত নকশা অনুসরণ না করা ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তদন্তের মুখে পড়ে। পরে পুনরায় কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী। এরপরও নতুন দরপত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েই মূলত তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় পৌনে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে হতদরিদ্রদের জন্য ২৫০০ টুইন পিট ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রীণ ডট লিমিটেড ল্যাট্টিনগুলো স্থাপনে নিয়মের তোয়াক্কা না করে মনগড়া কাজ করেছেন। তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে লক্ষ্মীপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী। এতে পুনরায় কাজগুলো করার জন্য নির্দেশনায় চিঠি দেওয়া হয়। তারপর ঠিকাদার কিছু কাজ নয়ছয় করে উধাও হয়। এ নিয়ে তোলপাড় হয়।
এদিকে কাজ না করার সত্যতা পেলেও অদৃশ্য কারণে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সটি কালোতালিকাভুক্ত করা হয়নি। উল্টো পূর্বের অনিয়মের পরও প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে ‘পুরস্কার’ হিসেবে ২৫০০ ল্যাট্টিনের কাজ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের ‘অংশীদারিত্ব’ থাকায় টেন্ডারে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকার গ্রীণ ডট লিমিটেড কাজটি পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রকল্প পরিচালক অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন।
পূর্বের কাজের অনিয়মের বিষয়ে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আকতার বলেছেন, ডিজাইন অনুসরণ করে পুনরায় কাজগুলো করার জন্য তখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়, তারা পুরোপুরি নির্দেশনা মানেনি। যদিও প্রকল্প পরিচালক বলছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী কাজ বুঝে পেয়েছেন বলে চিঠির মাধ্যমে তাকে নিশ্চিত করেছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানায়, লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ২৫০০ টুইন-পিট ল্যাট্টিন স্থাপনে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রতিটি ল্যাট্টিন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশের ১০টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শহরে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধির প্রকল্পের মাধ্যমে পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে এ ল্যাট্টিনগুলো স্থাপন করা হবে।
গত ১৮ মার্চ দরপত্র খোলা হয়। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে যৌথভাবে কাজটি পায় মেসার্স লাকি-এসজেসি (জেবি)। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে ডাকা হলেও কর্তৃপক্ষ না আসায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা গ্রীণ ডট লিমিটেডকে কাজটি দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাকি-এসজেসি ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা গ্রীণ ডট লিমিটেড যোগসাজশে দরপত্র জমা দেয়। এতে কারসাজি করে লাকি-এসজেসি কাজ বুঝে নেয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য আহ্বান করলেও প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাড়া দেননি। এতে পূর্বে অনিয়মে অভিযুক্ত থাকলেও নিয়মানুযায়ী দ্বিতীয় দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়। মূলত প্রকল্প পরিচালক তার পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়। প্রকল্প পরিচালক সুবিধা নিয়ে এ অনিয়ম করেছেন এমন আলাপ এখন ঠিকাদারদের মুখে-মুখে।
নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন ঠিকাদার জানায়, গ্রীণ ডট লিমিটেড তাদের পূর্বের কাজে নির্ধারিত ডিজাইন অনুসরণ না করাসহ নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করেছে। নির্বাহী প্রকৌশলী তদন্তের গিয়ে এর সত্যতা পেয়েছেন। এতে গত ২০ এপ্রিল জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আকতার চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় সঠিক নিয়মে কাজ করার জন্য নির্দেশ দেয়। কিন্তু কয়েকটি কাজ করলেও পুরোপুরি নির্দেশনা মানা হয়নি।
তিনি বলেন, ওই প্রতিষ্ঠান এখন আবার কীভাবে কাজ পায়? মূলত লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মিলেমিশে অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রতিটি ল্যাট্রিন থেকে তারা ৫ পার্সেন্ট কমিশন নেয়। এতে প্রকল্প থেকে অর্ধকোটি টাকা পাচ্ছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আনিসুর রহমান রনি বলেন, গ্রীণ ডট লিমিটেড পূর্বে ল্যাট্রিন স্থাপনে যা ইচ্ছে, তাই করছে। প্রতিষ্ঠানটিকে কালোতালিকাভুক্ত করার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। তাদেরকে আবারও একই কাজ দেওয়া হয়। যদিও প্রতিষ্ঠানের কোনো ত্রুটি থাকলে কিংবা কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই দরপত্র বাতিলের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু তাও নেওয়া হয়নি। কারণ প্রকল্প পরিচালকের যোগসাজশেই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রীণ কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি রুবেল হোসেন দাবি করেন, গ্রীণ ডট লিমিটেডের সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের অংশীদারিত্ব রয়েছে। এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতা ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার যোগসাজশ রয়েছে। এজন্য কারা কাজটি পেয়েছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাকি-এসজেসি’র (জেবি) প্রতিনিধি নাছির উদ্দিন বলেন, কাজের জন্য আমরা যে দর উপস্থাপন করেছি, তা বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য ছিল না। কাজটি করলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হতাম। এজন্য কাজটি নিইনি।
গ্রীণ ডট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবিএম জাহিদুল ইসলাম বলেন, পূর্বের কাজগুলো সঠিকভাবেই করেছি। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ তদন্তে কাজের মান ঠিক ছিল উল্লেখ করে ছাড়পত্রও দিয়েছে। এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকেও অনিয়ম সংক্রান্ত কোনো চিঠি আমি পাইনি। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক বা লেনদেন নেই।
তবে গ্রীণ ডট লিমিটেডের প্রতিনিধি খলিলুর রহমান আজাদ বলেন, পূর্বের কাজে জায়গা সংকুলান থাকায় কিছুটা ডিজাইন নিয়ে কিছুটা অনিয়ম হয়। পরে তা আবার ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগসাজশ নেই। বিগত আমলের নিয়ম এখনো চলমান রয়েছে, সেই নিয়মেই এখন আমরা কাজ পাচ্ছি।
বিষয়টি নিয়ে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার হোসেন বলেন, আমরা সংখ্যা গুনেছি, আড়াই হাজার ল্যাট্টিন গুণে বুঝে পেয়েছি। এজন্য আমরা ছাড়পত্র দিয়েছে। কাজের মান তদারকি আমাদের ছিল না।
লক্ষ্মীপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আকতার বলেন, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আহ্বায়ক করা হয়েছে। কিন্তু তারা আসেনি। এজন্য দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে ডাকা হয়।
তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী-এখন তাদেরকে কাজ দেওয়া হবে। তবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দরদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রীণ ডট লিমিটেড পূর্বে ল্যাট্রিন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। তখন চিঠি দেওয়া হয়েছিল, সবগুলো কাজ পুনরায় করার জন্য বলা হয়। কিন্তু তারা নির্দেশনা মানেনি। এরপরও প্রতিষ্ঠানটিকে কেন কালো তালিকাভুক্ত করা হয়নি, এই প্রশ্নে কোনো জবাব দেননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক এস এম শামীম আহমেদ বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী চিঠির মাধ্যমে আমাকে জানিয়েছেন কাজগুলো তিনি বুঝে পেয়েছেন। কিছু সমস্যা ছিল, তা ওই ঠিকাদার পুনরায় করেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আমার কাছে নেই। এছাড়া যোগসাজশ থাকার অভিযোগ সত্য নয়।
কাজল কায়েস/কেএইচকে/এএসএম
বিজ্ঞাপন