প্রিয় কাশফুল,
পত্রের শুরুতেই ক্ষমা চাইছি। যদিও তোমাদের সঙ্গে আমরা যা করি, তাতে ক্ষমা না করে যদি ‘কাশফুল নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করো, সেটাও যথেষ্ট হবে না।
একসময় শরৎ এসেছে কি না, মানুষ আকাশ দেখে বুঝত। নীল আকাশে সাদা মেঘ ভাসত, বাতাসে তোমরা মাথা দোলাতে, কবিরা কবিতা লিখতেন, প্রেমিকেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলত। এখন শরৎ এসেছে কি না জানতে আকাশ দেখার দরকার পড়ে না; ফেসবুক খুললেই হয়। নিউজ ফিডে চার-পাঁচজন যদি তোমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দন্ত বিকশিত করে ছবি পোস্ট করে, বুঝতে হবে যে শরৎ এসে গেছে। আর ক্যাপশনে যদি থাকে—‘কাশের বনে হারিয়ে গেলাম’, তাহলে তো শরৎ পুরোদমে হাজির!
অবশ্য কেউ হারায় না। সঙ্গে স্ত্রী, সন্তান, শ্যালিকা, তিন-চারজন বন্ধু, ফটোগ্রাফার এবং গোটা তিনেক মোটরসাইকেল থাকে। লোকেশনও অন। এত নিরাপত্তার মধ্যে হারানো সহজ নয়!
প্রিয় কাশফুল, তোমাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, তোমরা বড্ড ফটোজেনিক! তোমাদের দেখলেই আমাদের ভেতরের সুপ্ত মডেলসত্তা জেগে ওঠে।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সুন্দর জিনিসের প্রতি আমাদের আকর্ষণ একটু বেশিই; তবে দূরত্ব বজায় রেখে নয়। আমরা সৌন্দর্য দেখি এবং সঙ্গে সঙ্গে সেটির মালিকানাও অনুভব করি। ফলে একজন তোমাকে গালে ছোঁয়ায়, আরেকজন মাথার ওপর তুলে ধরে, কেউ ডাঁটা ছিঁড়ে হাতে নেয়। এটাকে ভালোবাসার অধিকার বলতে পারো!
‘ভালোবাসা থাকলে বিচ্ছেদ থাকবে’ নিয়ম মেনে ফটোগ্রাফি শেষ হলে তোমাদের আবার ছুড়েও ফেলা হয়। কী আর করা যাবে, মুঠোফোন ব্যবহার করতে করতে আমাদের প্রকৃতিপ্রেম অনেকটা মুঠোফোনের ডেটার মতো হয়ে গেছে—ব্যবহার শেষ হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
এরপর আসে ডলার বাহিনী। মানে রিলস-টিকটক পার্টি। মুঠোফোন বসানো হয় দূরে। গান বাজে। একজন তোমাদের ভেতর থেকে স্লো-মোশনে বেরিয়ে আসে। কেন বেরোয়, কোথায় যায়; মানবসভ্যতা আজও তার উত্তর খুঁজে পায়নি। আরেকজন তোমাদের মাঝখান দিয়ে দৌড়ে যায়, চুল ওড়ায়, আরও কত কী যে করে! প্রথম শট পছন্দ না হলে আবার দৌড়। এভাবে চলতেই থাকে...।
পিকনিক পার্টির কথা কী আর বলব! মাইক্রোবাস থেকে নামে পনেরো-বিশজন। সঙ্গে বিরিয়ানির ডেকচি, চিপস, চকলেট, কোমল পানীয় এবং এমন একটি ব্লুটুথ স্পিকার, যার শব্দে দেড় কিলোমিটার দূরের কাশও বাতাস ছাড়াই দুলতে থাকে।
তবে তোমাদের জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা বোধ হয় ঝাড়ু-অধ্যায়! গোলাপ শুকিয়ে গেলে বইয়ের পাতায় আশ্রয় পায়। তোমরা শুকিয়ে গেলে খাটের নিচে। আফসোস, সাহিত্যে এই শ্রেণিবৈষম্য নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয় না।
প্রেমিকদেরও ক্ষমা করে দিয়ো। তারা ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে তোমাদের ঘাড় ভাঙতে পছন্দ করে। একগুচ্ছ কাশ ছিঁড়ে প্রেমিকার হাতে দিয়ে বলে, ‘তুমি ঠিক এই ফুলের মতো—শুভ্র, কোমল, পবিত্র।’
তোমরা মনে মনে কী বলো, তা অপ্রকাশ্যই থাকুক।
আসলে আমাদের ভালোবাসার ধরনটাই বিপজ্জনক। আমরা কষ্ট দিতে (পেতে নয়) ভালোবাসি, তাই তোমাদের কাছে ছুটে আসি।
অতএব উপর্যুক্ত সব অপরাধ বিশেষ বিবেচনায় নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিয়ো।
তবে ভবিষ্যতে যে এমনটা আর ঘটবে না, সে প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না। কারণ, প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে মানবজাতির পূর্ব রেকর্ড তোমাদের জানা আছে।
একটাই অনুরোধ, তোমরা প্রতিবার নিয়ম করে এসো। আমরা আরও চমকপ্রদ যন্ত্রণা দিতে অপেক্ষায় থাকব।
ইতি—
মৌসুমি অপরাধী সম্প্রদায়ের একজন অনুতপ্ত প্রতিনিধি
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>