বিজ্ঞাপন
গোলগাছ কিংবা গোলপাতা কোনোটিই গোল নয়। তাহলে এই গাছ ও পাতার অঙ্গে-সঙ্গে গোল শব্দটি যুক্ত হলো কীভাবে? সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ফুল অথবা ফলের নামানুসারে কোনো গাছ বা উদ্ভিদের নাম নির্ধারণ করা হয়। গোলফল যখন ছড়িয়ে থাকে তখন দেখতে ঠিক পরিপাটি গোলগাল কাঁঠাল এবং কেয়া ফলের মতো। মূলত ছড়ায়-ছড়ায় ঝুলতে থাকা চোখ-জুড়ানো এমন নান্দনিক দৃশ্যশিল্পের কারণেই অজানা সুপ্রাচীন কাল থেকে ফলটির নাম গোলফল। সেই অনুপাতে উদ্ভিদের নাম গোলগাছ এবং এর পাতার নাম গোলপাতা মানুষের মুখে-মুখে জারি হতে হতে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।
তবে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় গোলফলকে গাবনা বলা হয়। ফলটি অপরিপক্ব অবস্থায় বাদামি রঙের হয় এবং ধীরে ধীরে কালচে বর্ণ ধারণ করে। ফলের কোষগুলোর আকৃতি-প্রকৃতি ঠিক যেন গোখরা সাপের ফণার মতো! প্রতিটি বীজ ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। পরিণত প্রতিটি স্বাভাবিক গোলফলের ওজন ৫০-১০০ গ্রামের হয়ে থাকে। প্রত্যেক কাঁদিতে প্রায় ৫০-১৫০টি পর্যন্ত বীজ-ফলের দেখা মেলে। কাঁচা অবস্থায় গোলফলের শাঁস খাওয়া যায়, যা অনেকটাই তাল শাঁসের মতো লাগে।
গোলফল প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও মিনারেলের উৎস। যাতে কৃমি দমন, পানি শূন্যতা পূরণ, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চর্মরোগের চিকিৎসা-উপকরণ বিশেষভাবে বিদ্যমান। বাণিজ্যিকভাবে গোলফলের কেনাবেচার রেওয়াজ সামগ্রিকভাবে এখনো চালু হয়নি। সুন্দরবনে যাওয়া বনজীবী ও উপকূলের মানুষেরাই গোলফলের শাঁস খান; এবং ডাঙ্গা এলাকার মেহমান গেলে তাদেরকে খাওয়ান।
গোলফলের কাঁদিতে ফলকে কেন্দ্র করে প্রথম দিকে গোলফুল ফোটে। স্প্যাডিক্স জাতীয় এসব ফুল ১-১.৫ মিটার লম্বা হয় এবং ফুলের মাথার অংশের ব্যাস প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। বছরব্যাপীই গোলফুল-ফলের উৎপাদন চোখে পড়ে। তবে আষাঢ় মাসে কাঁদিতে-কাঁদিতে মৌসুমি ফল ধরে। গোলগাছের বৈজ্ঞানিক নাম নাইপা ফ্রুটিক্যান্স এবং ইংরেজিতে নিপা পাম বলা হয়।
বাংলাদেশ এবং ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় গোলগাছ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া উদ্ভিদটি বিশ্বের নানান অঞ্চলের স্থানীয় বিভিন্ন নামে পরিচিত। মিয়ানমার- দানী, শ্রীলঙ্কা-জিং পল, মালয়েশিয়া- বুআহ নিপাহ, ইন্দোনেশিয়া- বুআহ আতপ, সিঙ্গাপুর-আত্তপ, ফিলিপাইন-নিপা, ভিয়েতনাম-দুয়া নুয়ক প্রভৃতি। সৃষ্টি জগতে গোলগাছের প্রধানতম উৎপত্তিস্থল ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপক‚লীয় লবণাক্ত স্বল্প বারিধারার কাদা-মাটির থরে-থরে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে গোলগাছ তার মূল জেনাস নিপা হতে উদ্ভূত একমাত্র প্রজাতি যার উপ-প্রজাতি নিপোডিয়া। চির-সুমহান স্রষ্টার রহমতে বিশ্ব ঐতিহ্যের লীলাভূমি আমাদের জাতীয় বন, সুন্দরবনের স্বল্প ও মধ্যম লবণাক্ত পরিবেশে বিপুলায়তনে গোলগাছের বাহারি পাতার দৃষ্টিনন্দন সৃজনকাব্য রচিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, বোর্নিও, পাপুয়া নিউগিনি, কম্বোডিয়া অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বন ও উপকূল-জুড়ে গোলগাছের সুবিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের পাশাপাশি এ বন ঘেঁষা উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালীর নদী-খাল-বিলের ধারে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া ও চাষাবাদকৃত গোল-বাগানের দর্শন পাওয়া যায়। এছাড়াও গোলের কৃষ্টি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর ও নদী-তীরবর্তী অন্তত ১৬-১৯ জেলায়।
আরও পড়ুন
সারাদেশে ১ লাখ তালগাছের চারা রোপণ করা হবে
কথায় আছে, হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা! অর্থাৎ হাতির বাঁচা-মরা দুটোই সমান। আর এমন নাম হয়েছে হাতির মূল্যবান দাঁত বা আইভরির জন্য। যা থেকে তৈরি হয় অনেক নামিদামি সামগ্রী। ঠিক একইভাবে গোলগাছের কোনো কিছুই ফেলনা নয়। গোলপাতা সচরাচর ২০-২৫ ফুটেরও বেশি লম্বা ও ১.৫-২.০ মিটার চওড়া হয়ে থাকে। সাধারণত প্রতিটি গাছে ৭-১০টি গোলপাতা পাওয়া যায়। গোলের চারার বয়স ৪-৫ বছর হওয়ার পর সেসব গাছ থেকে গোলপাতা আহরণ শুরু হয়। সবুজাভ এসব পাতা দেখতে নারকেলের পাতার ন্যায়। নারকেলের পাতার মতো প্রত্যেক পত্রে বিপরীতমুখী জোড়ায়-জোড়ায় ৬০-১২০টি পত্রক বা লিফলেট থাকে। আবার পূর্ণ-বয়সী গোলগাছ দেখতে ঠিক ৩-৪ বছরের নারকেল-গাছের আকৃতি বিশিষ্ট।
গোলগাছ ঝাড় আকারে বেড়ে ওঠে। এদের রাইজোম বা কাণ্ড মৃত্তিকা থেকে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়। গোলগাছের আদর্শ জন্মস্থান জোয়ার-ভাটার পলিযুক্ত লবণাক্ত স্বল্প বারিধারার কাদা-মাটি। এরা ফল থেকে গাছ হওয়ার পাশাপাশি রাইজোম প্রক্রিয়ায় এক গাছ থেকে অন্য গাছের সৃষ্টি করে। এভাবে গোলগাছের প্রাণ বেঁচে বা টিকে থাকে কাল থেকে কালান্তরে। যারা সুন্দরবনের গোলপাতা আহরণের মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে, তাদেরকে বাওয়ালী বলা হয়। অজানা কাল হতেই উপকূলের মানুষেরা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। আর এভাবেই খুলনাঞ্চলে বাওয়ালী বংশের উৎপত্তি হয়েছে।
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় সুন্দরবনের গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুম। এ বনের গোলপাতা আহরণের জন্য ফরেস্ট অফিসের পাসের প্রয়োজন হয়। মৌসুমে প্রায় ৩০ হাজার বাওয়ালী পাসে উল্লেখ করা নির্ধারিত কূপ বা জোনের গোলপাতা সংগ্রহের মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গোলপাতা কেটে কেটে বিশেষ পদ্ধতিতে নৌকায় মজুদ করা হয়। এ কাজে ছোট-বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ৫ হাজার নৌকা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বছরে সুন্দরবনের ৭০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন গোলপাতা সংগৃহীত হয়।
গোলপাতা আহরণের সময় অত্যধিক মৃত্যু ঝুঁকিতে ভোগে বাওয়ালীগণ। কারণ চির অকুতোভয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলার বাঘ গোলগাছের ঝুপড়ির মাঝে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, যা সহজে অনুমান করা যায় না। সুযোগ বুঝেই বাঘ মামা মানব ভাগ্নেদের ওপর বজ্রশক্তিতে আক্রমণ করে। এভাবে বাঘের থাবায় এ যাবৎকাল অনেক মানুষই মারা গেছেন এবং বাঘ-মানুষে বাঁচা-মরার লড়াই শেষে কেউ কেউ আল্লাহর রহমতে গাজী হয়ে বেঁচে ফিরে পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবন-যাপন করছেন।
আরও পড়ুন
বেতশিল্পে বৈদেশিক মুদ্রা এবং বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ
এছাড়া ভয়াল কুমির ও অজগর সাপসহ হরেক রকম জন্তু-জানোয়ারের ভয় তো রয়েছেই। তবুও যে খেয়ে-পরে জীবন ধারণের তাগিদে কতভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। এমন অসংখ্য পেশাজীবীদের প্রাণের মায়া ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের সভ্যতা নির্মিত হয়েছে। গোলপাতা প্রধানত ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আদিম পর্ব থেকে কয়েক যুগ আগ অবধি বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদ এবং তৎসংলগ্ন আশপাশের মহকুমা মিলিয়ে বর্তমানের অন্তত ২০ থেকে ২৫টি জেলার বসত-ঘরের প্রধানতম ছাউনি ছিল গোলপাতা। সব ধরনের ছাউনি, ঘরের বেড়া দেওয়াসহ আমাদের জীবনধারার কৃষ্টির নানান রকম সামগ্রী সৃষ্টিতে গোলপাতার নান্দনিক ভূমিকা ছিল।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন