বিজ্ঞাপন
ইয়েমেনের হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। একই সময়, ড্রোন হামলার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন।
ফলে এখন শুধু সৌদি আরব নয়, বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও সবার নজর রিয়াদের দিকে। প্রশ্ন উঠছে, সৌদি আরব কীভাবে হুথিদের ঠেকাবে? তেল রপ্তানি কি চালু রাখতে পারবে? আর পরিস্থিতি খারাপ হলে শেষ পর্যন্ত কি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় হবে?
হুথিদের বড় অগ্রগতি
গত কয়েকদিনের অভিযানে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে। এরপর কৌশলগত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবর এসেছে।
আরও পড়ুন
বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নিলো হুথিরা, লোহিত সাগরে নতুন সমীকরণ
পেরিম দ্বীপটির অবস্থান বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝামাঝি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
ফলে হুথিদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও।
সৌদির জন্য নতুন বিপদ
হরমুজ প্রণালিতে সংকট তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরমুখী পথের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়েছে। এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন।
আরও পড়ুন
ড্রোন হামলায় বন্ধ সৌদির পাইপলাইন, তেল বাণিজ্যে শঙ্কার ছায়া
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পৌঁছে দেয়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানি করার জন্য পাইপলাইনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখন সেই বিকল্প পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। হামলায় পাইপলাইনের পাশের পাম্প স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
হামলার উৎস হিসেবে ইরাক থেকে আসা ড্রোনের কথা জানিয়েছে সৌদি আরব। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ এর দায় স্বীকার করেনি।
তেল রপ্তানি কতটা ঝুঁকিতে
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। অর্থাৎ পাইপলাইনে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে বিশ্বের তেল সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন
হুথির হাতে পেরিম দ্বীপ, বন্ধ হবে লোহিত সাগরও?
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি। একদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাধা, অন্যদিকে লোহিত সাগরের প্রবেশপথে নতুন ঝুঁকি তৈরি হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথগুলো আরও সংকুচিত হবে।
আর তার প্রভাব শুধু রিয়াদেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ছড়িয়ে, পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে। এতে তেলের দাম বাড়তে পারে। বাড়তে পারে জাহাজের বিমা ব্যয়। জাহাজ চালাতে হবে দীর্ঘ বিকল্প পথে। তাতে বেড়ে যাবে পরিবহন ব্যয়ও।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
সৌদি তেল না পেলে বিশ্ব অর্থনীতির কী হবে
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। তাই দেশটির সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন বিশ্ববাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদনে। বাড়বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়। খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
তাই সৌদি তেল রপ্তানি দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরব কী করছে
রিয়াদ এখনো সরাসরি বড় ধরনের পাল্টা যুদ্ধের পথে যায়নি।
পাইপলাইন হামলার পর সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রীকে নিজ দেশের ভূখণ্ড থেকে হামলা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে তারা আপাতত পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
আরও পড়ুন
তেল পাইপলাইনে হামলা, কী করবে সৌদি
ইরাকও হামলার নিন্দা করেছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে হুথিদের অগ্রগতি ঠেকাতে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব হামলা হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি।
এর মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিমান হামলার সহায়তা চেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক হামলায় সম্মতি দেননি। যুক্তরাষ্ট্র বরং গোয়েন্দা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার দিকে এগোতে চায়।
মক্কা চুক্তি কি সক্রিয় হবে?
এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া সাম্প্রতিক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত ৭ আগস্ট মক্কায় তিন দেশ এই চুক্তি সই করে।
আরও পড়ুন
হাঁটা শেখার আগেই দৌড়ের পরীক্ষায় মক্কা চুক্তি!
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কিন্তু চুক্তিটি এখনই সামরিকভাবে সক্রিয় হচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত ইঙ্গিত নেই।
গত ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান জানিয়েছে, হুথিদের হামলার পর চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তবে চুক্তির কাঠামো এরই মধ্যে গড়ে উঠছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক আগস্টের শেষদিকে ইস্তাম্বুলে চুক্তির কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠক করেছে। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে একটি সচিবালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
আরও পড়ুন
ঝুঁকিতে তেল বাণিজ্য / যুক্তরাষ্ট্র কি সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াবে?
অর্থাৎ মক্কা চুক্তি এখনো কাগুজে ঘোষণা হয়ে নেই। কিন্তু হুথিদের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়লে এই জোটের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব, ইয়েমেনের উপকূল এবং সৌদি তেল অবকাঠামো— সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
একদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত। অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হুথিদের ইয়েমেনে অগ্রগতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ঝুঁকি।
আরও পড়ুন
লোহিত সাগরে হুথির আধিপত্যে ইরানের লাভ কোথায়?
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন শুধু সামরিক শক্তির হিসাব নয়। জ্বালানি, সমুদ্রপথ, আঞ্চলিক জোট এবং কূটনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেবের কাছে দীর্ঘমেয়াদি চাপ ধরে রাখতে পারে, তাহলে সৌদি আরবকে নতুন নিরাপত্তা কৌশল নিতে হবে। আর সৌদি তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপরও আরও সক্রিয় হওয়ার চাপ বাড়বে।
তাই এখন সত্যিই সবার নজর সৌদি আরবে। রিয়াদ কি একাই পরিস্থিতি সামলাবে, নাকি মক্কা চুক্তির অংশীদারদের সামনে আনবে? আর যুক্তরাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত সৌদির পাশে দাঁড়াবে? এই দুই প্রশ্নের উত্তরই মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী অধ্যায়ের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, এপি, দ্য গার্ডিয়ানকেএএ/
বিজ্ঞাপন