ডিএনএ কী, তা হয়তো সবার জানা। ডিএনএ হলো একপ্রকার রাসায়নিক পদার্থ, যার পুরো নাম ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড। এটি আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। এই ডিএনএই আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যেমন চোখের রং, চুলের রং, দেহের গঠন, এমনকি আমাদের বেশ কিছু আচরণও বংশপরম্পরায় বহন করে নিয়ে যায়। আমাদের সব আচার-আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ আর পুরো জীবনপঞ্জির খসড়া লেখা থাকে এই ডিএনএতে। একে বলা যায় আমাদের ব্যক্তিগত জীবনভ্রমণের ডায়েরি। কিন্তু এই ডায়েরি হুবহু কারও সঙ্গে মেলে না, যতই একই পরিবারের মানুষ হোক না কেন।
ডিএনএ আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। এটি আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যেমন চোখের রং, চুলের রং, দেহের গঠন, এমনকি আমাদের বেশ কিছু আচরণও বংশপরম্পরায় বহন করে নিয়ে যায়।
ডিএনএ হলো দুটি অত্যন্ত লম্বা পলিমার শৃঙ্খল, যা পরস্পর পেঁচিয়ে একটি ডাবল হেলিক্স বা দ্বিকুণ্ডলীর মতো গঠন সৃষ্টি করে। এই শৃঙ্খলটি গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট ছোট একক বা নিউক্লিওটাইড দিয়ে। প্রতিটি নিউক্লিওটাইডে থাকে একটি ফসফেট গ্রুপ, একটি শর্করা (ডিঅক্সিরাইবোজ) এবং একটি নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারক (বেস)। এই ক্ষারকগুলোই আসলে মূল তথ্যবাহক। এগুলো চার ধরনের: অ্যাডেনিন (A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G) এবং সাইটোসিন (C)।

একটি শৃঙ্খলে A-এর বিপরীতে অন্য শৃঙ্খলে T বসে, আর G-এর বিপরীতে বসে C। A, T, G, C অক্ষরের এই বিন্যাসই হলো আমাদের জিনগত ভাষা। যেমন কোনো বইয়ের অক্ষর সাজিয়ে গল্প তৈরি হয়, তেমনি এই অক্ষরের ক্রমেই তৈরি হয় আমাদের গুণাবলির অসংখ্য গল্প। মানুষের ডিএনএতে প্রায় ৩০০ কোটি বেস পেয়ার রয়েছে, অথচ তার ভেতরেই সাজানো আছে আমাদের জীবন পরিচালনার পুরো নির্দেশিকা।
ডিএনএ হলো দুটি অত্যন্ত লম্বা পলিমার শৃঙ্খল, যা পরস্পর পেঁচিয়ে একটি ডাবল হেলিক্স বা দ্বিকুণ্ডলীর মতো গঠন সৃষ্টি করে। এই শৃঙ্খলটি গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট ছোট একক বা নিউক্লিওটাইড দিয়ে।
এবার আসি ডিএনএ বারকোডের কথায়। বাজারে তো প্রতিটি পণ্যের গায়ে কালো-সাদা লম্বা লম্বা বারকোড দেখেছেন। দোকানের স্ক্যানার মেশিন তা পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই বলে দেয় পণ্যের নাম, দাম, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, কোম্পানির ঠিকানা সবকিছু। ডিএনএ বারকোডের কাজও অনেকটা তা-ই, কিন্তু পার্থক্য হলো এখানে পণ্য নয়, বরং পৃথিবীর যেকোনো প্রাণী, উদ্ভিদ, এমনকি ছত্রাক বা অণুজীবকে শনাক্ত করা হয়। আর দোকানের বারকোড মানুষ বানিয়েছে, কিন্তু ডিএনএ বারকোড তৈরি করছে প্রকৃতি নিজেই; বিজ্ঞানীরা শুধু সেটাকে ‘পড়তে’ শিখেছেন।
তবে বারকোড বলতে ডিএনএর পুরো অংশকে বোঝায় না। ডিএনএ এত দীর্ঘ যে এর পুরোটার সিকোয়েন্স বা ক্রম নির্ধারণ করা অনেক সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তাই বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ অংশ খুঁজে বের করেছেন, যা প্রতিটি প্রজাতির মধ্যে অনন্য কিন্তু প্রজাতির ভেতরের সব সদস্যের মধ্যে প্রায় একই রকম।

প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই অংশটি হলো মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএতে অবস্থিত সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজ সাবইউনিট ১ বা সংক্ষেপে CO1/COX1 জিন। মাইটোকন্ড্রিয়া হলো কোষের সেই অংশ, যাকে আমরা কোষের বিদ্যুৎকেন্দ্র বলি। এই CO1 জিনটির প্রায় ৬৫০ বেস পেয়ার দৈর্ঘ্যের একটি নির্দিষ্ট খণ্ড প্রতিটি প্রাণী প্রজাতির জন্য আলাদা হয়। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা ভিন্ন জিন ব্যবহার করা হয়, যেমন rbcL বা matK। কারণ, উদ্ভিদের CO1 জিন তেমন বৈচিত্র্য দেখায় না। কিন্তু এই একটি ছোট্ট অংশই একটি প্রজাতিকে অন্য সব প্রজাতি থেকে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট।
মাইটোকন্ড্রিয়া হলো কোষের সেই অংশ, যাকে আমরা কোষের বিদ্যুৎকেন্দ্র বলি। এই CO1 জিনটির প্রায় ৬৫০ বেস পেয়ার দৈর্ঘ্যের একটি নির্দিষ্ট খণ্ড প্রতিটি প্রাণী প্রজাতির জন্য আলাদা হয়।
ল্যাবরেটরিতে কীভাবে এই ডিএনএ বারকোড তৈরি করা হয়, চলুন তার ধাপগুলো জেনে নিই। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক।
প্রথম ধাপ: নমুনা সংগ্রহ ও ডিএনএ নিষ্কাশন
যে প্রাণী বা উদ্ভিদকে আমরা শনাক্ত করতে চাই, তার শরীরের খুব অল্প অংশ—যেমন মাছের আঁশ, পাখির পালক, পোকামাকড়ের একটি পা, উদ্ভিদের একটি পাতা, এমনকি মাত্র এক ফোঁটা রক্তই এর জন্য যথেষ্ট। এই নমুনাটি প্রথমে একটি টিউবে নিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে পিষে ফেলা হয়। একে বলা হয় হোমোজেনাইজেশন। এরপর এতে কিছু বিশেষ রাসায়নিক দ্রবণ যোগ করা হয়, যা কোষের প্রাচীর ও নিউক্লিয়াসের ঝিল্লি ভেঙে ডিএনএকে বের করে আনে। একে বলে লাইসিস বাফার। সঙ্গে থাকে কিছু এনজাইম (যেমন প্রোটিনেজ K), যা ডিএনএর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রোটিনগুলোকে কেটে আলাদা করে ফেলে। এবার এই মিশ্রণ থেকে ডিএনএকে বিশুদ্ধ করতে হয়। সেটি করা হয় ফেনল-ক্লোরোফর্ম বা সিলিকা কলামের মাধ্যমে; যাতে শুধু ডিএনএ থাকে এবং বাকি সব আবর্জনা বাদ পড়ে যায়। শেষ ধাপে অল্প পরিমাণ ইথানল দিয়ে ডিএনএকে অধঃক্ষেপণ (প্রেসিপিটেশন) করিয়ে শুকনো পেলেট আকারে সংগ্রহ করা হয়। এই পেলেটটিই হলো আমাদের কাঁচা ডিএনএ। এরপর এটিকে বাফার দ্রবণে দ্রবীভূত করে পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
২৬০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো শোষণের মাত্রা দেখে ডিএনএর পরিমাণ বোঝা যায়। আর ২৮০ ন্যানোমিটারে শোষণ দেখে বোঝা যায় ডিএনএতে প্রোটিনের দূষণ আছে কি না।
দ্বিতীয় ধাপ: ডিএনএর গুণমান ও পরিমাণ যাচাই
শুধু ডিএনএ বের করলেই হয় না, সেটি যথেষ্ট ভালো মানের কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হয়। কারণ নমুনা যদি পুরোনো হয় বা পচে গিয়ে থাকে, তাহলে ডিএনএ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তখন বারকোডিং কাজ করে না। তাই একটি স্পেকট্রোফোটোমিটার মেশিনে ডিএনএর ঘনমাত্রা মাপা হয়। ২৬০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো শোষণের মাত্রা দেখে ডিএনএর পরিমাণ বোঝা যায়। আর ২৮০ ন্যানোমিটারে শোষণ দেখে বোঝা যায় ডিএনএতে প্রোটিনের দূষণ আছে কি না। একটি আদর্শ ডিএনএ নমুনায় ২৬০/২৮০ অনুপাত হয় ১.৮-এর কাছাকাছি। এর পাশাপাশি, অ্যাগারোজ জেল ইলেকট্রোফোরেসিস নামে একটি পদ্ধতিতে ডিএনএকে জেলের ওপর দিয়ে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে চালানো হয়। ডিএনএ যদি অক্ষত থাকে, তাহলে জেলের ওপর একটি পরিষ্কার ও চওড়া ব্যান্ড দেখা যায়। আর যদি ভাঙা থাকে, তাহলে মলিন বা ধোঁয়াটে ব্যান্ড দেখা যাবে। শুধু মানসম্মত ডিএনএ নিয়েই পরবর্তী কাজ করা হয়।
নমুনা যদি পুরোনো হয় বা পচে গিয়ে থাকে, তাহলে ডিএনএ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তখন বারকোডিং কাজ করে না। তাই একটি স্পেকট্রোফোটোমিটার মেশিনে ডিএনএর ঘনমাত্রা মাপা হয়।
তৃতীয় ধাপ: পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন
ডিএনএ বারকোডিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এই পিসিআর বা পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন। কারণ আমাদের হাতে থাকা ডিএনএ অত্যন্ত অল্প। কিন্তু সেই অল্প ডিএনএর মধ্য থেকে CO1 অংশটি বারবার কপি করে বিপুল সংখ্যায় বাড়িয়ে তুলতে হয়, যাতে সেটিকে সিকোয়েন্স মেশিনে পড়ার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ তৈরি হয়। এই কাজটি করে পিসিআর মেশিনটি। এর জন্য প্রথমে দুটি ছোট কৃত্রিম ডিএনএ টুকরোর প্রয়োজন হয়, যাদের বলে প্রাইমার। এই প্রাইমারগুলো তৈরি করা হয় CO1 জিনের শুরুর ও শেষের দিকের অংশের সঙ্গে মিল রেখে। একটি হলো ফরওয়ার্ড প্রাইমার (যেমন HCO2198) এবং অন্যটি রিভার্স প্রাইমার (যেমন LCO1490)। এগুলো ইউনিভার্সাল প্রাইমার নামে পরিচিত, কারণ এগুলো প্রায় সব প্রাণী প্রজাতিতেই কাজ করে।
একটি চক্রে একটি ডিএনএ অণু থেকে দুটি তৈরি হয়। এই চক্রটি ৩০ থেকে ৪০ বার পুনরাবৃত্তি হলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি ডিএনএ অণু থেকে কয়েক কোটি কপি তৈরি হয়ে যায়।
এরপর একটি টিউবে আমরা মেশাই অল্প পরিমাণ নিষ্কাশিত ডিএনএ, দুটি প্রাইমার, কিছু মুক্ত নিউক্লিওটাইড (dNTPs), একটি বিশেষ এনজাইম যার নাম টাক পলিমারেজ। এটি তাপ সহ্য করতে পারে এবং এটি বাফার দ্রবণ। এই টিউবটিকে পিসিআর মেশিনে রেখে তাপমাত্রার একটি চক্রের মধ্য দিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম করা হয়, এতে ডিএনএর দুটি শৃঙ্খল আলাদা হয়ে যায়। তারপর তাপমাত্রা নামিয়ে ৪৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রিতে আনা হয়, এতে প্রাইমারগুলো তাদের জায়গা খুঁজে নিয়ে ডিএনএর সঙ্গে যুক্ত হয়। শেষে তাপমাত্রা বাড়িয়ে ৭২ ডিগ্রি করা হয়, এই তাপমাত্রায় টাক পলিমারেজ এনজাইম কাজ শুরু করে এবং প্রাইমার থেকে শুরু করে নতুন করে ডিএনএর শৃঙ্খল তৈরি করে।
এই একটি চক্রে একটি ডিএনএ অণু থেকে দুটি তৈরি হয়। এই চক্রটি ৩০ থেকে ৪০ বার পুনরাবৃত্তি হলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি ডিএনএ অণু থেকে কয়েক কোটি কপি তৈরি হয়ে যায়। এখন এই পিসিআর প্রোডাক্টকে আবার আগের মতো অ্যাগারোজ জেলে চালিয়ে দেখা হয় যে ঠিক ৬৫০-৭০০ বেস পেয়ারের জায়গায় একটি উজ্জ্বল ব্যান্ড এসেছে কি না। এসেছে মানে বুঝতে হবে আমাদের বারকোডিং অংশটি সফলভাবে বাড়ানো হয়েছে।
শেষে তাপমাত্রা বাড়িয়ে ৭২ ডিগ্রি করা হয়, এই তাপমাত্রায় টাক পলিমারেজ এনজাইম কাজ শুরু করে এবং প্রাইমার থেকে শুরু করে নতুন করে ডিএনএর শৃঙ্খল তৈরি করে।
চতুর্থ ধাপ: সিকোয়েন্সিং বা ডিএনএর ক্রম নির্ণয়
পিসিআরের মাধ্যমে যে বিপুলসংখ্যক CO1 জিনের কপি তৈরি হয়েছে, এখন সেগুলোর ক্রম পড়তে হবে। অর্থাৎ কোথায় কয়টি A, কয়টি T, G ও C বসেছে, তা বের করতে হবে। এই কাজটি করা হয় একটি অত্যাধুনিক মেশিনের মাধ্যমে, যাকে বলে ক্যাপিলারি সিকোয়েন্সার (স্যাঙ্গার সিকোয়েন্সিং পদ্ধতি)। এই পদ্ধতিতে পিসিআর প্রোডাক্টের সঙ্গে কিছু বিশেষ রাসায়নিক মেশানো হয়, যা ডিএনএর শৃঙ্খল তৈরি হওয়ার সময় মাঝে মাঝে থামিয়ে দেয়। এতে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের অসংখ্য টুকরো তৈরি হয়, প্রতিটি টুকরোর শেষ প্রান্তে একটি আলোকদীপ্ত বা ফ্লুরোসেন্ট রঞ্জক থাকে।
এই টুকরোগুলোকে তখন একটি অতিসরু ক্যাপিলারি টিউবের ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে চালনা করা হয়। সবচেয়ে ছোট টুকরোগুলো সবচেয়ে দ্রুত এগোয়, আর বড়গুলো ধীরে। তারা যখন টিউবের শেষ প্রান্তে পৌঁছায়, তখন একটি লেজার রশ্মি তাদের ওপর পড়ে এবং প্রতিটি রঞ্জক ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিকিরণ করে। একটি কম্পিউটার সেই আলোর ধারা ক্যামেরাবন্দী করে এবং প্রতিটি অক্ষর (A, T, G, C) রিডিং আকারে দেখায়। ফলে আমরা নমুনার একটি ক্রোমাটোগ্রাম পাই। এটি দেখতে অনেকটা মানচিত্রের মতো, যেখানে প্রতিটি পিক বা উঁচু জায়গা একটি নির্দিষ্ট বেসকে নির্দেশ করে। শেষ পর্যন্ত এই কাঁচা ডেটা প্রক্রিয়াজাত করে আমরা একটি টেক্সট ফাইলে পাই, যেখানে প্রায় ৬৫০-৭০০ অক্ষরের একটি ক্রম লেখা থাকে। এটিই আমাদের ডিএনএ বারকোড।
পিসিআরের মাধ্যমে যে বিপুলসংখ্যক CO1 জিনের কপি তৈরি হয়েছে, এখন সেগুলোর ক্রম পড়তে হবে। অর্থাৎ কোথায় কয়টি A, কয়টি T, G ও C বসেছে, তা বের করতে হবে।
পঞ্চম ধাপ: ডেটাবেসের সঙ্গে ক্রম মেলানো
এখন আমরা একটি ক্রম হাতে পেয়েছি, কিন্তু এটি কার? এটি বের করার জন্য বিশ্বের বৃহত্তম ডেটাবেসের সন্ধান করতে হয়। সবচেয়ে পরিচিত ডেটাবেস হলো ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন বা সংক্ষেপে NCBI। তাদের ওয়েবসাইটে একটি টুল আছে, নাম BLAST (বেসিক লোকাল অ্যালাইনমেন্ট সার্চ টুল)। এই টুলটি আমাদের অজানা ক্রমটিকে NCBI-তে জমা থাকা লাখ লাখ প্রজাতির ডিএনএ ক্রমের সঙ্গে তুলনা করে। এটি হিসাব করে আমাদের ক্রমের সঙ্গে ডেটাবেসের কোন ক্রমটির কতটুকু মিল রয়েছে। ফলাফল আসে পারসেন্টেজ আকারে, যেমন ৯৯.৮৭% মিল, ৯৮.২% মিল ইত্যাদি।
সাধারণত ৯৮% এর বেশি মিল পাওয়া গেলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে আমাদের নমুনাটি ওই প্রজাতিটিরই। BLAST ফলাফলে আমরা মিলে যাওয়া প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম, তার জিনগত তথ্য এবং সেটি কোন শ্রেণিবিন্যাসগত গোত্রের সদস্য, তা দেখতে পাই।
BLAST আমাদের অজানা ক্রমটিকে NCBI-তে জমা থাকা লাখ লাখ প্রজাতির ডিএনএ ক্রমের সঙ্গে তুলনা করে। এটি হিসাব করে আমাদের ক্রমের সঙ্গে ডেটাবেসের কোন ক্রমটির কতটুকু মিল রয়েছে।
ষষ্ঠ ধাপ: ফাইলোজেনেটিক ট্রি
শুধু নাম জানলেই কি কাজ শেষ? মোটেও নয়। বিজ্ঞানীরা আরও গভীরে যান। তাঁরা একাধিক নমুনার ডিএনএ বারকোড নিয়ে একটি ফাইলোজেনেটিক ট্রি বা বংশবৃক্ষ তৈরি করেন। এই বংশবৃক্ষ দেখায় কোন প্রজাতিগুলো পরস্পরের কতটা কাছাকাছি, কারা একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে, আর কারা অনেক দূরে সরে গেছে। এর জন্য একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, যেমন MEGA (মলিউকুলার ইভ্যুলুশনারি জেনেটিকস অ্যানালাইসিস) অথবা BEAST, MrBayes ইত্যাদি।
কীভাবে এই বংশবৃক্ষ তৈরি হয়? প্রথমে আমরা আমাদের অজানা প্রজাতির ক্রমটির সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রজাতির ক্রম (যাদের আমরা শনাক্ত করতে চাই) এবং একটি আউটগ্রুপ (যে প্রজাতিটি আমাদের গ্রুপ থেকে অনেক দূরে, যেমন মাছের ক্ষেত্রে কোনো পাখি) নিয়ে একটি ফাইল তৈরি করি। এরপর সফটওয়্যারটি সবগুলো ক্রমকে একে অপরের সঙ্গে সারিবদ্ধ করে। অর্থাৎ সামঞ্জস্যপূর্ণ জায়গাগুলোকে এক কলামে আনে।
তারপর এটি হিসাব করে ক্রমগুলোর মধ্যে কতগুলো মিউটেশন বা পরিবর্তন আছে। যাদের মধ্যে কম পরিবর্তন, তারা কাছাকাছি; যাদের বেশি, তারা দূরে। এরপর সফটওয়্যারটি বিভিন্ন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে একটি ট্রি আঁকে, যার ডালপালা (ব্রাঞ্চ) দেখায় বিবর্তনীয় সম্পর্ক। দীর্ঘ ডাল মানে বেশি পরিবর্তন, ছোট ডাল মানে কম পরিবর্তন। এই ট্রিতে যদি আমাদের অজানা নমুনাটি পরিচিত একটি প্রজাতির সঙ্গে একই শাখায় বসে, তাহলে বুঝতে হবে তারা খুব কাছাকাছি। আর যদি এটি সম্পূর্ণ আলাদা শাখায় চলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে এটি হয়তো নতুন প্রজাতি, অথবা ভিন্ন কোনো গোত্রের সদস্য।
সামঞ্জস্যপূর্ণ জায়গাগুলোকে এক কলামে আনে। তারপর এটি হিসাব করে ক্রমগুলোর মধ্যে কতগুলো মিউটেশন বা পরিবর্তন আছে। যাদের মধ্যে কম পরিবর্তন, তারা কাছাকাছি; যাদের বেশি, তারা দূরে।
শেষ ধাপ: ফলাফলের প্রতিবেদন ও সংরক্ষণ
শেষ ধাপে এই পুরো বিশ্লেষণের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তাতে থাকে নমুনার বিবরণ, সংগ্রহস্থল, ডিএনএ ক্রম, ব্লাস্টের ফলাফল, ফাইলোজেনেটিক ট্রি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (যেমন নমুনাটি অমুক প্রজাতি)। এই প্রতিবেদনটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ করা হয়। অথবা যদি এটি সত্যিই নতুন কোনো প্রজাতি হয়, তাহলে এর বারকোড ক্রমটিকে BOLD (বারকোড অব লাইফ ডাটা সিস্টেম) এবং NCBI-এর GenBank-এ জমা দিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এই ক্রমটি পেলে মিলিয়ে দেখতে পারে। আর তখন থেকেই এই প্রজাতিটির একটি স্থায়ী ডিএনএ পরিচয়পত্র তৈরি হয়ে যায়।
ডিএনএর সেই ক্ষুদ্র অক্ষরগুলোর সাজানো ক্রম আমরা যখন পড়তে শিখেছি, তখন পৃথিবীর প্রতিটি জীব যেন আমাদের বলতে শুরু করেছে, ‘আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কার সঙ্গে আমার আত্মীয়তা!’
এত কঠিন পদ্ধতি আসলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কাজে লাগে। ধরুন, কেউ একটি সামুদ্রিক মাছ কিনতে গিয়ে ভয় পাচ্ছে যে এটি আসলে ভোজ্য কি না, নাকি বিষাক্ত প্রজাতির। তার সামান্য টিস্যু থেকে ডিএনএ বারকোডিং করে সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে আসবে সঠিক নাম। আবার অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে স্যামন মাছ বলে যে মাছ বিক্রি হচ্ছে, সেটি ডিএনএ পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে অন্য কোনো সস্তা মাছ। এই পদ্ধতি খাদ্যপ্রতারণা চিহ্নিত করতেও ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন কিংবা বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র থেকে গবেষকেরা যদি কোনো অচেনা কীট বা মাছ পান, যা আগে কখনো দেখা যায়নি, তার ডিএনএ বারকোড NCBI-তে দিয়ে দেখেন; যদি কোনো মিল না পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে এটি পৃথিবীর কাছে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। এভাবে প্রতিবছর সারা বিশ্বে শত শত নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হচ্ছে শুধু ডিএনএ বারকোডিংয়ের সুবাদে।
সুতরাং ডিএনএ বারকোডিং কেবল একটি ল্যাবরেটরি পদ্ধতি নয়, এটি প্রকৃতির বিশাল এক লাইব্রেরি পড়ার চাবিকাঠি। ডিএনএর সেই ক্ষুদ্র অক্ষরগুলোর সাজানো ক্রম আমরা যখন পড়তে শিখেছি, তখন পৃথিবীর প্রতিটি জীব যেন আমাদের বলতে শুরু করেছে, ‘আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কার সঙ্গে আমার আত্মীয়তা!’ সত্যিই কি বিস্ময়কর নয় যে, চোখের অগোচরে যা লুকিয়ে আছে, সেই অণুর স্তরেই লিপিবদ্ধ আছে সমগ্র জীবজগতের আত্মপরিচয়? আর এই পরিচয়পত্র তৈরি করাটাই হলো ডিএনএ বারকোডিংয়ের মূল জাদু।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>