জাতীয়

কক্সবাজার সৈকতের ভাঙন কেন তীব্র হচ্ছে, এ কিসের ইঙ্গিত

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ প্রশস্ত বালুচর। কিন্তু গত কয়েক বছরে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙন তীব্র হওয়ায় সেই বালুচরই সংকুচিত হয়ে এসেছে। কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত ও খাল, কোথাও ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে জিও ব্যাগের বাঁধে। ভাঙনের সঙ্গে বিলীন হচ্ছে বালিয়াড়ি ও ঝাউগাছও।

৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকত ঘুরে অন্তত ১৫টি অংশে ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, কোথাও নিচ থেকে বালু সরে গিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও বালুচর কেটে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ খাল।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা প্রথম আলোকে বলেন, জোয়ারের ধাক্কায় অনেক জায়গায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে। শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে সমুদ্রভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠনে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ উপকূলীয় উদ্ভিদ লাগানো প্রয়োজন। বালিয়াড়ি উঁচু ও শক্তিশালী হলে তা ঢেউয়ের আঘাত থেকে সৈকতকে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা করতে পারে।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল হক বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বড় ঢেউয়ের আঘাতে জিও ব্যাগের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় সাময়িকভাবে বাঁশ ও কাঠের খুঁটি ব্যবহারের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

পাঁচ বছরে বদলে গেছে বালুচর

৩২ বছর ধরে লাবণী পয়েন্টে শামুক-ঝিনুকের ব্যবসা করেন বাহারছড়ার বাসিন্দা মফিজুর রহমান। তাঁর চোখের সামনে গত পাঁচ বছরে সৈকতের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

মফিজুর রহমান বলেন, তিন দশক আগে বর্তমান সৈকতের জায়গা থেকে সমুদ্র অনেক দূরে ছিল। সেখানে পর্যটকদের বসার জন্য চেয়ার-ছাতা বসানো হতো। এখন ধীরে ধীরে বালুচর ভেঙে সমুদ্রের পানি ওপরে উঠে আসছে। প্রতিবছর জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তাতে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।

কক্সবাজার কিটকট (চেয়ার-ছাতা) ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে আগে বিশাল বালুচর ছিল। এখন লাবণী, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্টের কয়েকটি অংশে ভাঙন ও গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে পর্যটকদের গোসল ও হাঁটার জায়গাও কমে এসেছে।

পর্যটকদেরও ভোগান্তি

লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ভাটার সময় পর্যটকেরা জিও ব্যাগের পশ্চিম পাশে বসানো চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছেন। বালুচরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত ও কয়েকটি লম্বা খাল। সেগুলো পার হয়ে পর্যটকেরা পানির দিকে যাচ্ছেন।

দক্ষিণ দিকে সুগন্ধা পয়েন্টে অবশ্য একই সময়ে পর্যটকের ভিড় ছিল বেশি। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় হাজারো পর্যটক দেখা গেলেও সেখানে ভাঙনের চিত্র তুলনামূলক কম।

সৈকতের বিভিন্ন অংশে দেখা যায়, একের পর এক ঢেউ জিও ব্যাগের বাঁধে আছড়ে পড়ছে। কোথাও জিও ব্যাগ বিলীন হয়েছে, কোথাও কয়েক ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও আবার জিও ব্যাগ ছিঁড়ে বালু বেরিয়ে গেছে।

সৈকতে পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সি-সেফ লাইফগার্ডের কর্মী মো. ফারুক ও জয়ানাল আবেদীন বলেন, লাবণী পয়েন্ট থেকে উত্তর দিকে ডায়াবেটিকস পয়েন্ট পর্যন্ত জিও ব্যাগ দেওয়ার পরও ভাঙন কমেনি। বরং বিভিন্ন অংশে ভাঙন বেড়েছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ।

সৈকতের মাঝখানে তৈরি হয়েছে খালের মতো জলধারা।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রশিদ বলেন, বালুচর ও বালিয়াড়ি ভেঙে ঝাউগাছও সাগরে পড়ে যাচ্ছে।

ভাঙনে ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকেরাও। ঢাকার পর্যটক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ছবি ও ভিডিওতে কক্সবাজার সৈকতের যে চিত্র দেখেছেন, বাস্তবে এসে তার সঙ্গে মিল পাননি। বালুচরের গর্ত ও ছড়িয়ে থাকা জিও ব্যাগের কারণে শিশুদের নিয়ে হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছে।

কুমিল্লার পর্যটক সাজ্জাদুল কবীর বলেন, বালু সরে গিয়ে তৈরি হওয়া গর্তে পা আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে পর্যটকেরা আগ্রহ হারাতে পারেন।

সৈকতের চেয়ার-ছাতা ব্যবসায়ী মো. আলমগীর বলেন, জোয়ারের সময় চেয়ার সরিয়ে জিও ব্যাগের পেছনে নিতে হয়। এতে পর্যটকেরা চেয়ার ব্যবহার করতে চান না। জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসার পাশাপাশি সৈকতের সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।

জোয়ারের সময় পানি বাড়লে বসার চেয়ার-ছাতা বসানো হয় জিও ব্যাগের বাঁধের ওপর

গবেষণায় যা এসেছে

২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ৩৫ বছরে এই উপকূলে ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিপরীতে পলি জমে নতুন করে ভূমি তৈরি হয়েছে ২৮৪ হেক্টর এলাকায়। অর্থাৎ পলি জমে যতটা ভূমি তৈরি হয়েছে, ক্ষয়ের পরিমাণ তার প্রায় চার গুণ। গবেষকেরা বলছেন, ঢেউ, সাগরের স্রোত, জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও এই ভাঙনের জন্য দায়ী।

কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারে বছরে গড়ে ৫ দশমিক ০৫ মিলিমিটার এবং মহেশখালীতে ৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এই হার বৈশ্বিক গড়ের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। তবে গবেষকেরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, ভূমির ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাওয়া, জোয়ারের ধরন এবং উপকূলের ভূ-আকৃতির পরিবর্তনের মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখে।

গবেষকেরা বলছেন, ঢেউ, সাগরের স্রোত, জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও এই ভাঙনের জন্য দায়ী।

কক্সবাজার উপকূলের ভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাতেও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানুষের হস্তক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটিতে ভাঙনের ঝুঁকিতে জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব ২০ শতাংশ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মানুষের হস্তক্ষেপের প্রভাব ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। ফলে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ভাঙনকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকূলে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জলবায়ুবিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব থেকে কক্সবাজার রক্ষা করা না গেলে আগামী কয়েক দশকে পর্যটন শহর বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

কেন ভাঙন তীব্র, সমাধান কীভাবে

কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ভাঙনের কারণ একক নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল সৈকতের ভাঙন পর্যালোচনা করে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, উচ্চ জোয়ার, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি নষ্ট হওয়ার মতো কারণ চিহ্নিত করেছিল। দলটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা, আধা প্রকৌশল ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা—তিন ধরনের পদক্ষেপের সুপারিশ করে।

সমুদ্রবিজ্ঞানী ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক ড. আবদুল কাইয়ুম বলেন, কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকতে জিও ব্যাগ ব্যবহার করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। উপকূল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

আবদুল কাইয়ুম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ইন্টেগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট’ বা সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সৈকত রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ, সৈকতে নিয়মিত বালি পুনঃস্থাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ভাঙনের তীব্রতায় ছিঁড়ে যাচ্ছে জিও ব্যাগ

গবেষণাতেও কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় সৈকতে বালি পুনঃস্থাপন বা ‘বিচ নরিশমেন্ট’ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, বালিয়াড়ি উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। কৃত্রিম বাঁধের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ বালু ধরে রাখতে সক্ষম উপকূলীয় উদ্ভিদ দিয়ে বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করা যেতে পারে।

কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. আয়াছুর রহমান বলেন, জোড়াতালি দিয়ে প্রতিবছর জিও ব্যাগ ফেলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বালু পুনঃস্থাপন ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ব্যবস্থাপনার মতো প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

সৈকতে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধ দিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সমুদ্রভাঙন রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হবে।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>