প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি নিয়মিত আয়োজন হলো ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’। এ আয়োজনে আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া একজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনলাইন এই আয়োজনে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বিকেল ৫টায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ২০২২ সালে এই বৃত্তি পাওয়া বিউটি সরকারকে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার এক গ্রামের মেয়ে বিউটি সরকার। তার পরিবারে মেয়েদের মধ্যে বিউটি-ই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পা রেখেছেন। তিনি চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক ও গবেষক হতে চান। পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে স্নাতক পর্যায়ে যাওয়া এবং তাঁর স্বপ্নের কথাগুলো ওঠে এসেছে এ অনুষ্ঠানে। আয়োজনটি একযোগে সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে। সভাটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। প্রশ্ন উত্তর আলোকে অনুষ্ঠানের চুম্বক অংশ নিয়ে লিখেছেন মো. নাজিম উদ্দিন।
'অদ্বিতীয়ার গল্প' অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগত। কেমন আছেন বিউটি?
বিউটি সরকার: ভালো আছি আপু।
আপনার একদম ছোটবেলার কথা দিয়ে শুরু করতে চাই। গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের এই স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা—যাত্রাপথটা কেমন ছিল?
বিউটি সরকার: আমি ছোটবেলা থেকেই পড়তে ভালোবাসতাম। আমার মা পড়াশোনার বেশি সুযোগ পাননি, কিন্তু বাবা ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় সাপোর্টার। গ্রাম থেকে আজকে এইউডব্লিউ পর্যন্ত আসার পুরো অবদানটাই আমার বাবার প্রচেষ্টার ফল।
কিন্তু চট্টগ্রামের এই আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজটি কীভাবে পেলেন? পরিবার কি মেয়েকে একা এতদূরে পাঠাতে দ্বিধা করেনি?
বিউটি সরকার: ইন্টারমিডিয়েটের পর বাবাই চেয়েছিলেন আমি যেন উচ্চশিক্ষার ভালো সুযোগ পাই। বিশেষ করে আমার কলেজের শিক্ষক বাবাকে এইউডব্লিউ সম্পর্কে জানান এবং এখানে ভর্তি পরীক্ষায় বসতে অনুপ্রাণিত করেন। আর পরিবারের কথা বলতে গেলে, আমার পরিবার ভীষণ সাপোর্টিভ। তাই একা চট্টগ্রামে গিয়ে থাকার ক্ষেত্রে আমাকে কোনো পারিবারিক বা সামাজিক বাধা ফেস করতে হয়নি।
সত্যিই আপনি ভাগ্যবতি। তবে এইউডব্লিউতে ক্লাস নেওয়া হয় সম্পূর্ণ ইংরেজিতে, প্রফেসরদের অধিকাংশই বিদেশি এবং অধিকাংশ রুমমেটও বিদেশি। বাংলা মিডিয়াম থেকে গিয়ে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?
বিউটি সরকার: সত্যি বলতে, শুরুতে খুব ভয় লাগত। আমার রুমমেটরা ছিল আফগানিস্তান ও ইরানের। তাদের সঙ্গে ইংরেজিতে কীভাবে যোগাযোগ করব বুঝতে পারতাম না, কারণ আগে তো বলার প্র্যাকটিস ছিল না। তবে ওরা খুব ভালো ছিল। আফগান রুমমেট প্রতিদিন সকালে আমাকে ইংরেজি গ্রামার শেখাত এবং পরামর্শ দিত। ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
আর ক্লাসরুম এবং প্রফেসরদের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
বিউটি সরকার: প্রফেসররা ভীষণ হেল্পফুল ও ফ্রেন্ডলি। পড়া না বুঝলে লার্নিং সেন্টারে আলাদা সময় দিতেন, এমনকি বাংলায় বুঝিয়ে দিতেন। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে আমার একটি পরিবারের মতোই মনে হয়েছে।
এইউডব্লিউতে একদিকে ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট, টার্ম পেপার, অন্যদিকে বিভিন্ন ক্লাব ও সাংস্কৃতিক উৎসব—এত কিছু একসঙ্গে সামলান কীভাবে? দিনে তো ২৪ ঘণ্টাই।
বিউটি সরকার: এটাকে বলে 'উইমেন পাওয়ার'। আমি পড়াশোনা আর রিসার্চ পেপার লেখার পাশাপাশি অর্গানিক কেমিস্ট্রি ও এনভারমেন্টাল সায়েন্স বিষয়ের 'টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট' হিসেবে পার্ট-টাইম কাজও করছি।
অসাধারণ। এই টাইম ম্যানেজমেন্টের সিক্রেট বা টিপসটা কী?
বিউটি সরকার: মূল টিপস হলো—আমাদের 'স্বপ্ন', যা আমাদের কখনোই দুর্বল হতে দেয় না। কাজের একটি প্রায়োরিটি লিস্ট করে ফেলি। গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দিই, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে কম। সময়টা ভাগ করে নিলে সব সহজ হয়ে যায়।
আপনি উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা করতে চান। গবেষণায় দেশের জন্য ঠিক কোন জায়গাটিতে কাজ করার ইচ্ছে আছে?
বিউটি সরকার: যেহেতু আমি পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছি, তাই আমার ইচ্ছা উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং 'ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট' (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা) নিয়ে কাজ করা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই।
দারুণ ভাবনা। আচ্ছা, আপনার এই সাফল্য দেখে আপনার বাবা-মা এখন কী বলেন?
বিউটি সরকার: তাঁরা এখন আমাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন। এখন তাদের স্বপ্ন—আমি বিদেশে গিয়েও যেন উচ্চশিক্ষা অর্জন করি। তাদের স্বপ্ন পূরণ করাটাই এখন আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
একটি মজার প্রশ্ন করি— এইউডব্লিউতে আসার আগে নিজের কনফিডেন্স, প্রেজেন্টেশন আর টাইম ম্যানেজমেন্ট স্কিলে ১০-এ কত দিতেন, আর এখন ৩য় বর্ষে এসে কত দেবেন?
বিউটি সরকার: আসার আগে দিতাম ১০-এ ৪! আর এখন দেব ৯ বা ৯.৫।
বাহ, অভিনন্দন আপনাকে! একদম শেষ প্রশ্ন—নতুন যে অদ্বিতীয়া বা শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি পড়াশোনা শুরু করেছে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
বিউটি সরকার: শুরুতেই ইংরেজি মিডিয়াম বা অন্য শিক্ষার্থীদের দেখে হতাশ হওয়া যাবে না। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি হলো একটি ভালো ও সেফ ফ্রেন্ড সার্কেল বা কমিউনিটি তৈরি করা, যারা মেন্টাল পিস দেবে ও বিপদে-আপদে সাপোর্ট করবে। প্রয়োজনে সিনিয়রদের সহযোগিতা নিতে হবে।
আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন সাহস জোগাবে। প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বিউটি সরকারকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভকামনা।
বিউটি সরকার: প্রথম আলো ট্রাস্ট এবং অদ্বিতীয়া প্রকল্পকে অনেক ধন্যবাদ আমার পাশে থাকার জন্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>