বিজ্ঞাপন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি অধ্যাপনাও করেছেন। মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকেও নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। অধ্যাপনা ও গবেষণায় পর্যটন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, আবাসন সংকট, অবকাঠামো, গবেষণা বরাদ্দ, নিয়োগে স্বচ্ছতা, রাকসু নির্বাচন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করার নানা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এসব বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি মনির হোসেন মাহিন।
জাগো নিউজ: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন হয়েছে। ভবিষ্যতে এ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্যই চাইবে রাকসু নির্বাচন নিয়মিত হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকুক—এটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কারণ তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। তবে এখনই রাকসুর পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলতে পারছি না। আগামী রাকসু নির্বাচনের সময় এলে এর কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে।
জাগো নিউজ: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে অতীতে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল। বর্তমান প্রশাসন নিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা ও মেধাকে গুরুত্ব দিচ্ছে?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও মেধাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টা আমাদের আছে। কারণ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নিয়োগে স্বচ্ছতা জরুরি।
আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। অনেক বিভাগে শিক্ষক নেই। প্রশাসনে দক্ষ কর্মকর্তা ও মানবসম্পদও প্রয়োজন। এটা মনে রাখতে হবে, চব্বিশের জুলাইয়ের পর আমরা এক নতুন ভাবনার বাংলাদেশ পেয়েছি।
প্রত্যেক তরুণ ও শিক্ষার্থী তার মেধার যথার্থ মূল্যায়ন হোক—এমনটাই প্রত্যাশা করেন। তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নির্মোহভাবে নির্বাচিত হবেন। সমতা নিশ্চিত হবে। যিনি যোগ্য, তাকেই নিয়োগ দেয়া হবে। আমরা এভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সাজিয়ে নিচ্ছি।
জাগো নিউজ: শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা রয়েছে?
উপাচার্য: শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমার কথা একটিই—নিজেকে আরো দক্ষ করে তুলতে হবে। প্রথাগত নোট বা চাকরির বই মুখস্থ করে সরকারি চাকরিতে ঢোকা বা চাকরির জন্য লাগাতার চেষ্টা করার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্যই বিনষ্ট হয়। এখন আর উচ্চশিক্ষা ওই পর্যায়ে নেই। উচ্চশিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। আধুনিক বিশ্বে শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের সম্পর্ক জুড়ে গেছে। তাই শিক্ষার জ্ঞান শিল্পসংযুক্ত না হলে পুঁথিগত বিদ্যার ওপর ভরসা বিপর্যয় আনতে পারে।
সব শিক্ষার্থীকেই বলব, গোটা বিশ্বের পরিবর্তন ও উন্নয়নগুলোর দিকে মনোযোগ দিন। শুধু তত্ত্বজ্ঞানের ওপর ভর করে নিশ্চিত থাকবেন না। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। নিজ অধ্যয়ন ও বিশেষায়িত দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে। তাই সবসময়ই গ্রহণযোগ্য থাকবে এমন কিছু সফট স্কিল বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে সময় অনেক মূল্যবান। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার-পাঁচ বছরের যে শিক্ষাজীবন, তার প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতায় নামার আগেই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। কারণ এ সুযোগ দ্বিতীয়বার আর মিলবে না।
জাগো নিউজ: আপনার অধ্যাপনা ও গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র পর্যটন ও টেকসই উন্নয়ন। এ অভিজ্ঞতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ডিং ও উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগাতে চান?
উপাচার্য: রাজশাহীকে শিক্ষার শহর বলা হয়। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখানকার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কেউ বলুক বা না বলুক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পর্যটকের জন্য প্রধান গন্তব্য। অনেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে আসেন।
এটাকে পুঁজি করেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের কিছু প্রকল্প সামনে নেওয়া হবে। প্রায় ৭০০ একরের ক্যাম্পাসটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখেই তা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের জন্য এটি যেমন একটি ভালো অভিজ্ঞতা হবে, তেমনি যারা পর্যটক হিসেবে আসেন তাদের জন্যও কিছু আকর্ষণীয় ব্যবস্থা রাখতে চাই।
এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ অংশ, ছোট বনাঞ্চল ও জলাশয়গুলোকে নিয়ে পরিকল্পনা আছে। পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য রক্ষায়ও আমাদের মনোযোগ থাকবে। সব মিলিয়ে আগামী ৫০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে যে পরিকল্পনা আছে, তা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করব। বর্তমান অবস্থার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো আকর্ষণীয় একটি জায়গায় পরিণত করতে চাই।
জাগো নিউজ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে আপনার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দেশের প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসে। তাদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল নন। এজন্য সব শিক্ষার্থীকে আবাসিক সুবিধা দেয়া একটি যৌক্তিক দাবি। কিন্তু আমাদের যে কয়টি হল আছে এবং সেখানে যতগুলো আসন রয়েছে, তার তুলনায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এজন্য যাদের একান্ত প্রয়োজন, ওই শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিকেই আমাদের মনোযোগ বেশি।
আমরা কয়েকটি স্তরে সমস্যার সমাধান করছি। আপাতত আনুমানিক ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে পেরেছি। সামনে আমরা ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি।
নির্মাণাধীন তিন-চারটি হলের কাজ চলছে। আমরা এগুলো দ্রুত নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার উপযোগী করার বিষয়ে জোর দিচ্ছি। এগুলো চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত অর্ধেক শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনা যাবে। এরই মধ্যে একনেকে আমাদের ছয়টি হলের নাম অর্থপরিকল্পনার গ্রিন লিফে উত্থাপিত হয়েছে। অনুমোদন পেলে আমরা আরো কয়েকটি হল গড়তে পারব। সেটা হলে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে। এভাবে ধারাবাহিকতা রাখলে আমরা শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন নিশ্চিতে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করছি। আমি নিয়মিত হল পরিদর্শন করছি এবং যেখানে সমস্যা দেখছি সেখানেই যাচ্ছি।
জাগো নিউজ: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন পেয়েছেন? বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
উপাচার্য: আমি দায়িত্ব নেয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল। শিক্ষার্থীদের আবার পড়ালেখায় মনোনিবেশ করানো এবং গবেষণা কার্যক্রমে মনোযোগ বাড়ানোর উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্থিরতা ছিল। শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা ও অস্বস্তি রেখে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না, সেটা শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলাম।
আবার পুরনো কিছু সমস্যাও ছিল। কিছু বিভাগে সেশনজট রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা কোনো আপস করতে চাই না। কোনো শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েশনে যেন একদিনও দেরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে চাই। যেসব বিভাগে এ সমস্যা আছে সেগুলোয় আমরা মনোযোগ বাড়িয়েছি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি অবকাঠামো নির্মাণ, সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাশন, মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়ন, হলকেন্দ্রিক সুবিধা, রিডিং রুম, বিনোদন ও ডাইনিং ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়েও কাজ করতে হচ্ছে।
সমস্যা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবলের সংকট রয়েছে। অনেক বিভাগে শিক্ষক নেই। অনেক কর্মকর্তা অবসরে গেছেন, কেউ মারা গেছেন। বলতে গেলে চ্যালেঞ্জ অনেক। এগুলো একে একে সমাধান করাই উপাচার্যের নেতৃত্বের প্রকাশ।
জাগো নিউজ: আগামী চার বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন পথে নেতৃত্ব দিতে চান?
উপাচার্য: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় আমার দায়িত্বও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য বিবেচনায় শিক্ষার্থীদেরও আমার প্রতি প্রত্যাশা রয়েছে।
একজন উপাচার্য মূলত চার বছরের জন্য দায়িত্ব পান। ফলে এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন আনা কঠিন। কিন্তু নির্ধারিত কিছু লক্ষ্য ও পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন পরিবর্তনের সূচনা করা সম্ভব। আমি আমার মেয়াদকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা পৃথিবীতেই পরিচিত করার জন্য নেতৃত্ব দিতে চাই। কীভাবে বৈশ্বিক শিক্ষা ও একাডেমিয়ার পরিসরে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে নেয়া যায়, সেটিই আমার ভাবনা।
বর্তমানে বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক নানা আবিষ্কার নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ চলছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও গবেষণা কার্যক্রমকে এগুলোর সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্বমানের গবেষণা সংস্কৃতি গড়ার লক্ষ্যকেই আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। এ ধরনের জ্ঞান শুধু বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে না, আমাদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ও শিল্পসংযুক্তিতেও অবদান রাখতে পারবে। শুরু থেকেই এটি নিয়ে কাজ করে চলেছি।
জাগো নিউজ: গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? গবেষণায় আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ কী এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ কী?
উপাচার্য: গোটা বিশ্বেই গবেষণা প্রসঙ্গে ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। অতীতে যে গবেষণা হতো বা আমরা যে ধরনের উল্লেখযোগ্য গবেষণা কাজ দেখি, তার অধিকাংশই ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এর অর্থ হলো—আমি গবেষণার মাধ্যমে নিজের স্কলারলি উন্নয়ন নিশ্চিত করব এবং শিগগিরই পদোন্নতি বা পরবর্তী অধ্যাপনার পদে নিযুক্ত হব। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক বা অন্য পদগুলো এমন নয় যে পদোন্নতি হলে পাওয়া যায়। এগুলো স্বতন্ত্র পদ। তাই অনেকে গবেষণা প্রকাশ ও পিএইচডি করে বড় পদে যাওয়ার আবেদনের সুযোগ নিতে চান।
ফলে গবেষণা অনেকের কাছে গৎবাঁধা কিছু হয়ে দাঁড়ায়। এমনটা গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও এর প্রয়োগ সমাজকেন্দ্রিক হওয়া দরকার। গবেষণাটি আমাদের সমাজে কীভাবে উপকার করবে এবং কীভাবে কাজে আসবে, সেটি বোঝা জরুরি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা গবেষণায় আগ্রহী গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন, তাদের আমরা এই বার্তাটিই দেয়ার চেষ্টা করছি।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিজস্ব সমাধান জরুরি। সেটা আসবে গবেষণার মাধ্যমে। যদি আমরা সেটা করতে না পারি, তাহলে সামনে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে অথবা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে, সেটা শিক্ষা খাতের মাধ্যমে পূরণ করা যাবে না। আমরা চাই গবেষণা বাড়ুক। গবেষণার ফল যেন সমাজ, রাষ্ট্র এবং দেশের মানুষের কাজে লাগে—এমন একটি গবেষণা সংস্কৃতির রূপান্তর আমরা চাই।
জাগো নিউজ: গবেষণা খাতে বরাদ্দ কম থাকা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। ইউজিসির মাধ্যমে গবেষণা বরাদ্দ বিতরণের নতুন প্রক্রিয়াকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
উপাচার্য: অনেকে বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করছেন। কারণ ইউজিসির মাধ্যমে বরাদ্দ আসার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হবে। সেটি একটি দিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় না—এ কথাটি সঠিক নয়। গবেষণার জন্য অবশ্যই বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সামনে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। তবে বরাদ্দ বাড়ার পর তা বণ্টনের বিষয়টি থাকে। আমাদের রিসোর্স সীমিত। তাই সব ধরনের গবেষণা করা সম্ভব নয়। এজন্য গবেষণা প্রস্তাবটি সমাজ ও রাষ্ট্রের উপকারে কীভাবে আসবে, সেটি নিশ্চিত হওয়া দরকার।
আগে বরাদ্দ দেওয়া হতো শুধু। এজন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারও করা যাচ্ছে না—এমন সংবাদ পাওয়া যায়। এখন নতুন প্রক্রিয়ায় গবেষণা বরাদ্দের প্রায়োগিক দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। আমার কাছে এটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া বলে মনে হয়।
এভাবে অন্তত জ্ঞান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তদারকি বা গেটকিপিং বাড়বে। তাতে যতটুকুই বরাদ্দ পাওয়া যায় তার সদ্ব্যবহার হবে। উদ্ভাবনের উপকার আমরা পাব। একদিনে এর প্রভাব দেখা যাবে না। আজ থেকে দুই-চার বছর পর এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।
তাই গবেষণা বরাদ্দ একেবারে শূন্য হয়ে গেছে—এমনটা ঢালাওভাবে বলা ঠিক হবে না। সঠিকভাবে বরাদ্দ বণ্টন ও ব্যবহারের পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ সংগ্রহের বিষয়টিকে আমি বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছি।
জাগো নিউজ: শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও হলের পরিবেশ উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
উপাচার্য: শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুরুতেই আমরা কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশনের জন্য পানি সরবরাহ নিয়ে অনেকগুলো বাধা ছিল। সেগুলোয় হাত দিয়েছি।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সংকট কাটাতে মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। হলকেন্দ্রিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও ভাবতে হচ্ছে। রিডিং রুমের মানোন্নয়ন, বিনোদনের ব্যবস্থা এবং ডাইনিং পদ্ধতির মানোন্নয়নে নজর দিচ্ছি। শিক্ষার্থীরা যেন স্বস্তিদায়ক ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।
জাগো নিউজ: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে আপনার মূল কৌশল কী?
উপাচার্য: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বহু আগে থেকেই হচ্ছে। এবারই যে গবেষণা শুরু হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অনেক গবেষণা রয়েছে। তবে এসব গবেষণার ক্ষেত্রে সচরাচর ইংরেজি প্রকাশনা মেলে না। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব গবেষণার মূল্যায়ন কম হয়। বিজ্ঞান অনুষদের গবেষণায় আবার উপকরণ, পরীক্ষার ব্যয়সহ অন্যান্য বরাদ্দ প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত পরিমাণে এসব সুবিধা পায় না।
এত সীমাবদ্ধতার পরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের একটি পরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ফ্যাকাল্টি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। উপাচার্য হিসেবে আমি চেষ্টা করছি, এ গবেষণা কার্যক্রম যেন বাধা-বিপত্তিতে না পড়ে। আমাদের লক্ষ্য হলো গবেষণার মান ও পরিমাণ দুটোই বাড়ানো এবং গবেষণাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা।
জাগো নিউজ: সবশেষে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
উপাচার্য: আমরা এমন একটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরেও পরিচিত হবে।
গবেষণা হবে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য এবং রাষ্ট্রের জন্য। শিক্ষার্থীরা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের দক্ষ করে তুলবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষা করে টেকসই উন্নয়নের পথে আমরা এগিয়ে যাব।
আমার মেয়াদকালে সব সমস্যার সমাধান হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু একটি কার্যকর পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে যেতে চাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন সেই পরিবর্তনের সুফল পায়—এটাই আমার প্রত্যাশা।
জাগো নিউজ: জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।
উপাচার্য: আপনাকেও অসংখ্যা ধন্যবাদ।
এমওএইচএম/কেএইচকে/জেআইএম
বিজ্ঞাপন