বিজ্ঞাপন
‘আমার স্বামী যখন গুম হয়, আমার বড় ছেলের তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল। ১৭ এপ্রিলের পরদিন ১৮ তারিখ ওর কেমিস্ট্রি পরীক্ষা ছিল। আমি তাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। যেহেতু তার প্রিপারেশন ছিল, সেই অবস্থাতেও আমি সঙ্গে করে তাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। যখন ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়িয়েছে, তখন পত্রিকা বিক্রি করছিল (হকার)- ‘ইলিয়াস আলী গুম’, ‘ইলিয়াস আলী গুম’। সেই কথাটা শুনতে শুনতে আমার ছেলে পরীক্ষার হলে গিয়েছে।’
এভাবেই ইলিয়াস আলীর গুমের সময়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় নিজের পরিবারের সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
আরও পড়ুন
ইলিয়াস আলী গুম: বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর কারাগারে
কথাগুলো বলার সময়ও যেন সেই দিনের স্মৃতি ফিরে আসে তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে। স্বামীকে হারানোর আতঙ্কের সঙ্গে তখন যুক্ত হয়েছিল সন্তানের পরীক্ষার দুশ্চিন্তা। আর পরীক্ষার হলে যাওয়ার পথেও ছেলেকে শুনতে হয়েছে বাবার গুমের খবর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
সভায় বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং গুমের ঘটনার যথাযথ বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।
তাহসিনা রুশদীর লুনা আরও বলেন, ‘আমার ছোট মেয়েটা, সে স্কুলে গেলে তাকে মানুষ প্রশ্ন করতো, তোমার বাবার খবর…। কেউ হাসাহাসিও করেছে। সেটা নিয়ে আমার ছোট মেয়েটাকে স্কুল বদলাতে হয়েছিল।’
আরও পড়ুন
চিফ প্রসিকিউটর / মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে ইলিয়াস আলীকে গুমের যোগসূত্র
‘পরবর্তী সময়ে তাকে মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসা বন্ধ করে দেই। মানুষ যেন তাদের না চেনে, তাদের বড় হওয়া সেগুলো একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে।’
এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘তারপরও আমরা শুধু আজকের যে গুম দিবস সেটা নয়, আমার মনে হয় যতদিন আমরা বেঁচে থাকবো ততদিন আমাদের এটাকে ক্যারি করতে হবে যে আমরা কোন পরিবারের সদস্য বা আমাদের পরিবারের কেউ গুম হয়েছে।’
‘সেটা আমরা পাবলিক প্লেসে যাই অথবা যেখানেই যাই না কেন, সেটা বাসা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত যত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, সারাক্ষণ মনের মধ্যে ওটাই আমাদের কাজ করে, আমাদের পরিবার গুম হয়েছে, আমার স্বামী গুম হয়েছে বা আমার সন্তানরা মনে করে তাদের বাবা গুম হয়েছে।’ বলেন তাহসিনা রুশদীর।
তাহসিনা রুশদীরের ভাষায়, ‘আসলে কোনো অবস্থাতেই এটা থেকে পরিত্রাণের কোনো সুযোগ নেই।’
গুমের পেছনে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী বাহিনী বিভিন্ন মানুষকে তুলে নিয়ে যায়, তারা গুম করে কিন্তু বাংলাদেশেই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায়, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায়, রাষ্ট্রীয় মদতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দমন করার জন্য এই গুমের প্রচলন ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় শুরু হয়।’
আরও পড়ুন
নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর গুম: প্রধানমন্ত্রী
গুমের প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, তার পুরো পরিবারের ওপর পড়ে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাহসিনা রুশদীর বলেন, ‘গুমের কারণে আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, তাদের অনিশ্চয়তা এবং কষ্ট- গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবার শুধু সেটা অনুভব করে না, তাদের যেতে হয় একটি পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে।’
তিনি বলেন, ‘সেই পরিস্থিতিটা হলো সবসময় তারা যেখানেই যায় সেখানেই মানুষের একটু করুণা অথবা আমরা যে পরিস্থিতিতে ছিলাম সেই পরিস্থিতিতে আমাদের পরিবারের সদস্যরা গুম হওয়ার পরও বিগত সরকারের আচরণে মনে হয়েছিল, এই গুমের জন্য আমরাই মনে হয় দায়ী।’
‘গুম হয়েছে আমাদের পরিবার, আমরাই অপরাধী—সেরকমভাবে আমাদের পরিবারগুলোকে ট্রিট করা হতো।’ যোগ করেন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালককে তুলে নেওয়া হয়। এরপর তাদের আর খোঁজ মেলেনি। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশেই ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়।
কেএইচ/ইএ
বিজ্ঞাপন