জাতীয়

সারাহ খলিফাকে নিয়ে কেন এত হৈচৈ?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
ছোট পর্দার ঝলমলে আলোর আড়ালে গড়ে ওঠা মিথ্যার এক কাল্পনিক প্রাসাদ নাকি বৈশ্বিক অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর ছায়ামানবী? মিশরের বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক মাদক পাচার ও তৈরি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সারাহ খলিফাকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে ‘বিখ্যাত টিভি উপস্থাপক’ তকমা ছড়িয়ে পড়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় রহস্য। মিশরের সবচেয়ে বড় ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বার্তা সংস্থা \'আল-আহরাম’- এর প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাকে একাধারে ‘জনপ্রিয় ক্রাইম শো সঞ্চালক’ ও মিশরের জনপ্রিয় তারকা হিসেবে চিত্রায়িত করলেও মিশরীয় আদালতের নথি ও বাস্তব অনুসন্ধানী তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। গণমাধ্যমের বানিয়ে তোলা কৃত্রিম খ্যাতি, নাকি আদালতের দীর্ঘ আইনি লড়াই- কোনটি সারাহ খলিফার আসল পরিচয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। আরও পড়ুন কে এই সারাহ খলিফা? ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল সারাহ খলিফার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কায়রো ফৌজদারি আদালতের চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত মোট ৫০৬ দিন সময় লেগেছে। ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই ২৮ জন আসামিকে বিচারে পাঠানো হয় ও ৬ সেপ্টেম্বর মূল বিচার শুরু হয়। এরপর নভেম্বর মাসে ফরেনসিক প্রমাণ পরীক্ষা, ২০২৬ সালের জুনে বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিগত কমিটির মতামত গ্রহণ ও জুলাই মাসে অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণাদি যাচাই করা হয়। ৪ আগস্ট কেসটি গ্র্যান্ড মুফতির কার্যালয়ে পাঠানো হয় ও অবশেষে বিচার শুরুর ৩৬৪ দিন পর ৫ সেপ্টেম্বর আদালত সারাহ খলিফাসহ ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায় অনুযায়ী, প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে পাঁচ লাখ মিশরীয় পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে ও তাদের মাদক, যানবাহন, প্রস্তুতকরণ সরঞ্জাম, অলঙ্কার, মোবাইল ফোন ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মামলায় ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ও ৭ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তবে মিশরের গ্র্যান্ড মুফতির অ-বাধ্যতামূলক ধর্মীয় মতামত নেওয়ার পর প্রদত্ত এই রায়টির বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সারাহ খলিফার আদালতের রেকর্ড ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বানানো পাবলিক ইমেজের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল ফারাক। তিনি মূলত টিভি সাংবাদিকতার চেয়ে সৌন্দর্য ব্যবসা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও বিনোদন জগতের সঙ্গেই বেশি যুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালে বিখ্যাত ফুটবলার মাহমুদ আবদেল-মোনেম ‘কাহরাবা’-এর সঙ্গে তার স্বল্পস্থায়ী বিয়ে এবং বিভিন্ন অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পিদের সঙ্গে ছবি পোস্ট করার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিপুল অনুসারী তৈরি হয়। তার টেলিভিশন ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও অনিয়মিত। পূর্বে তিনি এআরটি (এআরটি)-এর ‘ফ্রম কায়রো’, ইরাকের ‘আল-শারকিয়া’ চ্যানেল ও ২০১৫ সালে বেসরকারি চ্যানেল আল-মেহওয়ারের ‘মুহিম্মা সাবা’ নামের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘টেন’ চ্যানেলে ‘ট্রেন্ড’ নামের শো পরিচালনা করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো আরবি ‘মুহিম্মা সাবা’ (যার অর্থ কঠিন মিশন) শব্দটিকে অনুবাদ করে ‘মিশন ইম্পসিবল’ হিসেবে প্রচার করে, যা বিশ্বখ্যাত হলিউড ফ্র্যাঞ্চাইজির নাম মনে করিয়ে দেয়। অথচ ২০২৪ সালে সারাহ খলিফাকে কেবল ‘হামো বিকা’ নামের এক উৎসব-সংগীত (মাহরাগানাথ) গায়কের সঙ্গে একটি অনলাইন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানেই দেখা গিয়েছিল। গ্রেফতারের পর মিশরীয় মিডিয়া সিন্ডিকেটের প্রধান তারেক সাদা স্পষ্টভাবে জানান যে, সারাহ খলিফা তাদের নিবন্ধিত কোনো পেশাদার সাংবাদিক নন ও সংবাদমাধ্যমে কাজ করার মতো কোনো আইনি লাইসেন্সও তার ছিল না। তিনি তাকে একজন ছদ্মবেশী গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে লাইসেন্সহীন হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি বিভিন্ন চ্যানেলে সময় পেলেন- তার নেপথ্যে উঠে এসেছে মিশরের সম্প্রচার জগতের ‘বেই আল-হাওয়া’ বা নামক বিতর্কিত প্রথা। সেখানে চ্যানেলগুলো অর্থের বিনিময়ে বাইরের প্রযোজকদের কাছে সময় স্লট বিক্রি করে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিশরের নাম না জানা চ্যানেলে ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত খরচে এক ঘণ্টার স্লট কেনা সম্ভব। এরই মধ্যে ২০২৬ সালের আগস্টে শীর্ষ মিডিয়া রেগুলেটরি কাউন্সিল এমন ২১টি যৌথ-প্রযোজনা অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে পর্যালোচনা শুরু করেছে। ফলে অর্থের জোরেই তৈরি হয়েছিল তার টিভি উপস্থাপকের কৃত্রিম পরিচিতি। এমনকি, তার বয়স নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে; মিশরীয় নথিতে তার জন্ম ২৯ মার্চ ১৯৯৪ উল্লেখ থাকায় রায়ের সময় তার বয়স ৩২ বছর হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাকে ৩৯ বছর বয়সী বলা হচ্ছে। কায়রো ফৌজদারি আদালতে প্রসিকিউটররা সারাহ খলিফাকে অভিযুক্ত মাদক চক্রের ৪ নম্বর আসামি, মূল ব্যবস্থাপক, প্রধান অর্থায়নকারী এবং মিশরের ভেতরের ও বাইরের সদস্যদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেন। উদ্ধারকৃত ৭৫০ কেজিরও বেশি রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে প্রস্তুতকৃত মাদকের পাশাপাশি কাঁচামালও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আদালত গঠিত তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি নমুনা বিশ্লেষণ করে জানায়, এগুলো নিষিদ্ধ কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড তৈরির রাসায়নিক উপাদান। তবে সারাহ খলিফা ও তার আইনজীবী মোহাম্মদ আল-গেন্দি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, অফিশিয়াল গ্রেফতারের তারিখ, ফোন পরীক্ষা ও পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানান। আদালতের দীর্ঘ শুনানি ও জেরার পর ঘোষিত এই রায় সর্বোচ্চ আদালত বা কোর্ট অব ক্যাসেশনে রিভিউ করার পূর্ণ অধিকার আসামিপক্ষের রয়েছে। এই মাদক মামলার বাইরেও সারাহ খলিফার বিরুদ্ধে আলাদা একটি অপরাধের রায় কার্যকর রয়েছে। শালীনতা ভঙ্গ, শারীরিক নির্যাতন ও এক যুবককে নগ্ন করে ভিডিও ধারণ করার অপরাধে মিশরের আদালত তাকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন (কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ভুলবশত ৫ বছর উল্লেখ করেছিল)। সব মিলিয়ে, সারাহ খলিফা কেবল আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বানানো কোনো ‘বিখ্যাত অপরাধ বিষয়ক তারকা সঞ্চালক’ নন, আবার তিনি কোনো সাধারণ অভিযুক্তও নন। তিনি একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হওয়া এক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, যার আইনি ভবিষ্যতের চূড়ান্ত ফয়সালা এখনো সুপ্রিম কোর্টের আপিলের ওপর নির্ভর করছে। সূত্র: আহরাম অনলাইন এসএএইচ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>