জাতীয়

কোয়ান্টাম কণাদের পথ পাড়ি দিতে কি সময় লাগে না

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। তাই একে ঘিরে পদার্থবিজ্ঞানে রয়েছে অদ্ভুত সব নীতি। এগুলো নিয়ে মিথ বা অতিকথারও কোনো অভাব নেই। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এসব মিথ নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তায় নিয়মিত আলোচনা করা হচ্ছে। আজ রইল এর ষষ্ঠ কিস্তি।

আগের পর্ব

‘স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসট্যান্স’—কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্টের আঘাতে সময়কে চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখে আক্ষেপ করে কথাটি বলেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। এর অর্থ দূর থেকে ভুতুড়ে কাণ্ড! কেন এ কথা বলেছিলেন আইনস্টাইন?

কারণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অদ্ভুত সব নিয়ম। সেগুলো হজম করতে পারেননি তিনি। বিশেষ করে কোয়ান্টাম কণাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারগুলো অদ্ভুত মনে হয় তাঁর। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বলে, কোনো সময় ব্যয় না করেই কণাগুলো ভূতের মতো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে! তেমনি কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে দুটি কণা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে মুহূর্তের মধ্যেই।

কিন্তু এটা যে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন! আপেক্ষিকতার অন্যতম মূল নীতি হলো, কোনো বস্তুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাই তথ্যই হোক বা কণা, আলোর গতির চেয়ে বেশি গতি অর্জন করা সম্ভব নয় কোনো কিছুর পক্ষেই। ঠিক এখানটাতেই ঘোর আপত্তি আইনস্টাইনের।

নীলস বোর এবং আলবার্ট আইনস্টাইন

এই বিতর্কের শুরুটা করেছিলেন ড্যানিশ বিজ্ঞানী নীলস বোর। ১৯১৩ সালে তিনি পরমাণুর কোয়ান্টাম মডেল দাঁড় করান। এর আগে ১৯১১ সালে নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড দাঁড় করান পরমাণুর একটি সত্যিকারের কাঠামো। নাম দেন সোলার সিস্টেম অ্যাটম মডেল। রাদারফোর্ড বলেছিলেন, পরমাণুর গঠন অনেকটা সৌরজগতের মতো।

আপেক্ষিকতার অন্যতম মূল নীতি হলো, কোনো বস্তুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাই তথ্যই হোক বা কণা, আলোর গতির চেয়ে বেশি গতি অর্জন করা সম্ভব নয় কোনো কিছুর পক্ষেই।

সৌরজগতের কেন্দ্রে থাকে সূর্য, তার চারপাশের কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে গ্রহগুলো। রাদারফোর্ডের মতে, পরমাণুতে একটি ধনাত্মক চার্জের নিউক্লিয়াস থাকে, তাকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে ইলেকট্রন। এটাই আসলে রাদারফোর্ডের সোলার সিস্টেম অ্যাটম মডেলের মূল কথা।

তখন পর্যন্ত এটাই ছিল পরমাণুর সবচেয়ে যৌক্তিক মডেল। কিন্তু এতেও খুঁত ছিল। এই মডেল অনুসারে ইলেকট্রন অনবরত নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। ইলেকট্রনের চার্জ আছে। আর চার্জিত কোনো কণা ঘুরলে বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে। অন্তত বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিজ্ঞান তা-ই বলে। আর যদি বিকিরণ করেই থাকে, তবে এর জন্য তো শক্তির দরকার হবে। এই শক্তির জোগান তাহলে কে দেয়?

সৌরজগতের কেন্দ্রে থাকে সূর্য, তার চারপাশের কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে গ্রহগুলো

জোগান আসে ইলেকট্রনের গতিশক্তি থেকে। গতিশক্তি রূপান্তরিত হয়ে বিদ্যুৎচুম্বকীয় শক্তিতে। ফলে ক্রমাগত কমতে থাকে ইলেকট্রনের গতিশক্তি। দুর্বল গতির সেই ইলেকট্রনকে আরও নিজের দিকে টানতে থাকে শক্তিশালী নিউক্লিয়াস। কমতে থাকে নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনের মধ্যকার দূরত্ব। ফলে কক্ষপথের ব্যাসার্ধ কমে এবং পরিধিও ছোট হয়ে আসে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় কক্ষপথের ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের মধ্যকার দূরত্ব শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে সোজা নিউক্লিয়াসের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ার কথা ইলেকট্রনের। কিন্তু বাস্তবে তো তা হয় না! পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রনগুলো ঠিকই যুগের পর যুগ নিউক্লিয়াসের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তত্ত্ব আর বাস্তবতার মধ্যে এত ফারাক কেন? 

গতিশক্তি রূপান্তরিত হয়ে বিদ্যুৎচুম্বকীয় শক্তিতে। ফলে ক্রমাগত কমতে থাকে ইলেকট্রনের গতিশক্তি। দুর্বল গতির সেই ইলেকট্রনকে আরও নিজের দিকে টানতে থাকে শক্তিশালী নিউক্লিয়াস।

এর কোনো সমাধান সেকালের বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না। কিন্তু নীলস বোর খুদে কণাদের জগৎকে একটু অন্যভাবে দেখতে পেতেন। তাই তাঁর মাথায় আসে এক ইউনিক আইডিয়া। তিনি ১৩ বছর আগের একটি তত্ত্ব ব্যবহার করেন। সেই তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। ১৯০০ সালে তিনি দেখান, আলো বা বিকিরণ বা শক্তি নিরবচ্ছিন্ন ধারায় নির্গত হয় না। বরং শক্তি নির্গত হয় প্যাকেট বা গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে।

পরে আইনস্টাইন দেখান, আলোর প্যাকেট আসলে কণার মতো আচরণ করে। আলোর এই কণা বা প্যাকেটকেই আরও অনেক পরে নাম দেওয়া হয় ফোটন। এসব কণা বা প্যাকেটের শক্তি সুনির্দিষ্ট। এগুলোই আলোর সর্বনিম্ন শক্তি ধারণ করে। আলো বা শক্তির প্যাকেটকে এই সুনির্দিষ্ট শক্তির চেয়ে আরও ছোট করা সম্ভব নয়।

জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

প্ল্যাঙ্ক ও আইনস্টাইনের এই কোয়ান্টাম তত্ত্বটিই নীলস বোর পরমাণু মডেলের সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, নিউক্লিয়াসের চারপাশে কক্ষপথের মতো অসংখ্য শক্তিস্তর থাকে। তবে প্রতিটি শক্তিস্তর একে অন্যের চেয়ে আলাদা। একটি শক্তিস্তর ঠিক কতটুকু শক্তি ধারণ করতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করে ওই শক্তিস্তরের ব্যাসার্ধ, আকার ইত্যাদি।

পরে আইনস্টাইন দেখান, আলোর প্যাকেট আসলে কণার মতো আচরণ করে। আলোর এই কণা বা প্যাকেটকেই আরও অনেক পরে নাম দেওয়া হয় ফোটন। এসব কণা বা প্যাকেটের শক্তি সুনির্দিষ্ট।

ধরা যাক, একটি নিউক্লিয়াসের চারপাশে বিভিন্ন ব্যাসার্ধের বেশ কিছু কক্ষপথ বা শক্তিস্তর আছে। সবচেয়ে কম ব্যাসার্ধের শক্তিস্তরে সবচেয়ে কম শক্তির ইলেকট্রন থাকবে। সবচেয়ে কম শক্তির ইলেকট্রন থাকবে নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে কাছে। আর বেশি দূরত্বের বা বেশি শক্তির ইলেকট্রন অবস্থান করবে সবচেয়ে দূরের কক্ষপথে। এখানে ইলেকট্রনের শক্তির মান একদম নির্দিষ্ট করে বাঁধা। তাই ইলেকট্রনের শক্তিরও একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে।

সেই শক্তির চেয়ে ইলেকট্রনের গতিশক্তি কমানো আর সম্ভব নয়। তেমনি শক্তিস্তরের ব্যাসার্ধও একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর কমে না। ফলে ইলেকট্রন কক্ষপথের ব্যাসার্ধ শূন্য হওয়ার কোনো উপায়ই নেই। অর্থাৎ কোয়ান্টামের শক্তি নির্দিষ্ট করার ব্যাপারটিই রাদারফোর্ড মডেলের সমস্যার সমাধান করে দেয়। একটি সমস্যার সমাধান হলো বটে, কিন্তু তখন আরেকটি সমস্যা এসে নতুন জটিলতা তৈরি করে।

বেশি দূরত্বের বা বেশি শক্তির ইলেকট্রন অবস্থান করবে সবচেয়ে দূরের কক্ষপথে। এখানে ইলেকট্রনের শক্তির মান একদম নির্দিষ্ট করে বাঁধা। তাই ইলেকট্রনের শক্তিরও একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে।

২.

ওপরে আমরা দেখলাম, শক্তির তারতম্যের কারণে ইলেকট্রন উচ্চ বা নিম্ন শক্তিস্তরে থাকতে পারে। যার যেমন শক্তি, সে তেমনই কক্ষপথে থাকবে। তবে চাইলেই বাইরে থেকে শক্তি প্রয়োগ করে ইলেকট্রনের শক্তি বাড়িয়ে নেওয়া যায়। তেমনি কমানোও যায়, তবে সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে নেমে গেলে আর কমানো সম্ভব নয়। বোর বলেন, একটি শক্তিস্তরে থাকা ইলেকট্রন যদি বাড়তি কোনো শক্তি শোষণ করে, তবে সে আর ওই শক্তিস্তরে থাকতে পারবে না। লাফ দিয়ে চলে যাবে ওপরের শক্তিস্তরে। কিন্তু কীভাবে যাবে? একটু একটু করে শক্তি বাড়বে, আর ইলেকট্রনও মশার কয়েলের মতো সর্পিল পথে একটু একটু করে ওপরের শক্তিস্তরে উঠবে?

সেটা হওয়ার নয়। কারণ, শক্তি একটু একটু করে বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। আলো হোক বা তাপশক্তির বিকিরণ—শক্তি আসবে প্যাকেট বা ফোটন কণার আকারে। ইলেকট্রন একটি করে ফোটন শোষণ করবে আর এক লাফে উঠে যাবে ওপরের শক্তিস্তরে। আবার উচ্চ শক্তিস্তরে চলে যাওয়া ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে পুনরায় নেমে আসতে পারে নিম্ন শক্তিস্তরে। একেই বলে ইলেকট্রনের ‘কোয়ান্টাম লাফ’।

১৯২৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ অনিশ্চয়তা তত্ত্ব দাঁড় করান

কোয়ান্টাম লাফের সময় দুই শক্তিস্তরের মাঝখানের কোনো বিন্দুতে ইলেকট্রন অবস্থান করতে পারে না। কারণ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব তার অনুমোদন দেয় না। বোরের এই তত্ত্ব ১৯১৩ সালের৷ কিন্তু এই তত্ত্ব সমালোচনার মুখে পড়ে প্রায় দুই দশক পরে।

১৯২৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ অনিশ্চয়তা তত্ত্ব দাঁড় করান। তার আগের বছর অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার ইলেকট্রন তথা কোয়ান্টাম কণাদের জন্য দাঁড় করান তরঙ্গ সমীকরণ। দুটি তত্ত্বকে আলাদা মনে করা হলেও, পরে দেখা যায় দুটিরই মূল সুর এক—কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তা। কিন্তু একটা বড় পার্থক্যও ছিল। সে কথায় পরে আসছি।

ইলেকট্রন একটি করে ফোটন শোষণ করবে আর এক লাফে উঠে যাবে ওপরের শক্তিস্তরে। আবার উচ্চ শক্তিস্তরে চলে যাওয়া ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে পুনরায় নেমে আসতে পারে নিম্ন শক্তিস্তরে।

৩.

এবার আসা যাক, পুরোনো প্রসঙ্গে। কোয়ান্টাম লাফের সময় দুই শক্তিস্তরের মাঝখানের কোনো বিন্দুতে ইলেকট্রন অবস্থান করতে পারে না। তাহলে এই সময়টাতে ইলেকট্রন কোথায় থাকে?

প্রশ্নটা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় ১৯২৭ সালের সলভে সম্মেলনে৷ শুধু এই প্রশ্ন নয়। আইনস্টাইন সরব হয়েছিলেন গোটা অনিশ্চয়তা নীতির বিরুদ্ধেই। মজার ব্যাপার সেই সময় আইনস্টাইনের পক্ষ নিয়েছিলেন অনিশ্চয়তা তত্ত্বের অন্যতম প্রবর্তক শোডিঙ্গার।

১৯২৭ সালের সলভে সম্মেলনে তোলা ছবি

আইনস্টাইন জানতে চেয়েছিলেন ইলেকট্রনের মধ্যবর্তী অবস্থানের কথা৷ বোর বলেছিলেন, মধ্যবর্তী কোনো অবস্থান থাকে না৷ বোরের যুক্তি ছিল, ইলেকট্রন কোনো এক মুহূর্তে এক অবস্থান থেকে বিলীন হয়ে যাবে এবং ঠিক তখনই আরেক অবস্থানে গিয়ে ভূতের মতো হাজির হবে!  আইনস্টাইন প্রশ্ন করেন, তাহলে কি এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে যাওয়ার সময় ইলেকট্রনকে কোনো সময় ব্যয় করতে হবে না? বোর বলেছিলেন, আদৌ কোনো সময় লাগবে না! অনিশ্চয়তা তত্ত্বের জনক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও তাঁকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

আইনস্টাইন সেটা মানবেন কেন! এই তত্ত্ব যে তাঁর আপেক্ষিকতাকেই খারিজ করে দেয়!

বোর বলেছিলেন, মধ্যবর্তী কোনো অবস্থান থাকে না৷ বোরের যুক্তি ছিল, ইলেকট্রন কোনো এক মুহূর্তে এক অবস্থান থেকে বিলীন হয়ে যাবে এবং ঠিক তখনই আরেক অবস্থানে গিয়ে ভূতের মতো হাজির হবে!

সলভে সম্মেলনে বোর একের পর এক যুক্তি দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাইজেনবার্গ ও ম্যাক্স বর্নকে সঙ্গে নিয়ে আইনস্টাইনের যুক্তিগুলোকে খারিজ করে দিচ্ছিলেন বোর। বেশির ভাগ যুক্তিতেই আইনস্টাইন হেরে গিয়ে সাময়িকভাবে পরাজয় মেনে নিচ্ছিলেন। কিন্তু  কিছুতেই তাৎক্ষণিক শক্তিস্তর বদলের ব্যাখ্যা মানতে নারাজ ছিলেন তিনি। নারাজ ছিলেন, ইলেকট্রনের তাৎক্ষণিক কোয়ান্টাম লাফ মানতেও।  কারণ, আপেক্ষিকতা অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে চলতে পারে না কিছুই। শ্রোডিঙ্গারও বোরের সঙ্গে একমত হতে পারেননি।

ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম লাফের মতো কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্টকেও মনে করা হতো তাৎক্ষণিক ঘটনা

বিশেষ আপেক্ষিকতা ছিল বিজ্ঞান ইতিহাসের সবচেয়ে সফল তত্ত্বগুলোর একটি। এত সহজেই তো আর একে খারিজ করা চলে না! শ্রোডিঙ্গার নতুন করে গাণিতিক তখন তার তরঙ্গ সমীকরণের বিশেষ তথ্যটি সামনে নিয়ে আসেন। তবে ‘স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসট্যান্স’— এ মন্তব্য আইনস্টাইন আরও পরে করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে। তখন কোয়ান্টাম কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট ও টেলিপোর্টেশন নিয়ে তার আপত্তি ছিল। ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম লাফের মতো কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্টকেও মনে করা হতো তাৎক্ষণিক ঘটনা। লক্ষকোটি মাইল দূরে থাকা দুটি কণা তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে মুহূর্তের মধ্যে। পরে অবশ্য এ ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়।

হাইজেনবার্গ ও ম্যাক্স বর্নকে সঙ্গে নিয়ে আইনস্টাইনের যুক্তিগুলোকে খারিজ করে দিচ্ছিলেন বোর। বেশির ভাগ যুক্তিতেই আইনস্টাইন হেরে গিয়ে সাময়িকভাবে পরাজয় মেনে নিচ্ছিলেন।

৪.

শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ হলো একধরনের হ্যামিল্টনিয়ান ফাংশন। এই ফাংশনের মূল ভিত্তি হলো হ্যামিল্টনিয়ান উপপাদ্য। শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণে কোয়ান্টাম কণাগুলো আসলে একই সঙ্গে তরঙ্গও বটে। আর তাই কণাগুলো তরঙ্গ ফাংশন মেনে চলে। এ কারণেই এরা তরঙ্গের মতো করে ধীরে ধীরে এক শক্তিস্তর থেকে আরেকটাতে যেতে পারে। সেটা কত ধীরে? নিশ্চয়ই পানি বা বাতাসের তরঙ্গের মতো ধীর নয়! তবে আলোর চেয়ে ধীরে। কিন্তু পুরো পরমাণুই তো অতি ক্ষুদ্র। তাই দুটো শক্তিস্তরের মধ্যে দূরত্বও খুব কম। এত কম যে আমাদের সাধারণ কল্পনাশক্তি দিয়ে তা অনুমান করাও কঠিন। এত কম দূরত্ব পাড়ি দিতেও তাই সময় লাগে অত্যন্ত কম। সময়টা কম, কিন্তু শূন্য নয়। আর সেই ব্যাপারটিই শ্রোডিঙ্গার তাঁর তরঙ্গ ফাংশনের সমীকরণ দিয়ে হিসাব করে দেখানোর চেষ্টা করেন।

শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ হলো একধরনের হ্যামিল্টনিয়ান ফাংশন

তবে তরঙ্গ ফাংশন দিয়ে তাৎক্ষণিক কোয়ান্টাম লাফকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করা যায়নি। দরকার ছিল আরও গভীর গবেষণার। সেই কাজটিও শ্রোডিঙ্গার করেন। অবশ্য এর জন্য সময় লাগে প্রায় দুই দশক! ১৯৫২ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। শিরোনাম ছিল ‘আর দেয়ার কোয়ান্টাম জাম্পস?’ শ্রোডিঙ্গার এই ‘কোয়ান্টাম জাম্প’ বা কোয়ান্টাম লাফের নাম বদলে নতুন নামকরণ করেছিলেন কোয়ান্টাম জার্ক বা কোয়ান্টাম ঝাঁকুনি। শ্রোডিঙ্গার বেশ ভালোভাবেই কোয়ান্টাম লাফের বিপক্ষে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। কিন্তু তিনি কি শতভাগ প্রমাণ করতে পেরেছিলেন?

শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ হলো একধরনের হ্যামিল্টনিয়ান ফাংশন। এই ফাংশনের মূল ভিত্তি হলো হ্যামিল্টনিয়ান উপপাদ্য। শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণে কোয়ান্টাম কণাগুলো আসলে একই সঙ্গে তরঙ্গও বটে।

এখানেই আসে লিগ্যাসি আর ফ্যালাসির প্রশ্ন। কোনো কিছু দাবি করলে তা প্রমাণ করার দায়িত্বও যিনি দাবি করছেন, তাঁর। যিনি সেই দাবি মানবেন না, তাঁর নয়। দাবি করেছিলেন বোর আর হাইজেনবার্গ। তাঁদের পক্ষে ছিল অনিশ্চয়তা নীতির অদ্ভুতুড়ে আইন। কিন্তু বাস্তবে তাৎক্ষণিক কোয়ান্টাম লাফ ঘটা সম্ভব কি না, তার কোনো অকাট্য যুক্তি তাঁদের কাছে ছিল না। বরং আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা সেটার অনুমোদন দেয় না। তবু বিতর্ক ছিল। কারণ একটি পরীক্ষামূলক প্রমাণের অভাব ছিল—যে পরীক্ষা প্রমাণ করবে, হয় বোর-হাইজেনবার্গ ঠিক, নয়তো আইনস্টাইন-শ্রোডিঙ্গার ঠিক।

মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান পরে বিষয়টি আরও সহজ করে বুঝিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘কোয়ান্টাম জগতের নিয়ম আমাদের চিরচেনা জগতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। ইলেকট্রনের এই জায়গা বদলও তেমনি এক ঘটনা। এটা সাধারণ চলাফেরা নয়। ব্যাপারটা আমাদের কাণ্ডজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।’ এরপর থেকে বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই এটা মেনে নিয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, কোয়ান্টাম লাফ কখন কীভাবে ঘটবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।

মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান

কিন্তু বিজ্ঞান তো থেমে থাকেনি। দিনে দিনে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটেছে। ফলে পরিমাপ প্রক্রিয়াও হয়ে উঠেছে অনেক সূক্ষ্ম ও সহজ। সময়ের পরিমাপেও ঘটে গেছে এক বিরাট বিপ্লব। বিজ্ঞান এখন আর শুধু ন্যানোসেকেন্ডে আটকে নেই। ফেমটোসেকেন্ড ও অ্যাটোসেকেন্ডের মতো অবিশ্বাস্য ক্ষুদ্র সময়ও মাপা যায়। এক সেকেন্ডকে এক হাজার ট্রিলিয়ন বা ১ হাজার লক্ষ কোটি ভাগ করলে পাওয়া যায় এক ফেমটোসেকেন্ড। অ্যাটোসেকেন্ড তার চেয়েও ছোট—ফেমটোসেকেন্ডের ১ হাজার ভাগের ১ ভাগ মাত্র! এত নিখুঁত সময় মাপার যন্ত্র যখন হাতে আছেই, তখন কোয়ান্টাম লাফ পর্যবেক্ষণ করতে আর অসুবিধা কোথায়?

এক সেকেন্ডকে এক হাজার ট্রিলিয়ন বা ১ হাজার লক্ষ কোটি ভাগ করলে পাওয়া যায় এক ফেমটোসেকেন্ড। অ্যাটোসেকেন্ড তার চেয়েও ছোট—ফেমটোসেকেন্ডের ১ হাজার ভাগের ১ ভাগ মাত্র!

সম্প্রতি এই কাজটিই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মিশেল দেবোরো এবং গবেষক জ্যাভিয়ার মাইন্স। তাঁরা রিয়েল টাইমে কোয়ান্টাম লাফ পর্যবেক্ষণ করেন। এ কাজটি তাঁরা করেন অ্যাটোসেকেন্ড স্কেলে। কৃত্রিম পরমাণু বানিয়ে ইলেকট্রনের লাফের ওপর নজর রাখতে শুরু করেন। দেখেন, এই লাফ কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। খুব ক্ষুদ্র হলেও এতে কিছুটা সময় লাগে। সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি দিয়ে যথেষ্ট দ্রুত ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ চালাতে পারলে সেই সময়টুকু মাপাও সম্ভব।

গবেষকেরা লক্ষ করেন, ইলেকট্রন কোয়ান্টাম লাফ দেওয়ার ঠিক আগে একটা সংকেত পাঠায়

গবেষকেরা লক্ষ করেন, ইলেকট্রন কোয়ান্টাম লাফ দেওয়ার ঠিক আগে একটা সংকেত পাঠায়। অনেকটা আগাম সতর্কবার্তার মতো। শক্তি শোষণ করে লাফ দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তার অবস্থার সামান্য একটা বদল ঘটে। লেজারের সাহায্যে সেই বদলটুকু ধরা সম্ভব। এমনকি বিজ্ঞানীরা লাফের মাঝপথে ইলেকট্রনকে থামিয়ে দিতেও সক্ষম হন। সক্ষম হন, ইলেকট্রনকে তার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতেও! প্রশ্ন হলো, পুরো কোয়ান্টাম লাফে ঠিক কতটা সময় লাগে? বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ১ অ্যাটোসেকেন্ডের কাছাকাছি। খালি চোখে এই সময়ের ব্যবধানটুকু বোঝা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এই সময়ের মধ্যেও অনেক ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

গবেষকেরা লক্ষ করেন, ইলেকট্রন কোয়ান্টাম লাফ দেওয়ার ঠিক আগে একটা সংকেত পাঠায়। অনেকটা আগাম সতর্কবার্তার মতো।

এখন প্রশ্ন হলো, এক শক্তিস্তর থেকে লাফ দিয়ে আরেক শক্তিস্তরে পৌঁছানো পর্যন্ত ইলেকট্রন ঠিক কোথায় ও কী অবস্থায় থাকে? এখানেও আসলে একটা সুপারপজিশন তৈরি হয়। মধ্যবর্তী এই সময়ে ইলেকট্রন নতুন শক্তিস্তরেও পৌঁছায় না, আবার আগের শক্তিস্তরেও থাকে না। এই সময় ইলেকট্রন আসলে মেঘের মতো করে দুই শক্তিস্তরের মাঝখানে থাকে। আর ইলেকট্রন মেঘ মানেই তো অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনার খেলা। গোটা মেঘজুড়েই যেকোনো বিন্দুতে ইলেকট্রন থাকতে পারে।

এ বিষয়ে মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জিম আল-খালিলি বলেন, ‘লাফের সময় ইলেকট্রন শূন্যতার ওপর দিয়ে হেঁটে যায় না। সে সময় একটি সুপারপজিশন তৈরি করে। এই সুপারপজিশন সময় ও শক্তির ধারণা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। আর যা-ই হোক, কোয়ান্টাম জগৎ অলৌকিক কিছু নয়।’ খালিলির কথার রেশ ধরেই বলা যায়, কোয়ান্টাম লাফ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটা কোনো ভুতুড়ে ঘটনা নয়। এতেও কিছুটা হলেও সময় ব্যয় হয়।

লেখক: সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>