একটি গ্রন্থাগারের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, আধুনিক আসবাব নয়; এমনকি বইও নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ পাঠক। কারণ, পাঠক না থাকলে লাখো বইও শেষ পর্যন্ত নিছক কাগজের স্তূপ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারের দিকে তাকালে সেই নির্মম সত্যটিই চোখে পড়ে। সেখানে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৪৭টি বই আছে। আছে ছয়টি বাংলা দৈনিক, দুটি ইংরেজি দৈনিক ও ১৩টি দেশীয় সাময়িকী। অথচ প্রায় সাত বছর ধরে এসব বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না পাঠকেরা।
২০১৯ সালে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পাঠকসেবা বন্ধ করা হয়েছিল। কথা ছিল, আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন নতুন ভবন হবে, পাঠকসেবা বাড়বে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হবে। কিন্তু সাত বছর পরও সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। ১৬ তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। তাতে প্রায় ১০ হাজার পাঠকের বসার ব্যবস্থা থাকার কথা। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯২ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৮৩ শতাংশ। অথচ গ্রন্থাগারের দরজা পাঠকের জন্য এখনো বন্ধ।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতার উদাহরণ নয়; এটি আমাদের উন্নয়নচিন্তার একটি গভীর অসুখের প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রায়ই প্রকল্প গ্রহণকে উন্নয়ন এবং প্রকল্পের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়কে সাফল্যের মাপকাঠি ধরে নিই। কিন্তু প্রকল্পটি মানুষের জীবন কতটা বদলাল, নাগরিক কতটা সুবিধা পেলেন, সেই প্রশ্নটি যেন গৌণ হয়ে যায়। ফলে ভবন তৈরি হয়, সড়ক হয়, সেতু হয়, প্রতিষ্ঠান হয়—কিন্তু যার জন্য এসব করা, সেই মানুষটি সেবা পান না।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারের ক্ষেত্রেও যেন একই ঘটনা ঘটেছে। ভবন নির্মাণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, দরপত্র, ঠিকাদারি, অনুমোদন, মেয়াদ বাড়ানো—এসবের নিজস্ব যুক্তি আছে। কিন্তু পাঠকের প্রয়োজনের যুক্তি আরও সরল: তিনি বই পড়তে চান। একজন শিক্ষার্থীকে সাত বছর অপেক্ষা করিয়ে কোনো প্রশাসনিক যুক্তিই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। একজন গবেষক সাত বছর হারিয়েছেন। একজন চাকরিপ্রার্থী, একজন লেখক, একজন সাধারণ বইপড়ুয়া মানুষ—সবার কাছ থেকেই সাতটি বছর কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
যে রাষ্ট্র বইয়ের জন্য ভবন বানায় কিন্তু পাঠককে বই থেকে সাত বছর দূরে রাখে, তার উন্নয়নচিন্তায় কোথাও একটি মৌলিক ভুল থেকে যায়। উন্নয়নের শেষ কথা ইট, বালু, সিমেন্ট কিংবা ব্যয়ের হিসাব নয়; শেষ কথা মানুষ। মানুষের প্রয়োজনের আগে প্রকল্পকে রাখলে উন্নয়ন অবকাঠামো তৈরি করতে পারে, কিন্তু সমাজ তৈরি করতে পারে না। আর যে উন্নয়ন মানুষকে জ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেটি শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন নয়—উন্নয়নের একটি ব্যয়বহুল ভ্রম মাত্র।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>