গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলে সুতা উৎপাদনের পাঁচটি ইউনিট রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে কারখানাটিতে দিনে ১৭০ টন সুতা উৎপাদন হয়। তবে গ্যাস-সংকটের কারণে এক মাসের বেশি সময় ধরে উৎপাদন নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে। এই সময়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত জেনারেটরের সহায়তায় সীমিত উৎপাদন চালিয়ে যেতে হয়েছে।
মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোশাররফ হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, দুই দিন ধরে গ্যাসের চাপ বেড়ে ৩-৪ পিএসআই হয়েছে। যদিও উৎপাদন খুব বেশি বাড়েনি। তাঁর ভাষ্য, গত এক মাসে কম উৎপাদনের কারণে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের মতো দেশের ৬৬০টি বস্ত্রকল গত জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। এসব কারখানার উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ২০১৯ সাল থেকে ২৪৪টি বস্ত্রকল বন্ধ আছে।
বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গত সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এক ই-মেইলে এমন তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, বস্ত্রকলগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা ও যাচাই করা হচ্ছে। মূল্যায়ন শেষে কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সহযোগিতার বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে।
গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বস্ত্রকলগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় গত দুই–তিন দিনে গ্যাস পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে অনেক এলাকায় এখনো সংকট কাটেনি। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘায়িত সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
* বিটিএমএর দাবি, গ্যাস-সংকটে বস্ত্রকলগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।* গাজীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের এক মাসে ক্ষতি প্রায় ৫ কোটি টাকা।
গত ২১ জুলাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে নিয়োজিত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকেই দেশের শিল্পকারখানাগুলো তীব্র গ্যাস-সংকটে পড়ে। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। ১৫ আগস্ট এক্সিলারেট আংশিকভাবে এবং সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হয়। কিন্তু সংকট পুরোপুরি কাটার আগেই কার্গো সমস্যার কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তিন দিন বন্ধ থাকার পর ২২ আগস্ট টার্মিনালটি আবার চালু হয়। এরপর কিছু এলাকায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে।
তীব্র গ্যাস-সংকটে নরসিংদী শহরের সাটিরপাড়া এলাকার ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস টানা ২২ দিন বন্ধ ছিল। গত সপ্তাহে উৎপাদন শুরু হলেও শুধু রাতে কারখানাটি চালানো সম্ভব হয়েছে। কারণ, দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যেত। তবে গতকাল বিকেল থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজকে (গতকাল) বিকেল থেকে গ্যাস পাচ্ছি। এটি নিয়মিতভাবে পেলেই হলো। আমরা যদি ১৬-১৭ ঘণ্টা গ্যাসও পাই, তাহলে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’
নরসিংদীতে গ্যাস পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নারায়ণগঞ্জে সংকট এখনো প্রকট। জেলার ফতুল্লার বিসিক শিল্পপার্কে অবস্থিত এমএস ডাইং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস নেই। ফলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক বাবুল হোসেন জানান, তাঁদের কারখানায় দিনে ১১০ টন কাপড় ডাইং করা যায়। প্রতি কেজির ডাইং চার্জ ১০০ টাকা ধরলে ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। একই সঙ্গে গার্মেন্টস সেকশনে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ করা যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
গাজীপুরেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। কিছু শিল্পকারখানায় গ্যাস পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও অনেক কারখানায় এখনো সংকট রয়ে গেছে। শ্রীপুরের একটি বস্ত্রকলের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ এখনো ২ পিএসআইয়ের নিচে। ফলে সুতা উৎপাদন সক্ষমতার ৩০-৩৫ শতাংশের বেশি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তবে একই এলাকার এশিয়া কম্পোজিট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, দুই দিন ধরে গ্যাসের চাপ ৩ থেকে ৭-৮ পিএসআই পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। এতে তাঁদের সুতার উৎপাদন সক্ষমতার ৭০-৭৫ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল বা বস্ত্রকল রয়েছে। এর মধ্যে ৫২৭টি স্পিনিং মিল বা সুতার কল। বর্তমানে হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বস্ত্রকলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সন্তোষজনক থাকায় উৎপাদন মোটামুটি স্বাভাবিক আছে।
বিটিএমএর সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আমার নিজের প্রতিষ্ঠান চৈতি কম্পোজিটেও গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন নেমেছে ৪০ শতাংশে। এক মাস ধরে অধিকাংশ বস্ত্রকলেই প্রায় এমন অবস্থা চলছে।’
গ্যাস-সংকটের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের কারণে আমাদের বস্ত্রকলগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। সংকট কিছুটা দীর্ঘ হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারাও উদ্বিগ্ন। তবে আশার কথা হচ্ছে, গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।’
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি]
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>