ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম দেখাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গতকাল সোমবার রাজধানীর চারটি হাসপাতালে ৬১ শতাংশ রোগী কম দেখানো হয়েছে।
প্রথম আলোর দুজন প্রতিনিধি গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ করেন। এতে দেখা যায়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা কম দেখানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
ঢাকা মহানগরের ৭৭টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের এবং ৬৪ জেলার সব সরকারি ও কিছু বেসরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। এই পরিসংখ্যান দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ আকারে প্রকাশ করে। একই পরিসংখ্যান বিভিন্ন দাতা সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারের নীতিনির্ধারকেরা ব্যবহার করে।
গতকাল সন্ধ্যায় হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমত আরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে যে পরিসংখ্যান পাঠানো হয়, আমরা সেটিই প্রকাশ করি। ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই।’
বাস্তবের সঙ্গে মিল নেই
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮, ১১ ও ১২ তলায় ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয়। গতকাল বেলা দেড়টায় ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নিচতলার চারটি লিফটের সামনে মানুষের ভিড়। প্রথম আলোর প্রতিবেদক সিঁড়ি ভেঙে প্রথমে যান শিশু ওয়ার্ডে।
৮ তলায় শিশু ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু ও হামের পাশাপাশি শিশুদের আরও কিছু রোগের চিকিৎসা হচ্ছে। ওয়ার্ডে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু ছিল ৪৭ জন।
১১ তলায় পুরুষ ও ১২ তলায় নারীদের জন্য ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। পুরুষ রোগী দেখা যায় ৮৯ জন; আর নারী রোগী ছিলেন ৮৫ জন। প্রথম আলোর গণনায় রোগী ছিলেন ২২১ জন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য বলছে, গতকাল রোগী ভর্তি ছিলেন ২২৩ জন। কেবিনের রোগীর হিসাব প্রথম আলোর গণনা থেকে বাদ পড়ে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৪ হাজার ১৯৯ রোগী ভর্তি হয়েছেন।
হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গতকাল মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৯ জন। হাসপাতালের দেওয়া হিসাবের চেয়ে যা ১৭৪ জন কম। কন্ট্রোল রুম বলছে, ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত এই হাসপাতালে ১ হাজার ৭৭৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪২৬ রোগী কম দেখানো হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের (ডিএমসি–২) ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয়। ৭০২ নম্বর ওয়ার্ড নারীদের। বেলা তিনটার দিকে ওই তিনটি ওয়ার্ড ঘুরে ১২৮ রোগী গণনা করা হয়। এটি ওয়ার্ড থেকে দেওয়ার সংখ্যার সঙ্গে মিলে যায়। তবে কর্তব্যরত নার্সরা প্রথম আলোকে বলেন, এই তিন ওয়ার্ড ছাড়াও কয়েকটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীরা প্রাথমিকভাবে ভর্তি হন। এ ছাড়া আছে শিশু ওয়ার্ড।
তবে হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তর থেকে দেওয়া তথ্য বলছে, গতকাল মোট ভর্তি রোগী ছিলেন ২০০ জন, এর মধ্যে শিশু ৩১ জন।
হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য বলছে, গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ১০৫ জন। পরিচালকের দপ্তরের দেওয়া হিসাবের চেয়ে ৯৫ রোগীর গরমিল।
১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলের পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুয়ায়ী, ঢাকা মেডিকেলে রোগী ভর্তি ছিলেন ২ হাজার ৩৯৯ জন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে ২ হাজার ১২৭ জন, গরমিল ২৭২ জনের।
একই ধরনের গরমিল দেখা গেছে আরও দুটি হাসপাতালে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, গতকাল এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিলেন ২৪২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম বলছে, রোগী ভর্তি ছিলেন ১৫৪ জন। এখানে ৮৮ জন রোগী কম দেখানো হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এ বছর মোট ৩ হাজার ৬৩৮ রোগী ভর্তি হয়েছেন; আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম বলছে, ২ হাজার ৮৯৬ জন। ৭৪২ জনের গরমিল।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, গতকাল এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিলেন ১৫২ জন; আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম বলছে, রোগী ভর্তি ছিলেন মাত্র ৮ জন। ১৪৪ জনের হিসাব কম দেখিয়েছে কন্ট্রোল রুম। পরিচালকের দপ্তরের হিসাবে এই হাসপাতালে জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ৪৩২ জন শিশু ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম বলছে, ২৪২ জন। ১৯০ জন কম দেখানো হয়েছে।
এই চার হাসপাতালে গতকাল রোগী ভর্তি ছিলেন ৮১৭ জন; আর কন্ট্রোল রুম বলছে, ৩১৬ জন ভর্তি ছিলেন। ৫০১ জন বা ৬১ শতাংশ রোগী কম দেখিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তথ্য পায় না। একইভাবে রাজধানীর বাইরের সব বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থাও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই। এ ছাড়া অনেকে রোগী চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার থেকে চিকিৎসা নেন। এসব কারণে বিপুলসংখ্যক ডেঙ্গু রোগীর হিসাব নেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা কন্ট্রোল রুমের পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু যেসব হাসপাতাল থেকে তথ্য নেওয়া সম্ভব, সেসব হাসপাতাল থেকে নিয়মিত তথ্য নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে সেগুলো তারা ঠিকমতো হালনাগাদ করছে না। তথ্যে গরমিল থাকছে। এর ফলে ডেঙ্গুর বাস্তব চিত্র গণমাধ্যমে আসছে না। নীতিনির্ধারকেরাও ডেঙ্গুর সঠিক পরিস্থিতি জানতে পারছেন না। ভবিষ্যতেও এ তথ্য কেউ আস্থার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারবেন না।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর তথ্যে গরমিল হওয়া ও কম দেখানোর প্রবণতা খুবই দুঃখজনক, একই সঙ্গে বিপজ্জনক। কম দেখালে প্রকৃত চিত্র জানা যাবে না, সমস্যা ঠিকভাবে মোকাবিলা করা যাবে না। তাতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এখনই এটা বন্ধ হওয়া দরকার।
গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে ১ হাজার ৬৫৫ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৬৩ হাজার ৬২৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন; আর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৯০ জন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>