বিজ্ঞাপন
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও টেকসই উৎপাদনের গুরুত্ব বাড়ায় দেশে সবুজ সনদপ্রাপ্ত ভবনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কার্যক্রমে এগিয়ে আসছে।
এই বাস্তবতায় দেশের জলবায়ু, পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাংলাদেশের নিজস্ব সবুজ ভবন মূল্যায়ন নির্দেশিকা ও রেটিং ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা জরুরি হিসেবে দেখছেন পরিবেশ গবেষক, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) অধ্যাপক ড. সজল চৌধুরী।
এসব বিষয় নিয়ে অধ্যাপক সজল কথা বলেছেন জাগো নিউজের বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভির সঙ্গে।
পোশাক খাতের বাইরে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও হাউজিং কোম্পানি গ্রিন সার্টিফায়েড ভবন নির্মাণ করছে। এই প্রবণতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বাংলাদেশে আগে মূলত তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে গ্রিন সার্টিফায়েড কারখানা দেখা যেত। এখন অন্য খাতেও সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব স্থাপনা দেখা যাচ্ছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই টেকসই ভবন নির্মাণের জন্য কোনো না কোনো গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা রয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত হলো লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (লিড), যেখানে বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে ভবনকে সিলভার, গোল্ড বা প্লাটিনামসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মূল্যায়ন করা হয়।
আরও পড়ুন
পরিবেশবান্ধব লিড সনদ পেল আরও ৩ পোশাক কারখানা
তবে আমাদের দেশে এখনো নিজস্ব কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। আমরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) এলইইডি সার্টিফিকেশনের ওপর নির্ভর করছি।
কিন্তু এই মানদণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু, নির্মাণ উপকরণ ও পরিবেশ বিবেচনায় তৈরি। ফলে সেটিকে হুবহু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে একটি ভবন আমাদের বাস্তবতায় কতটা পরিবেশবান্ধব, সেটি পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশের জলবায়ু, সংস্কৃতি ও স্থানীয় নির্মাণ উপকরণ বিবেচনায় একটি নিজস্ব গ্রিন বিল্ডিং রেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিল্ডিং কোডে কী বলা আছে?
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোডে (বিএনবিসি) এখন এনার্জি এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি নামে একটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। সেখানে ডে-লাইটিং, থার্মাল কমফোর্টসহ কিছু নির্দেশনা রয়েছে।
আরও পড়ুন
পরিবেশবান্ধব কারখানায় ৫% সুদে ঋণ, ১০০০ কোটি টাকার গ্রিন তহবিল গঠন
তবে এসব বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। যেমন, বিদেশে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে আরামদায়ক তাপমাত্রা ধরা হলেও বাংলাদেশের মানুষের জন্য সেটি ২৬ হবে, নাকি ২৮ ডিগ্রি হবে- তা স্থানীয় গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
আমাদের দেশে এ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির ঘাটতি রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব স্থাপনা তৈরিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই), পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি), স্থপতি, প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দক্ষ জনবল রয়েছে।
কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও অভিজ্ঞতাকে একত্র করে জাতীয় পর্যায়ে কোনো কাঠামো তৈরি করা হয়নি। অথচ স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রেটিং সিস্টেম তৈরিতে এসব প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
নিজস্ব রেটিং ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন?
প্রতিটি দেশের জলবায়ু, সংস্কৃতি ও নির্মাণ পদ্ধতি আলাদা। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা সিঙ্গাপুরের মানদণ্ড বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নাও হতে পারে।
তাই যখন আমরা কোনো ভবনকে ‘গ্রিন’ বলব, তখন সেটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা পরিবেশবান্ধব- সেটি নির্ধারণের জন্য স্থানীয় মানদণ্ড থাকা জরুরি।
নীতিতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
বর্তমানে ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় মূলত কাঠামোগত নিরাপত্তা, সেটব্যাক ও অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখা হয়। কিন্তু ভবনের এনার্জি অ্যানালাইসিস বা এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক নয়।
আমার মতে, রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভবন অনুমোদনের সময় পরিবেশগত ও জ্বালানি দক্ষতার মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে শুরু থেকেই ভবনগুলো জলবায়ু-সহনশীল ও জ্বালানি সাশ্রয়ীভাবে নকশা করা সম্ভব হবে।
সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
আমাদের এমন একটি নীতিমালা দরকার, যেখানে আন্তর্জাতিক মান ও স্থানীয় গবেষণার সমন্বয় থাকবে। একই সঙ্গে সরকারকে একটি দক্ষ মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষজ্ঞদের এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
বর্তমানে একাডেমিয়া, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি গ্রিন বিল্ডিং রেটিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা কার্বন নিঃসরণ কমাবে, জ্বালানি সাশ্রয় করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও টেকসই ও স্বাস্থ্যকর নগরায়ণ নিশ্চিত করবে।
আইএইচও/এএসএ
বিজ্ঞাপন