অতীতকে পাঠ করার নানা উপায় আছে। কখনো তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণা বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে; আবার কখনো এমন কিছু মুহূর্তের মুখোমুখি আমরা হই, যার সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে ধারণ করে একটিমাত্র আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে বহুস্তর গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব তেমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
জাপানি আলোকচিত্রী হিরোশি সুগিমোতোর কাজের অন্যতম প্রধান বিষয় সময়, স্মৃতি, দৃশ্যমানতা এবং আলোকচিত্রের প্রকৃতি নিয়ে এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। তিনি সাধারণত ৮×১০ ইঞ্চি বড় ফরম্যাটের ভিউ ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি তোলেন। তাঁর ছবিতে থাকে সমৃদ্ধ সাদা-কালো টোন ও দীর্ঘ এক্সপোজার। ফলে তাঁর আলোকচিত্র তাৎক্ষণিক মুহূর্তকে ধরে রাখার প্রচলিত ধারণা থেকে অনেক দূরে সরে যায়।
একটি মুহূর্তের ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য ধারণ করার বদলে সুগিমোতো ক্যামেরাকে এমন এক যন্ত্রে পরিণত করেন, যা সময়ের অদৃশ্য গতিকে দৃশ্যমান করে। তাঁর কাছে ক্যামেরা শুধু কোনো বস্তু বা দৃশ্যের ছবি তোলার মাধ্যম নয়; বরং অস্তিত্বকে বোঝার একটি উপায়।
দিয়োরামাস, সিস্কেপস, লাইটনিং ফিল্ডস এবং থিয়েটার্স নামক হিরোশি সুগিমোতোর গুরুত্বপূর্ণ সিরিজগুলোর মধ্য দিয়ে বারবার কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন ফিরে আসে।
বাস্তবতা কী? আমরা যা দেখি, তা কতখানি সত্য? সময়কে কি ছবিতে ধরা যায়? মানুষের চেতনার শুরু কোথায়? প্রকৃতির শক্তিকে মানুষ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? আর মানুষের তৈরি পৃথিবী যখন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়, তখন তার স্মৃতি কোথায় থাকে? সুগিমোতোর ছবি এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না; বরং দর্শককে প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে রাখে।

সিমুলাক্রা বলতে এমন এক প্রতিরূপকে বোঝায়, যা কোনো বাস্তবতার অনুকরণ করলেও শেষ পর্যন্ত নিজেই বাস্তবতার বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখানে জাদুঘরের কৃত্রিম প্রকৃতি বাস্তব প্রকৃতির অনুপস্থিতিতে তার একটি বিকল্প তৈরি করেছে। আর সুগিমোতোর আলোকচিত্র সেই বিকল্পেরও একটি নতুন প্রতিরূপ তৈরি করে। অদ্ভুতভাবে, মৃত্যুকে এখানে জীবনের মতো দেখায়।
১৯৭০-এর দশকে শুরু হওয়া দিয়োরামাস সিরিজে সুগিমোতো জাদুঘরে সংরক্ষিত কৃত্রিম প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎকে আলোকচিত্রের বিষয় হিসেবে বেছে নেন। এই সিরিজের ‘বার্ডস অব সাউথ জর্জিয়া (২০১২)’ ছবিটি তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ছবিতে আমরা দেখতে পাই পাথুরে, নুড়ি বিছানো একটি সমুদ্রতীর। সেখানে অসংখ্য কিং পেঙ্গুইন ও সামুদ্রিক পাখি দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিক পর্বতমালার ল্যান্ডস্কেপ। প্রথম দেখায় মনে হয়, এটি কোনো দূরবর্তী বন্য প্রকৃতির দৃশ্য। কিন্তু ছবিতে যে প্রকৃতি দেখা যাচ্ছে, তা আসলে কৃত্রিম। পাখিগুলো মৃত ও সংরক্ষিত। পাহাড়ও বাস্তব নয়। সবকিছু একটি জাদুঘরের তৈরি ও সাজানো দৃশ্যপট। সুগিমোতোর ক্যামেরা সেই কৃত্রিম দৃশ্যকে এমনভাবে ধারণ করে যে দর্শকের চোখ কিছুক্ষণের জন্য তার কৃত্রিমতাকে ভুলে যায়। ফলে এখানেই ছবিটির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়, আলোকচিত্র কি বাস্তবতার প্রমাণ দেয়, নাকি বাস্তবতার একটি নতুন সংস্করণ তৈরি করতে পারে?
সুগিমোতোর আলোকচিত্রের সমতল বিন্যাস ও আলোর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে দৃশ্যটির বিভিন্ন অংশ প্রায় একই সমতলে এসে যায়। ফলে কৃত্রিম দৃশ্যটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। মৃত পাখি জীবন্ত বলে মনে হয়। সাজানো ল্যান্ডস্কেপ প্রকৃতির মতো দেখায়। জাদুঘরের প্রদর্শনী একটি আলোকচিত্রে এসে বাস্তবতার মর্যাদা পায়।
এই কাজের মধ্যে ইতিহাসের একটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। প্রকৃতিকে সংগ্রহ করা, শ্রেণিবদ্ধ করা এবং জাদুঘরে প্রদর্শন করা আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাণী, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান সংগ্রহ করে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংরক্ষণ করা হতো। প্রকৃতিকে জানার পাশাপাশি তাকে শ্রেণিবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রবণতার মধ্যেই ক্ষমতার একটি সম্পর্ক কাজ করত।
‘বার্ডস অব সাউথ জর্জিয়া’ সেই ইতিহাসকে সরাসরি পুনর্নির্মাণ না করেও তার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।
ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ বোদ্রিয়ারের সিমুলাক্রা ধারণার আলোকে ছবিটিকে পড়লে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সিমুলাক্রা বলতে এমন এক প্রতিরূপকে বোঝায়, যা কোনো বাস্তবতার অনুকরণ করলেও শেষ পর্যন্ত নিজেই বাস্তবতার বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখানে জাদুঘরের কৃত্রিম প্রকৃতি বাস্তব প্রকৃতির অনুপস্থিতিতে তার একটি বিকল্প তৈরি করেছে। আর সুগিমোতোর আলোকচিত্র সেই বিকল্পেরও একটি নতুন প্রতিরূপ তৈরি করে। অদ্ভুতভাবে, মৃত্যুকে এখানে জীবনের মতো দেখায়।

জাপানি নান্দনিকতার ‘মা’ ধারণার সঙ্গে এই শূন্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ‘মা’ বলতে শুধু ‘খালি জায়গা’ বোঝায় না। বরং কোনো দৃশ্যের উপাদানগুলোর মধ্যে থাকা বিরতি, নীরবতা ও সম্ভাবনার স্থানকেও বোঝায়। সুগিমোতোর ছবিতে সেই শূন্যতা কোনো অভাব নয়; বরং সেটিই দর্শনের জায়গা তৈরি করে।
কৃত্রিম প্রকৃতির পর সুগিমোতো আমাদের নিয়ে যান একেবারে বিপরীত প্রান্তে। প্রকৃতির এমন এক দৃশ্যে, যেখানে মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। ‘লেক সুপিরিয়র, ইগল রিভার’ (২০০৩) তাঁর বিখ্যাত সিস্কেপস সিরিজের অন্তর্গত। ছবিটি অত্যন্ত সরল। একটি নিখুঁত দিগন্তরেখা ছবিটিকে প্রায় সমান দুই ভাগে ভাগ করেছে। ওপরে মসৃণ ধূসর আকাশ। নিচে জলের সূক্ষ্ম ঢেউ।
আলোকচিত্রের ফ্রেমে কোনো নৌকা নেই। কোনো ভবন নেই। কোনো পাহাড় বা স্থলভূমি নেই। এমনকি মানুষের উপস্থিতিরও কোনো চিহ্ন নেই। শূন্যতাই ছবিটির প্রধান বিষয় বা সেন্টার অব ইন্টারেস্ট। সুগিমোতো সিস্কেপস সিরিজে এমন জল ও আকাশের দৃশ্য ধারণ করতে চেয়েছিলেন, যা মানুষের চেতনার শুরুর সময়ের কোনো মানুষ হয়তো দেখে থাকতে পারে। অর্থাৎ এমন একটি দৃশ্য, যা সভ্যতা, রাষ্ট্র, সীমান্ত, প্রযুক্তি এবং ইতিহাসের আগেও ছিল।
যে কারণে ‘লেক সুপিরিয়র, ইগল রিভার’ শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানের আলোকচিত্র নয়। ছবির মধ্যে স্থানটি যেন তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ফেলে। আলোকচিত্রটি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সমুদ্র বলে মনে হতে পারে। এখানে ভূরাজনীতিরও একটি নীরব অনুপস্থিতি আছে। পৃথিবীর মানচিত্রে সীমান্ত আছে। রাষ্ট্র আছে। মালিকানা আছে। কিন্তু এই ছবিতে সেসব কিছুই নেই। পানি ও আকাশের মাঝখানে কোনো রাষ্ট্রীয় সীমারেখা নেই। লং এক্সপোজারে আলোকচিত্রটি ধারণ করার কারণে পানির ক্ষণস্থায়ী ঢেউগুলোও মসৃণ হয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের বদলে আমরা যেন সময়ের একটি দীর্ঘ প্রবাহ দেখতে পাই।
জাপানি নান্দনিকতার ‘মা’ ধারণার সঙ্গে এই শূন্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ‘মা’ বলতে শুধু ‘খালি জায়গা’ বোঝায় না। বরং কোনো দৃশ্যের উপাদানগুলোর মধ্যে থাকা বিরতি, নীরবতা ও সম্ভাবনার স্থানকেও বোঝায়। সুগিমোতোর ছবিতে সেই শূন্যতা কোনো অভাব নয়; বরং সেটিই দর্শনের জায়গা তৈরি করে।
পাশাপাশি পশ্চিমা মিনিমালিজমের সঙ্গেও ছবিটির সম্পর্ক রয়েছে। স্বল্প উপাদান দিয়ে সর্বাধিক চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করা সুগিমোতোর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আধুনিক পৃথিবী যেখানে তথ্য, শব্দ, বিজ্ঞাপন এবং দৃশ্যের অতিরিক্ততায় পূর্ণ, সেখানে এই ছবি আমাদের প্রায় কিছুই দেখায় না। আর সেই ‘কিছু না দেখানো’র মধ্যেই আমরা অনেক কিছু দেখতে শুরু করি।

জর্জ দিদি-হুবেরমানের চিন্তার সঙ্গে এখানে একটি সম্পর্ক তৈরি করা যায়। তাঁর আলোচনায় ছবি শুধু কোনো দৃশ্যের প্রতিনিধিত্ব নয়; কখনো কখনো কোনো ঘটনা বা শক্তির সরাসরি ছাপ হয়ে উঠতে পারে। লাইটনিং ফিল্ডসে বিদ্যুৎ যেন নিজেই নিজের স্মৃতি ফিল্মের ওপর লিখে যায়। এখানে আলোকচিত্রী কোনো দৃশ্যের সাক্ষী নন। তিনি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেন, যেখানে শক্তিই ছবির নির্মাতা হয়ে ওঠে।
‘লাইটনিং ফিল্ডস ২১৬’ (২০০৯) ছবিতে সুগিমোতো আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রচলিত ক্যামেরাকেই প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে দেন।
এখানে কোনো লেন্সের মাধ্যমে কোনো দৃশ্য ধারণ করা হয়নি। ‘ভ্যান ডি গ্রাফ জেনারেটর’ ব্যবহার করে উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক স্রোত সরাসরি ফটোসেনসিটিভ ফিল্মের ওপর প্রয়োগ করা হয়। সেই বিদ্যুৎ ফিল্মে তৈরি করে শাখা-প্রশাখার মতো উজ্জ্বল রেখার একটি জটিল নেটওয়ার্ক। কালো পটভূমির ওপর বিদ্যুতের এই বিস্তার দেখতে অনেকটা গাছের শিকড়, রক্তনালি কিংবা কোনো অজানা জীবের স্নায়ুতন্ত্রের মতো।
কিন্তু এটি কোনো কিছুর ছবি নয়। এটি নিজেই একটি ঘটনা।
আলোকচিত্রের ইতিহাসে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূত্র আছে। উনিশ শতকের প্রথম দিকের কিছু পরীক্ষায় আলো ও বিভিন্ন ভৌত শক্তি সরাসরি ফটোসেনসিটিভ পদার্থের ওপর ছাপ তৈরি করেছিল। সুগিমোতোর কাজ সেই প্রাথমিক পরীক্ষামূলক চেতনার সঙ্গে সমকালীন প্রযুক্তিকে যুক্ত করে। এখানে মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি শক্তিকে সামনে নিয়ে আসছে, যার সম্পূর্ণ আচরণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিদ্যুৎ এখানে একই সঙ্গে বিজ্ঞান এবং রহস্য।
ছবিটির জৈবিক আকৃতিগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো পরিকল্পিত কোনো নকশা নয়। বিদ্যুতের নিজস্ব গতিপথ থেকে তৈরি হয়েছে। ফলে ছবির সৌন্দর্য মানুষের আঁকা নয়; বিদ্যুতের নিজস্ব গতিপথই ফিল্মের ওপর তার রেখা তৈরি করেছে।
জর্জ দিদি-হুবেরমানের চিন্তার সঙ্গে এখানে একটি সম্পর্ক তৈরি করা যায়। তাঁর আলোচনায় ছবি শুধু কোনো দৃশ্যের প্রতিনিধিত্ব নয়; কখনো কখনো কোনো ঘটনা বা শক্তির সরাসরি ছাপ হয়ে উঠতে পারে। লাইটনিং ফিল্ডসে বিদ্যুৎ যেন নিজেই নিজের স্মৃতি ফিল্মের ওপর লিখে যায়। এখানে আলোকচিত্রী কোনো দৃশ্যের সাক্ষী নন। তিনি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেন, যেখানে শক্তিই ছবির নির্মাতা হয়ে ওঠে।
রোলাঁ বার্তের স্টুডিয়াম ও পাংকটামের ধারণা দিয়ে আলোকচিত্রটিকে পড়লে আরেকটি স্তর খুলে যায়। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্যটি আমাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক তথ্যের দিকে নিয়ে যায়। এটি ছবিটির স্টুডিয়াম। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে থাকা অস্বাভাবিক উজ্জ্বল সাদা পর্দাটি আমাদের দৃষ্টি আটকে দেয়। সেটিই হয়ে ওঠে ছবিটির পাংকটাম—একটি আকস্মিক, প্রায় অস্বস্তিকর উপস্থিতি।
সুগিমোতোর থিয়েটারস সিরিজ সময়কে নিয়ে তাঁর সবচেয়ে বিস্ময়কর অনুসন্ধানগুলোর একটি।
‘প্যালেস থিয়েটার, গ্যারি’ (২০১৫) এই সিরিজের একটি শক্তিশালী উদাহরণ। ছবিটি ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরের একটি পরিত্যক্ত সিনেমা হলের ভেতরে তোলা। ১৯২৫ সালে নির্মিত এই প্রেক্ষাগৃহ তখন ভাঙাচোরা। চারপাশে ধ্বংসাবশেষ। স্থাপত্যের গায়ে ক্ষয়ের চিহ্ন। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে একটি জিনিস এখনো উজ্জ্বল। একটি বিশাল, সম্পূর্ণ সাদা পর্দা।
সুগিমোতো পুরো একটি চলচ্চিত্র চলার সময় শাটার খোলা রেখেছিলেন। চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেম থেকে আসা আলো একে একে ফিল্মে জমা হয়েছে। হাজার হাজার পৃথক দৃশ্য, মুখ, আন্দোলন ও মুহূর্তের আলো মিলে শেষ পর্যন্ত তৈরি করেছে একটি সাদা আলোর ক্ষেত্র। অর্থাৎ আলোকচিত্রটির মধ্যে পুরো চলচ্চিত্রটি আছে। কিন্তু কোনো দৃশ্য নেই। সিনেমার সমস্ত সময় সেখানে উপস্থিত, অথচ তার কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্ত দেখা যায় না।
এখানে একটি গভীর কনট্রাস্ট তৈরি হয়। প্রেক্ষাগৃহটি মৃত। সিনেমা হলটি পরিত্যক্ত। স্থাপত্য ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু পর্দাটি যেন এখনো আলো ছড়াচ্ছে। এই ছবিকে শুধু ফটোগ্রাফি বা সিনেমা নিয়ে কাজ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ইতিহাসটি বাদ পড়ে যায়।
গ্যারি যুক্তরাষ্ট্রের রাস্ট বেল্টের অন্তর্গত একটি শিল্পশহর; শিল্পের পতন ও পুঁজির স্থানান্তরের ফলে এ অঞ্চলের বহু শহর দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক অবক্ষয় ও জনশূন্যতার মুখোমুখি হয়েছে। সেই বৃহত্তর ‘রাস্ট বেল্ট’ ইতিহাসের একটি চিহ্ন এই পরিত্যক্ত সিনেমা হল।
সিনেমা হল একসময় ছিল সম্মিলিত অভিজ্ঞতার জায়গা। মানুষ একই অন্ধকার ঘরে বসে একই চলচ্চিত্র দেখত। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের সঙ্গে দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা ক্রমশ ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে। তাই ‘প্যালেস থিয়েটার, গ্যারি’ শুধু একটি পুরোনো ভবনের ছবি নয়। এটি একটি সামাজিক অভিজ্ঞতার পরিবর্তনের ছবিও।
রোলাঁ বার্তের স্টুডিয়াম ও পাংকটামের ধারণা দিয়ে আলোকচিত্রটিকে পড়লে আরেকটি স্তর খুলে যায়। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্যটি আমাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক তথ্যের দিকে নিয়ে যায়। এটি ছবিটির স্টুডিয়াম। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে থাকা অস্বাভাবিক উজ্জ্বল সাদা পর্দাটি আমাদের দৃষ্টি আটকে দেয়। সেটিই হয়ে ওঠে ছবিটির পাংকটাম—একটি আকস্মিক, প্রায় অস্বস্তিকর উপস্থিতি।
মৃত একটি দালানের ভেতর সেই সাদা আলো যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া সময়ের শেষ সংকেত।

সুগিমোতোর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি সম্ভবত এখানেই। তিনি আমাদের এমন কিছু দেখান, যা চোখে দেখা যায় না। একটি ছবির মধ্যে তিনি ধরে রাখেন সময়ের প্রবাহ, কোনো ঘটনার স্মৃতি, একটি হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর ছায়া কিংবা অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি। তাঁর আলোকচিত্র আমাদের একটি অস্বস্তিকর অথচ গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ছবিতে আমরা যা দেখি, সেটিই কি সত্যিই ছবির বিষয়? নাকি ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সব সময় সেই অদৃশ্য সময়, যা ছবিটির ভেতর দিয়ে চলে গেছে?
সুগিমোতোর এই চার সিরিজের দিকে একসঙ্গে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আসলে চার ধরনের দৃশ্য ধারণ করছেন না। তিনি চারভাবে সময়কে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছেন।
দিয়োরামাসে সময়কে থামিয়ে রাখা হয়েছে। মৃত প্রাণী ও কৃত্রিম প্রকৃতি একটি স্থির অতীতকে বর্তমানের সামনে ধরে রাখে। সিস্কেপসে সময় দীর্ঘ হয়ে যায়। ঢেউয়ের ক্ষণস্থায়ী আন্দোলন দীর্ঘ এক্সপোজারে মিলিয়ে গিয়ে একটি প্রায় আদিম স্থায়িত্ব তৈরি করে। লাইটনিং ফিল্ডসে সময় একটি বৈদ্যুতিক ঘটনার ক্ষণিক ছাপ হয়ে ফিল্মে জমা হয়। আর থিয়েটার্সে কয়েক ঘণ্টার একটি চলচ্চিত্র একটি মাত্র সাদা আয়তক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে যায়।
অর্থাৎ সুগিমোতোর ছবিতে সময় কখনো থেমে থাকে, কখনো প্রবাহিত হয়, কখনো বিস্ফোরিত হয়, আবার কখনো সম্পূর্ণ সাদা হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
সুগিমোতোর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা আসলে কী দেখতে পারি?
দিয়োরামাস আমাদের দেখায় যে চোখকে সহজেই প্রতারিত করা যায়। কৃত্রিম দৃশ্যও বাস্তব বলে মনে হতে পারে। সিস্কেপস দেখায়, অতিরিক্ত সরলতার মধ্যেও অসীম অর্থ থাকতে পারে। লাইটনিং ফিল্ডস দেখায়, ক্যামেরা ছাড়াও আলোকচিত্র তৈরি হতে পারে। আর থিয়েটার্স দেখায়, একটি চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্য ফিল্মে থাকার পরও কোনো দৃশ্য দৃশ্যমান না–ও হতে পারে।
এই অর্থে সুগিমোতো আলোকচিত্রকে শুধু ‘দেখার’ প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন না। তিনি আলোকচিত্র দেখতে পারার সীমা নিয়েও কাজ করেন। তাঁর ছবিতে যা দৃশ্যমান, তার চেয়ে কখনো কখনো যা অদৃশ্য, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুগিমোতোর লং এক্সপোজারকে শুধু একটি ফটোগ্রাফিক টেকনিক হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের গভীরতা বোঝা কঠিন। দীর্ঘ সময় ধরে শাটার খোলা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি ক্যামেরার প্রচলিত সময়বোধকে বদলে দেন। যেখানে সাধারণ ক্যামেরা বলে— এই মুহূর্তটি দেখো। সেখানে সুগিমোতোর ক্যামেরা যেন বলে—এই মুহূর্তের আগে এবং পরে কী ছিল, সেটিও ভাবো।
সুগিমোতোর আলোকচিত্রে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। একটি পুরোনো সিনেমা হল বর্তমানের ধ্বংসাবশেষ হয়েও অতীতের সম্মিলিত স্মৃতি বহন করে। হ্রদ বর্তমানের একটি দৃশ্য হয়েও মানুষের চেতনার আগের পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। জাদুঘরের মৃত পাখি জীবনের একটি কৃত্রিম স্মৃতি হয়ে ওঠে। আর বিদ্যুতের ছাপ কোনো দৃশ্য না হয়েও একটি ঘটনার স্মৃতি ধারণ করে।
এই জায়গায় সুগিমোতোর আলোকচিত্রের সঙ্গে ওয়াল্টার বেনজামিনের ‘অরা’ ও স্মৃতির ধারণার একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। কোনো ছবি যখন তার বিষয়কে শুধু পুনরুৎপাদন করে না, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়, উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির অনুভূতি তৈরি করে, তখন ছবিটি তার দৃশ্যমান বিষয়কে অতিক্রম করতে পারে। সুগিমোতোর ছবির নীরবতা সেই অনুভূতিকে আরও তীব্র করে।
হিরোশি সুগিমোতোর ছবি আমাদের সামনে খুব সামান্য কিছু রাখে। কখনো একটি দিগন্ত। কখনো একটি সাদা পর্দা। কখনো মৃত পাখির দল। কখনো অন্ধকারের মধ্যে বিদ্যুতের শাখা-প্রশাখা। কিন্তু সেই মিনিমাল দৃশ্যের ভেতর তিনি খুলে দেন বিশাল এক চিন্তার ক্ষেত্র। তাঁর কাছে আলোকচিত্র কোনো নিরপেক্ষ নথি নয়। ক্যামেরা বাস্তবতাকে শুধু সংরক্ষণ করে না। এটি বাস্তবতা নিয়ে আমাদের ধারণাকেও প্রশ্ন করতে পারে। তাঁর ছবির আসল বিষয় সম্ভবত পেঙ্গুইন নয়, সমুদ্র নয়, বিদ্যুৎ নয়, সিনেমা হলও নয়। আসল বিষয় সময়। আর সময়ের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় স্মৃতি, মৃত্যু, অস্তিত্ব এবং মানুষের দেখার সীমা।
সুগিমোতোর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি সম্ভবত এখানেই। তিনি আমাদের এমন কিছু দেখান, যা চোখে দেখা যায় না। একটি ছবির মধ্যে তিনি ধরে রাখেন সময়ের প্রবাহ, কোনো ঘটনার স্মৃতি, একটি হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর ছায়া কিংবা অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি।
তাঁর আলোকচিত্র আমাদের একটি অস্বস্তিকর অথচ গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ছবিতে আমরা যা দেখি, সেটিই কি সত্যিই ছবির বিষয়? নাকি ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সব সময় সেই অদৃশ্য সময়, যা ছবিটির ভেতর দিয়ে চলে গেছে?
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>