ব্রেকিং নিউজ
জাতীয়

জেমস সিলভেস্টার: ম্যাট্রিক্সে যাঁর ছাপ রয়ে গেছে আজও

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

১৮৩৭ সাল। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন বিখ্যাত ম্যাথমেটিক্যাল ট্রাইপস পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ পরীক্ষা ছিল না। সে যুগে গণিতবিদদের মেধার সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল এই পরীক্ষা। সেবার দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বাজিমাত করলেন এক তরুণ। মেধা ও যোগ্যতায় তিনি সবচেয়ে সেরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডিগ্রি দিতে অস্বীকৃতি জানাল! তাঁর অপরাধ? তিনি ইংল্যান্ডের চার্চের ‘থার্টি-নাইন আর্টিকলস’-এ সই করতে তিনি রাজি হননি। তাই তাঁর প্রাপ্য ডিগ্রিটুকু তাঁকে দেওয়া হলো না। এমনকি সম্মানজনক স্মিথস প্রাইজ ও অন্যান্য ফেলোশিপ থেকেও তাঁকে চরমভাবে বঞ্চিত করা হলো।

বঞ্চনার এই নির্মম আঘাত যে কাউকে হয়তো হতাশায় ডুবিয়ে দিত। কিন্তু এই তরুণ ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। সমাজের এই বৈষম্য তাঁকে দমাতে পারেনি, উল্টো তিনি হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক বীজগণিতের অন্যতম দিকপাল। গণিতের পরিভাষায় আমরা আজ যে ম্যাট্রিক্স, গ্রাফ বা ডিসক্রিমিন্যান্ট শব্দগুলো ব্যবহার করি, তা এই মানুষটিরই মস্তিষ্কপ্রসূত। চলুন, এই জেদি গণিতবিদের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনের গভীরে ঢুঁ মারা যাক।

সে যুগে জেমস জোসেফের বড় ভাই যখন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তখন অভিবাসীদের নিয়মানুযায়ী নামের সঙ্গে একটি পারিবারিক পদবি বা সারনেম থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।

দুই

লন্ডনের আকাশ সেদিন কেমন ছিল, তা হয়তো ইতিহাস মনে রাখেনি। তবে শহরটি ছিল ব্যস্ত, কোলাহলমুখর। ঘোড়ার গাড়ির শব্দে রাস্তাঘাট মুখর, কারখানার ধোঁয়ায় আকাশ অনেকটা ধূসর। শহরের কোথাও কোথাও নতুন শিল্পযুগের ব্যস্ততা পুরোনো লন্ডনকে বদলে দিচ্ছে। এমন এক সময়ে এই শহরে জন্ম নিল এক ছোট্ট শিশু।

নাম রাখা হলো জেমস জোসেফ। বাবা আব্রাহাম জোসেফের সঙ্গে মিলিয়ে এমন নাম। তখনো তাঁর নামের সঙ্গে সিলভেস্টার যুক্ত হয়নি। সে যুগে তাঁর বড় ভাই যখন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তখন অভিবাসীদের নিয়মানুযায়ী নামের সঙ্গে একটি পারিবারিক পদবি বা সারনেম থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।

ছোটবেলা থেকেই জেমস ছিলেন দারুণ মেধাবী

তাই বড় ভাই নিজের নামের শেষে ‘সিলভেস্টার’ শব্দটি যুক্ত করেন। বড় ভাইয়ের দেখাদেখি ছোট জেমস জোসেফও নিজের নামের সঙ্গে এই শব্দটা জুড়ে নেন।

ছোটবেলা থেকেই জেমস ছিলেন দারুণ মেধাবী। একটু রগচটা স্বভাবেরও ছিলেন বৈকি। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত গণিতবিদ অগাস্টাস ডি মরগানের অধীনে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সেখানে এক সহপাঠীর সঙ্গে তাঁর তুমুল ঝগড়া ও মারামারি বেঁধে যায়। এই ঘটনার জের ধরে তাঁর পরিবার তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে। এরপর তিনি লিভারপুল রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন।

মাত্র ১৪ বছর বয়সেই জেমস লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত গণিতবিদ অগাস্টাস ডি মরগানের অধীনে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সেখানে এক সহপাঠীর সঙ্গে তাঁর তুমুল ঝগড়া ও মারামারি বেঁধে যায়।

১৮৩১ সালে কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজে তাঁর সত্যিকারের গণিতচর্চা শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর শারীরিক অসুস্থতায় ভোগার পরও তিনি সেই বিখ্যাত ট্রাইপস পরীক্ষায় বসেন এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় হন। কিন্তু ডিগ্রি না পাওয়ায় তাঁর শিক্ষাজীবন এক অদ্ভুত বাঁধার সম্মুখীন হয়।

কেমব্রিজের ট্রাইপস পরীক্ষা নিয়ে এখন অনেক কুখ্যাতি থাকলেও, সে যুগে এই পরীক্ষাই ছিল ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পথ।  পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করত ভবিষ্যতের অনেক দরজা খুলবে কি না। তবে সেই পরীক্ষায় ক্লাসের বই থেকে কোনো প্রশ্ন আসত না। প্রশ্নগুলো হতো ধাঁধা টাইপের। ফলে ক্লাসের পড়ার ফাঁকে ট্রাইপসের জন্য আলাদাভাবে পড়তে হতো।

আসলে ব্যাপারটা ছিল উল্টো। তখনকার শিক্ষার্থীরা ট্রাইপসের প্রস্তুতির ফাঁকে ক্লাসের পড়া পড়তেন। টাকার বিনিময়ে আলাদাভাবে বাসায় শিক্ষার্থীদের পড়াতেন শিক্ষকেরা। তাঁদের বলা হতো কোচ। সেখান থেকেই আজকের কোচিংয়ের ধারণা। এই পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের অস্বাভাবিক চাপের মধ্যে থাকতে হতো। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে তরুণেরা পরীক্ষার হলে বসত, তারপর কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষাই ঠিক করে দিত তাদের ভাগ্য।

মেধা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারত না। এমন একটি পরীক্ষায় জেমস দ্বিতীয় হয়েও মেলেনি স্বীকৃতি। পরীক্ষা ব্যবস্থা যত খারাপই হোক, বা যতই কুখ্যাতি থাকুক না কেন; আমাদের বুঝতে হবে, তর্কসাপেক্ষে তখন এটিই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে আক্ষরিক অর্থেই জীবন শেষ! সেখানে জোসেফকে ডিগ্রি না দেওয়াটা আরও বড় বিপদ।

কেমব্রিজের ট্রাইপস পরীক্ষা নিয়ে এখন অনেক কুখ্যাতি থাকলেও, সে যুগে এই পরীক্ষাই ছিল ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পথ।  পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করত ভবিষ্যতের অনেক দরজা খুলবে কি না।

তিন

ডিগ্রি না পাওয়ায় জোসেফ থেমে যাননি। যে পরীক্ষাব্যবস্থা তাঁর সামনে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, তিনি যেন তার পাশ দিয়েই নিজের জন্য অন্য একটি পথ তৈরি করে নিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর মেধার স্বীকৃতি আসতে শুরু করল। ১৮৩৮ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে ন্যাচারাল ফিলোসফির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ঠিক পরের বছরই রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৮৪১ সালে আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন থেকে অর্জন করেন তাঁর বহুল আকাঙ্ক্ষিত ব্যাচেলর অব আর্টস ও মাস্টার্স ডিগ্রি।

এরপর তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর বদমেজাজ বিপত্তি ঘটায়।

১৮৩৮ সালে জোসেফ ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে ন্যাচারাল ফিলোসফির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন

মাত্র চার মাসের মাথায় দুজন ছাত্রের সঙ্গে তাঁর রীতিমতো সহিংস লড়াই হয়। তিনি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। ইতিহাসবিদদের মতে, ক্লাসে এক ছাত্র চরম বেয়াদবি করলে সিলভেস্টার তাঁর লাঠি দিয়ে ছাত্রকে আঘাত করেন। আমাদের দেশের প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনাটাই সে যুগে পুরো ক্যাম্পাসে আলোড়ন ফেলেছিল!

এরপর তিনি নিউইয়র্কে আসেন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করলেও তাঁকে নানা কারণ দেখিয়ে সেই পদ দেওয়া হয়নি। বঞ্চনায় হতাশ হয়ে ১৮৪৩ সালের নভেম্বরে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান।

ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন জোসেফ। কিন্তু সেখানেও তাঁর বদমেজাজ বিপত্তি ঘটায়। মাত্র চার মাসের মাথায় দুজন ছাত্রের সঙ্গে তাঁর রীতিমতো সহিংস লড়াই হয়।

দেশে ফিরে তিনি এমন একটি পেশা বেছে নিলেন, যেখানে গণিতের জ্ঞান সরাসরি কাজে লাগানো যায়। তিনি যোগ দিলেন ইকুইটি অ্যান্ড ল লাইফ অ্যাসিওরেন্স সোসাইটিতে। এটি ছিল একটি জীবনবিমা কোম্পানি। সেখানে তাঁর কাজ ছিল মূলত হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে বোঝা, কোন বয়সের মানুষের কত দিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটা, ভবিষ্যতে কতজন বিমার টাকা দাবি করতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী গ্রাহকদের কাছ থেকে কত টাকা প্রিমিয়াম নেওয়া উচিত।

জোসেফের হাতে এই কাজ যেন গণিতের একটি নতুন পথ খুলে দিল। নিজের গাণিতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি বিমার ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ খরচ হিসাব করার জন্য নানা ধরনের গাণিতিক মডেল তৈরি করতে শুরু করলেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক কাজগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

কিন্তু এই পদের জন্য আইন পাসের ডিগ্রি দরকার ছিল। তাই তিনি আইনি পড়াশোনা শুরু করেন এবং তখনই তাঁর পরিচয় হয় আরেক কিংবদন্তি গণিতবিদ আর্থার কেলির সঙ্গে। কেলিও তখন আইন পড়ছিলেন। এই দুজনের জুটি আধুনিক গণিতের ইতিহাস চিরতরে বদলে দেয়। ম্যাট্রিক্স থিওরি এবং ইনভ্যারিয়েন্ট থিওরিতে তাঁরা একসঙ্গে অভাবনীয় কাজ করেন। এমনকি সে যুগে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরাও সিলভেস্টারের কাছে গোপনে গণিত শিখতেন বলে শোনা যায়। যদিও এই তথ্যের কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।

একটি সংখ্যাকে কতগুলো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়, তা নিয়ে সিলভেস্টার যুগান্তকারী কাজ করেছেন। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ নিয়ে কাজ করতে তিনি দারুণ ভালোবাসতেন।

চার

১৮৫৫ সালে সিলভেস্টার আবারও শিক্ষকতায় ফেরেন। এবার লন্ডনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৮৬৯ সালে ৫৫ বছর বয়সে তাঁকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো হয়। নিজের পেনশনের টাকা পাওয়ার জন্যও তাঁকে দীর্ঘ আইনি লড়াই করতে হয়েছিল। ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা, ঠিক তার তিন বছর পর ১৮৭২ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় অবশেষে তাদের দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সিলভেস্টারকে তাঁর প্রাপ্য ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়।

বিজ্ঞানের জগতে সিলভেস্টার ছিলেন এক সত্যিকারের জাদুকর। কম্বিনেটরিক্স শাখায় তিনি ম্যাট্রিক্স, ডিসক্রিমিন্যান্ট এবং গ্রাফের মতো শব্দগুলোর জন্ম দেন।

১৮৬৯ সালে ৫৫ বছর বয়সে সিলভেস্টারকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো হয়

তিনি নিজেকে মজা করে ‘গাণিতিক অ্যাডাম’ বলে ডাকতেন। তাঁর দাবি ছিল, সমসাময়িক যুগের সব গণিতবিদ মিলে গণিতের জগতে যত পরিভাষা তৈরি করেছেন, তিনি একাই তার চেয়ে বেশি নামের প্রচলন ঘটিয়েছেন!

তিনি ছিলেন মূলত একজন বীজগণিতবিদ। সংখ্যাতত্ত্বে তাঁর অসাধারণ অবদান রয়েছে। একটি সংখ্যাকে কতগুলো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়, তা নিয়ে তিনি যুগান্তকারী কাজ করেছেন। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ নিয়ে কাজ করতে তিনি দারুণ ভালোবাসতেন।

১৮৫৫ সালে সিলভেস্টার আবারও শিক্ষকতায় ফেরেন। এবার লন্ডনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৮৬৯ সালে ৫৫ বছর বয়সে তাঁকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো হয়।

এখানে ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ একটু সহজ করে সংক্ষেপে বলি। এটি এমন এক ধরনের সমীকরণ, যেখানে আমরা শুধু পূর্ণসংখ্যা উত্তর খুঁজি। যেমন ১, ২, ৩, ১০, −৫ ইত্যাদি। এই সমীকরণে ভগ্নাংশ বা দশমিক উত্তর চলবে না। ধরুন, আপনার কাছে ২ টাকার ও ৫ টাকার কয়েন আছে। মোট কয়েন ৭টি, সব মিলিয়ে টাকার পরিমাণ ২৬ টাকা। তাহলে প্রশ্ন হলো, কোন কয়েন কতটি? এটাকে সমীকরণে লিখলে হবে:

2x + 5y = 26

এখানে x হলো ২ টাকার কয়েনের সংখ্যা, আর y ৫ টাকার। আমাদের এমন x ও y খুঁজতে হবে, যেগুলো পূর্ণসংখ্যা। চলুন চেষ্টা করি।

x = 3 হলে, 2x মানে 2 × 3 = 6 টাকা। তাহলে বাকি ২০ টাকা ৫ টাকার কয়েনে পাওয়া যাবে। অর্থাৎ 5 × 4 = 20 টাকা। মান বসালেও একই হবে। অর্থাৎ, x = 3, y = 4। কিন্তু যদি প্রশ্ন হতো 2x + 5y = 27, তখন পূর্ণসংখ্যায় সমাধান পাওয়া যাবে কি না, সেটাও খুঁজে দেখতে হবে। এই যে সমীকরণে পূর্ণসংখ্যায় উত্তর খোঁজা, এটাই ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের মূল ব্যাপার। এটি নামকরণ করা হয়েছে প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ ডায়োফ্যান্টাসের নামে।

x = 3 হলে, 2x মানে 2 × 3 = 6 টাকা। তাহলে বাকি ২০ টাকা ৫ টাকার কয়েনে পাওয়া যাবে। অর্থাৎ 5 × 4 = 20 টাকা। মান বসালেও একই হবে। অর্থাৎ, x = 3, y = 4।

যাহোক, গণিতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য ধাঁধা তৈরি করতেও বেশ পটু ছিলেন জোসেফ। তাঁর একটি বিখ্যাত ধাঁধা ছিল এমন: ‘আমার কাছে ৫ টাকা ও ১৭ টাকা মানের অনেকগুলো ডাকটিকিট আছে। এই দুই মানের টিকিট দিয়ে বানানো যায় না এমন সবচেয়ে বড় অঙ্কটি কত?’ এর উত্তর খুঁজে বের করতে পারেন আপনিও। চেষ্টা করে দেখুন!

পাইয়ের মান বের করার জন্যও তিনি একটি চমকপ্রদ গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। কাঠামোটি এমন:

এখানে ভগ্নাংশের ভেতর আবার ভগ্নাংশ, তার ভেতর আবার ভগ্নাংশ; এভাবে চলতেই থাকে। একে বলে অবিচ্ছিন্ন ভগ্নাংশ। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, প্রথমে ২-এর সঙ্গে একটি ভগ্নাংশ যোগ করা হয়েছে। সেই ভগ্নাংশের নিচে আবার আরেকটি ভগ্নাংশ আছে, তার নিচেও আরেকটি; এভাবে অসীম পর্যন্ত। মজার ব্যাপার হলো, এই অসীম ধারাটি হিসাব করতে থাকলে ফলাফল ধীরে ধীরে পাইয়ের মানের দিকে যাবে। অর্থাৎ, এই ভগ্নাংশের মান হবে প্রায় ৩.১৪১৫৯।

একটি বিখ্যাত ধাঁধা ছিল এমন: ‘আমার কাছে ৫ টাকা ও ১৭ টাকা মানের অনেকগুলো ডাকটিকিট আছে। এই দুই মানের টিকিট দিয়ে বানানো যায় না এমন সবচেয়ে বড় অঙ্কটি কত?’

পাঁচ

সিলভেস্টার শুধু নীরস সমীকরণের মানুষ ছিলেন না। ধ্রুপদী সাহিত্য, বিশেষ করে গ্রিক ও ল্যাটিনের ওপর তাঁর অগাধ দখল ছিল। নিজের গাণিতিক গবেষণাপত্রগুলোতে তিনি প্রায়ই ল্যাটিন ও গ্রিক কবিতার লাইন জুড়ে দিতেন। তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। সংগীতেও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। বিখ্যাত ফরাসি সুরকার চার্লস গোনডের কাছ থেকে তিনি গানের তালিমও নিয়েছিলেন।

সংগীত ও গণিতের অপূর্ব এক সম্পর্ক নিয়ে তিনি একবার লিখেছিলেন, ‘সংগীতকে কি অনুভূতির গণিত বলা যায় না? আর গণিত কি যুক্তির সংগীত নয়? একজন সংগীতজ্ঞ গণিত অনুভব করেন, আবার একজন গণিতবিদ সংগীত নিয়ে ভাবেন। সংগীত হলো স্বপ্ন, আর গণিত হলো কর্মময় জীবন’।

জীবনের শেষ দিকে, ১৮৭৬ সালে তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ম্যারিল্যান্ডের নতুন প্রতিষ্ঠিত জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রথম দিককার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৮৭৮ সালে সেখানে তিনি আমেরিকান জার্নাল অব ম্যাথমেটিকস প্রতিষ্ঠা করেন, যা সে যুগে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র দ্বিতীয় পেশাদার গণিত সাময়িকী ছিল।

জীবনের শেষ দিকে, ১৮৭৬ সালে সিলভেস্টার আবারও যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ম্যারিল্যান্ডের নতুন প্রতিষ্ঠিত জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রথম দিককার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি।

১৮৮৩ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যামিতির স্যাভিলিয়ান অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তবে গবেষণার জগতে তাঁর যে খ্যাতি, শ্রেণিকক্ষে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি। ছাত্রদের কাছে তিনি কখনোই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। কারণ ক্লাসে তিনি নিজের গবেষণার বিষয় নিয়েই কথা বলতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। ছাত্রদের গণিতের অন্য শাখাগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কিংবা তাদের শেখার জগৎটাকে আরও বিস্তৃত করে তোলার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল তুলনামূলক কম।

১৮৮৩ সালে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন সিলভেস্টার

সময়ও তখন ধীরে ধীরে তাঁর কাছ থেকেও অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। জীবনের শেষদিকে তাঁর স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে। কমে আসে দৃষ্টিশক্তিও। ১৮৯২ সালে অক্সফোর্ডের অধ্যাপকের পদটি তখনো তাঁর নামে থাকলেও তিনি লন্ডনে ফিরে আসেন। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটতে থাকে লন্ডনের অ্যাথেনিয়াম ক্লাবে। একসময় যে মানুষটি সংখ্যার গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্য খুঁজে বেড়িয়েছেন, শেষ বয়সে তাঁকেই ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতি ও দৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছিল।

১৮৯২ সালে অক্সফোর্ডের অধ্যাপকের পদটি তখনো জোসেফ সিলভেস্টারের নামে থাকলেও তিনি লন্ডনে ফিরে আসেন। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটতে থাকে লন্ডনের অ্যাথেনিয়াম ক্লাবে।

১৮৯৭ সালের ১৫ মার্চ থেমে গেল তাঁর জীবনের হিসাব। চলে গেলেন জোসেফ সিলভেস্টার। তাঁর চলে যাওয়া নিছক কোনো মানুষের মৃত্যু নয়; সংখ্যার এক গভীর জগতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। যে মন একদিন অঙ্কের কঠিন দেয়াল ভেদ করে নতুন পথের সন্ধান করেছিল, যে মানুষ গণিতের সৌন্দর্যকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, একদিন সেই মনটিই থেমে গেল। রয়ে গেল তাঁর কাজ, তাঁর চিন্তা, তাঁর রেখে যাওয়া গণিত। সেই গণিতের ভেতর আজও নীরবে বেঁচে আছেন জেমস জোসেফ সিলভেস্টার।

সূত্র: ম্যাথ মেকারস: দ্য লাইভস অ্যান্ড ওয়ার্কস অব ফিফটি ফেমাস ম্যাথেমেটিশিয়ান অবলম্বনে

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>