জাতীয়

জেব্রার গায়ে সাদা–কালো ডোরা হলো যেভাবে

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

এটি আফ্রিকার সান জনগোষ্ঠীর লোককাহিনি। সানরা দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শিকারি-সংগ্রাহক সম্প্রদায়ের সমষ্টি। তাদের বুশম্যান নামেও ডাকা হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন রকম লোকগল্প আছে। তার মধ্যে প্রাণীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সূচনা নিয়ে অসংখ্য লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে।

অনেক দিন হলো বৃষ্টি নেই। মাটি শুকিয়ে কাঠ। মাঠ ফেটে চৌচির। মাটির ওপর পড়েছে গাছের দীর্ঘ ছায়া। এই খরার দশা দেখে জেব্রা খুবই চিন্তায় আছে। তার ছোট ছেলেটা অবশ্য নিশ্চিন্তে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু জেব্রা জানত, সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

এর আগেও একবার এমন ভয়াবহ খরা নেমে এসেছিল। তখন সে ছিল অনেক ছোট। তবু সেই সময়ের কথা আজও তার মনে আছে। তাদের দলকে কত কষ্টই–না সহ্য করতে হয়েছিল! দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়া তার বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি এগিয়ে যাও। অন্য কোনো নদী খুঁজে বের করো। আমি একটু বিশ্রাম নিয়ে তোমার কাছে চলে আসব।’

কিন্তু জেব্রা আর কোনো দিন তার বাবাকে দেখেনি। কোনো সিংহ কি তাকে ধরে ফেলেছিল? নাকি তৃষ্ণায় মারা গিয়েছিল? সে কথা জেব্রা কখনো জানতে চায়নি।

‘বাবা! এদিকে এসো! এটা কী, দেখো!’ চিন্তার সুতা ছিঁড়ে গেল ছেলের ডাক শুনে।

অজান্তেই জেব্রার মুখে হাসি ফুটল। ছেলেটা সব সময়ই তার নতুন নতুন আবিষ্কার বাবাকে দেখাতে ভালোবাসে। হয়তো হালকা রঙের একটা পাথর খুঁজে পেল বা কমলা রঙের একটি প্রজাপতি, কিংবা বাতাসে ঘাসের নাচ; সবই বাপকে দেখাতে হবে তার!

সেই সময় জেব্রার চোখ পড়ল ঘাসের দিকে। সবই শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে। সামান্য আগুন লাগলেই মুহূর্তে দাবানল ছড়িয়ে পড়বে...

‘বাবা!’ অধৈর্য কণ্ঠে আবার ডাকল ছেলেটি। ‘দেখো, আমি কী খুঁজে পেয়েছি!’

জেব্রা তাকিয়ে দেখল, সুন্দর সবুজ রঙের একটি গুবরে পোকা। কিন্তু পোকাটা মরে গিয়েছিল। অবশ্য কথাটা সে ছেলেকে বলতে চাইল না। মৃত্যুর কথা জানলে কষ্ট পাবে বাচ্চা ছেলেটা।

সে বরং ছেলেকে বলল, ‘চলো। আমরা একটু ঘুরেফিরে আসি। আমরা একটা ভ্রমণে যাই।’

‘কোথায়?’ বেড়াতে যাওয়ার উত্তেজনায় ছেলের চোখ গোল হয়ে গেল।

জেব্রা নিজেও অবশ্য জানত না সে কোথায় যাবে। তাই হেসে বলল,

‘এখনই তো সেটা বলব না। ধরে নে তোকে একটা চমক দেব!’

‘আমরা কি মায়ের কাছে যাচ্ছি?’ ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।

জেব্রা বিষণ্ন চোখে ছেলের দিকে তাকাল। ছেলেটির মা মানুষের হাতে মারা গিয়েছিল। মানুষের শিকার উৎসবে এমন অনেকই মারা যায়। কিন্তু সত্যিটা এখনো ছেলেকে জানায়নি জেব্রা।

সে শুধু বলল, ‘আমরা একটা জায়গায় যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছলেই বুঝবে।’

জেব্রা
জেব্রা

জেব্রা আসলে এই জায়গা ছেড়ে যেতে চাইছিল। একটা নদী তাকে খুঁজে নিতে হবে। তাদের পালের অনেকেই ইতিমধ্যে চলে গেছে। জেব্রা এত দিন অপেক্ষা করেছিল। কারণ, সে নিশ্চিত ছিল না বাচ্চাটা দীর্ঘ পথ হাঁটতে পারবে কি না। আর পথের শেষে আদৌ নদী পাওয়া যাবে কি না।

জেব্রার কাকা তাকে বলেছিল, বড় পাহাড়টার ওপারে একটা নদী আছে। কিন্তু আসলেও আছে কি না, সেটা নিয়ে কেউ নিশ্চিত ছিল না। এর আগে অত দূর পর্যন্ত কেউ কখনো যায়নি।

জেব্রা আর তার ছেলে হাঁটতেই থাকল। ছোট ছেলেটা প্রচুর কথা বলে। একটানা গল্প করেই যাচ্ছিল। তার বলার আছে অনেক কিছু।

বাবা কি জানে, একেবারে অন্ধকার রাতে, যখন চাঁদের আলোও থাকে না, তখন ছোট ছোট কিছু পোকা আগুনের মতো জ্বলে ওঠে? তার বন্ধু বলেছে, ওদের নাম জোনাকি। কিন্তু তাদের ছুঁলেও নাকি কিছু হয় না!

আর বাবা কি এটা জানে, যে নদীটা এখন প্রায় শুকিয়ে গেছে, সেখানে একসময় এমন বিশাল মাছ ছিল? মাছটা নাকি হাতির শুঁড়ের চেয়েও বড়।

বাবা কি জানে, উটপাখি পাখি হয়েও উড়তে পারে না?

আহা, তার বোকা বাবাটা তো কিছুই জানে না!

জেব্রা স্নেহভরে হাসল। আহা, কত খুশিই–না সে হবে যখন ছেলেটা বড় হয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

হঠাৎ ছেলেটা থমকে গেল। একটা পাখি দেখেছে সে।

উচ্চস্বরে বলল, ‘দেখো বাবা! ওই হলুদ পাখিটাকে দেখো!’

বলেই সে ঝোপের ভেতর দৌড়ে ঢুকে পড়ল।

‘দাঁড়া!’ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল জেব্রা। কিন্তু ততক্ষণে ছেলে চোখের আড়াল।

জেব্রা ছুটে গেল তার পেছনে। সেখানে গিয়েই চোখে পড়ল এক ঝলমলে জলাশয়। চারপাশের গাছের সবুজ ছায়া পড়ে জল যেন পান্নার মতো ঝিকমিক করছে।

‘বাবা দেখো, একটা পুকুর!’ আনন্দে বলে উঠল ছেলেটি।

কত দিন! কত দিন পর একটা জলাশয় চোখে পড়ল। প্রচণ্ড তৃষ্ণা তখন। পানি খেতে সেই পুকুরের দিকে এগোল জেব্রা। ঠিক তখনই গম্ভীর একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

‘দূরে সরে যাও। আমি ওই পুকুরের মালিক। এই রাজ্য আমার, পানিও আমার’, ঘোষণা করল কেউ।

জেব্রা তাকিয়ে দেখল এক বিশাল বেবুন বসে আছে আগুনের পাশে। সে-ই কথা বলে উঠেছে। জেব্রা দেখল বেবুনের মুখটা সিংহের মতোই ভয়ানক। তেমনই কেশর।

কিন্তু ওই কথা শুনে ছোট্ট জেব্রা হেসে ফেলল। কিন্তু তার বাবা মোটেই হাসল না। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘পানি সবার। একটা পুকুরকে কেউ একার সম্পত্তি বলতে পারে না।’

‘আমি পারি’, বলে উঠে দাঁড়াল বেবুন। আর তখনই বোঝা গেল সে জেব্রার ধারণার চেয়েও বড়।

বাচ্চা ছেলেটার মুখে হঠাৎ ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। বড় জেব্রা শান্ত গলায় বলল, ‘চারদিকে ভয়াবহ খরা চলছে। তুমি যদি এই পানি অন্যদের সঙ্গে ভাগ না করো, সেটা অন্যায়। এত প্রাণী তৃষ্ণায় মরছে, তাতে তোমার কিছু যায় আসে না?’

আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা জেব্রা

বেবুন কাঁধ ঝাঁকাল। অর্থাৎ কে মরল তাকে সে কী করবে! সে আবারও বলল, ‘এই পানি শুধুই আমার।’ বলে সে জেব্রার দিকে এগোতে লাগল।

জেব্রা কিন্তু একচুলও পিছু হটল না। সে বেবুনের দাপটের কাছে মাথা নোয়াবে না। জেব্রা আবার বলল, ‘যুক্তি আছে আমার কথায়। মেনে নাও। বিষয়টাকে নোংরা করো না।’

বেবুন শুনবে না সেসব। সে এক লাফে জেব্রার পিঠে উঠে বেধড়ক মারতে শুরু করল।

‘থামো! থামো!’ চিৎকার করে উঠল জেব্রার ছোট্ট ছেলেটা।

কিন্তু বেবুন তো থামার পাত্র না। জেব্রাও এত সহজে হার মানবে না। সে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁকুনি দিল। বেবুন ছিটকে মাটিতে পড়ল।

কিন্তু লড়াই তখনো শেষ হয়নি।

ছোট্ট জেব্রা আতঙ্কে চিৎকার করতে লাগল, আর এদিকে জেব্রা ও বেবুনের মধ্যে তুমুল মারামারি। একজন লাথি মারে তো একজন ঘুষি। একজন কাটে আঁচড়।

গাছের ডালে বসে থাকা পাখিরা ভয়ে উড়ে পালাল। শেষ পর্যন্ত জেব্রা এমন জোরে বেবুনকে লাথি মারল যে সে আকাশে উড়ে গিয়ে দূরের পাথরের ওপর গিয়ে পড়ল।

এত জোরে পড়ল যে তার পশ্চাদ্দেশ লাল হয়ে গেল।

জেব্রা খুব ক্লান্ত হয়ে গেল। কিন্তু সে খুশি হয়েছে। কেননা, সে পানি খুঁজে পেয়েছে! পানির অধিকারও দখল করেছে। এখন সে তার পালকে খবর দিতে পারবে। সবার জীবন বাঁচানো যাবে।

সে উঠে এগোতে লাগল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে খেয়ালই করল না কোথায় পা ফেলছে। হঠাৎ সে বেবুনের জ্বালানো আগুনের ওপর পড়ে গেল।

জেব্রার শরীর ছিল ধবধবে সাদা। কিন্তু ডালপালা দিয়ে জ্বালানো আগুন প্রথমে তার পায়ে লাগল, ফেলল কালো ছোপ। আগুন থেকে বাঁচতে দিয়ে আবারও সে গা ঝাড়া দিতে আগুন থেকে ডালপালা উঠে তার গায়েই পড়ল। মুহূর্তেই তার সুন্দর সাদা গায়ে আগুনের দাগ পড়ে কালো ডোরা তৈরি হয়ে গেল।

আতঙ্কিত তার ছেলে মুখ ভর্তি করে পানি নিয়ে আগুনের ওপর ছুড়ে দিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। জেব্রার সারা শরীরে কালো ডোরা পড়ে গেছে।

‘চলো বাড়ি ফিরি’, মন খারাপ করে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে বলল ছোট্ট ছেলেটি। এক পা এগোতেই আবার বলল, ‘দেখো! বৃষ্টি শুরু হয়েছে!’

সত্যিই তাই। জেব্রা আকাশের দিকে তাকাল। নীল আকাশজুড়ে ধূসর মেঘ ছুটে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘ খরার পর অবশেষে বৃষ্টি এসেছে।

জেব্রা আর তার ছেলে সমতলের নিজের বাড়িতে ফিরে গেল। এইবারের মতো লড়াই শেষ। কিন্তু জেব্রা জানত, বেবুন কোনো দিন তাকে ভুলবে না।

সেই কারণেই নাকি আজও জেব্রার গায়ে কালো ডোরা দেখা যায়। আর বেবুনদের পশ্চাদ্দেশ আজও লাল। ব্যথা কমানোর জন্য তারা এখনো লেজ উঁচু করে হাঁটে!

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>