জাতীয়

নারীর নিরাপত্তা নয়, বদলাতে হবে নিরাপত্তাহীন সমাজকে

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
রাত একটু গভীর হলেই শহরের রাস্তাগুলো বদলে যায়। দিনের ব্যস্ততা কমে আসে, দোকানের শাটার নামতে থাকে, যানবাহনের সংখ্যাও যেন কমে যায়। সেই রাস্তায় তখন একজন নারী হাঁটলে তার সঙ্গে আরেকজন অদৃশ্য সঙ্গীও হাঁটে—ভয়। পেছনে কেউ আসছে কি না, রিকশাচালক ঠিক মানুষটি কি না, রাস্তার মোড়টিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো তাকে লক্ষ্য করছে কি না—এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই বাড়ি ফেরেন অনেক নারী। অথচ এই ভয়টি তার থাকার কথা ছিল না। একটি স্বাধীন দেশে একজন মানুষ শুধু নারী হওয়ার কারণে নিজের চলার পথ নিয়ে এত হিসাব করবেন—এটাই তো অস্বাভাবিক। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের আলোচনা কম নয়। কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়, প্রতিবাদ হয়, মানববন্ধন হয়, কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে। কয়েক দিন আমরা খুব উত্তেজিত থাকি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনোটিকে সরিয়ে দেয়। সংবাদপত্রের পাতায় যোগ হয় আরেকটি নাম, আরেকটি কান্না, আরেকটি মামলা। আমরা আবার প্রশ্ন করি—‘এভাবে আর কত?’ কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কখনো কখনো ভুলে যাই, নারী নিরাপত্তাহীনতা কোনো একদিনের খবর নয়; এটি বহু নারীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। একটি রায়, তারপরও থেকে যায় ভয় নুসরাত জাহান রাফির কথা মনে পড়তেই পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল একটি মেয়ে। তার অভিযোগের পর যে ভয়াবহ পরিণতি নেমে এসেছিল, তা দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর তার হত্যার বিচার হয়েছে, আদালত অপরাধীদের শাস্তিও দিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রায়ের পর নুসরাতের মা যখন আবার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা বলেন, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে—বিচার পাওয়ার পরও যদি ভয় থেকে যায়, তাহলে নিরাপত্তার জায়গাটি কোথায়? হয়তো একদিন সংবাদপত্রের পাতায় নারী নির্যাতনের খবর পুরোপুরি বন্ধ হবে না। মানুষের সমাজে অপরাধ একদিনে নিশ্চিহ্ন হয় না। কিন্তু আমরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছাতে পারি, যেখানে একজন নারী অন্যায়ের শিকার হলে তিনি একা থাকবেন না। পরিবার তার পাশে দাঁড়াবে, সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে এবং আইন তাকে নিরাপত্তা দেবে। নুসরাতের ঘটনা তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সামাজিক মানসিকতার দিকেও তাকাতে বাধ্য করে। একজন নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাইলেন। রাষ্ট্র তার অভিযোগ গ্রহণ করল, বিচার হলো। কিন্তু সেই বিচারপ্রক্রিয়ার পরও যদি তার পরিবারকে হুমকির মুখে থাকতে হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে—বিচারের পর ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জায়গাটি আমরা কতটা শক্ত করতে পেরেছি? তবে নুসরাতের গল্পে থেমে থাকলে চলবে না। কারণ প্রতিদিন অসংখ্য নারী এমন অনেক অন্যায়ের শিকার হন, যাদের নাম কখনো সংবাদপত্রের পাতায় আসে না। কেউ বাসে অশালীন স্পর্শ এড়িয়ে বাড়ি ফেরেন, কেউ কর্মস্থলে সহকর্মীর কুৎসিত মন্তব্য শুনেও চুপ থাকেন, কেউ আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানির শিকার হয়েও অভিযোগ করতে ভয় পান। এছাড়াও রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়ার মতো ভয়। সমাজের অন্ধকার আরও একটি দিক, কেউ স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়ে সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরব থাকেন। কেউ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিশোধের আতঙ্কে দিন কাটান। এই অদৃশ্য ঘটনাগুলোর হিসাব হয়তো কোনো সংবাদ শিরোনামে আসে না। কিন্তু নারীর নিরাপত্তাহীনতার বড় অংশ তৈরি হয় এসব ছোট ছোট, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই। নিরাপদ থাকার দায়িত্ব কি শুধু নারীর? একজন মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ থাকার অসংখ্য নিয়ম শেখানো হয়। রাতে একা বের হবে না, অচেনা মানুষের গাড়িতে উঠবে না, অন্ধকার রাস্তা এড়িয়ে চলবে, ফোনে লোকেশন শেয়ার করবে, অপরিচিত কারও সঙ্গে বেশি কথা বলবে না, নিজের পোশাকের ব্যাপারে সাবধান হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ার আগে ভাববে—তালিকাটি যেন শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু এই তালিকার উল্টো দিকটিও কি আমরা কখনো লিখেছি? একজন ছেলেকে কি সমান গুরুত্ব দিয়ে শেখানো হয়েছে—কাউকে অনিচ্ছায় স্পর্শ করা অপরাধ? ‘না’ মানে না? সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে প্রতিশোধ নেওয়া যায় না? কোনো নারীকে অনুসরণ করা, ভয় দেখানো কিংবা অপমান করা পৌরুষের পরিচয় নয়? ক্ষমতা বা পরিচয়ের জোরে কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়া শক্তি নয়? নারী নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই। আমরা মেয়েদের সতর্ক করতে ব্যস্ত, কিন্তু ছেলেদের দায়িত্বশীল করার কথাটি অনেক সময় ভুলে যাই। যেন নারীকে নিরাপদ রাখতে হলে তার চলাফেরার স্বাধীনতাই কমিয়ে দিতে হবে। অথচ নিরাপত্তার প্রকৃত অর্থ হওয়া উচিত—একজন নারী স্বাধীনভাবে চলবেন, আর সমাজ ও রাষ্ট্র তার সেই স্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ‘চুপ করো’—সবচেয়ে পুরোনো ফাঁদ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো নীরবতা। অনেক পরিবার এখনো মনে করে, ঘরের কথা বাইরে গেলে পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে। তাই নির্যাতনের শিকার মেয়েকে বলা হয়, ‘সহ্য করো।’ স্বামী মারধর করলে বলা হয়, ‘সংসারে একটু-আধটু হয়।’ শ্বশুরবাড়িতে অপমান হলে বলা হয়, ‘মানিয়ে নাও।’ কর্মক্ষেত্রে হয়রানির কথা বললে বলা হয়, ‘চাকরিটা তো রাখতে হবে।’ প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে হুমকি এলে বলা হয়, ‘বিষয়টা আর বাড়িও না।’ এই ‘চুপ করে থাকো’ সংস্কৃতিই অনেক সময় অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। কারণ অপরাধী যখন বুঝতে পারে, ভুক্তভোগী কথা বলবেন না, পরিবার বিষয়টি চাপা দেবে এবং সমাজ উল্টো তাকেই প্রশ্ন করবে, তখন অপরাধের সাহস আরও বেড়ে যায়। একটি সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য যদি একজন নারীকে প্রতিদিন নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়, সেটিকে কি সত্যিই সংসার বলা যায়? একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য যদি একজন কর্মীর অভিযোগ চাপা দেওয়া হয়, সেই সুনাম কি সত্যিই সম্মানের? একটি পরিবারের ‘মান সম্মান’ রক্ষার নামে যদি একটি মেয়ের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সেই সম্মান আসলে কার? অপরাধীর বদলে কাঠগড়ায় নারী কেন? কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে আমাদের সমাজে প্রথম প্রশ্নটি অনেক সময় অপরাধীর দিকে যায় না; যায় নারীর দিকে। সে কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? কী পরেছিল? কেন রাতে বের হয়েছিল? তার আগে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী ছবি দিয়েছে? একজন নারীকে যেন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আগেই নিজের চরিত্রের সার্টিফিকেট সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। এই মানসিকতা শুধু অন্যায় নয়, বিপজ্জনকও। কারণ এতে অপরাধীর দায় ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায় এবং ভুক্তভোগী নিজেই সমাজের বিচারের মুখোমুখি হন। অথচ একজন নারী যতই স্বাধীনচেতা হোন, যত রাতেই বাড়ি ফিরুন, যত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন কিংবা যেকোনো পোশাক পরুন—কেউ তাকে নির্যাতন করার অধিকার পায় না। তার স্বাধীনতা কোনো অপরাধীর জন্য অনুমতিপত্র নয়। একজন মানুষকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব তার চরিত্র যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নিরাপত্তা মানুষের অধিকার; ভালো মেয়ে বা ভালো ছেলে হওয়ার পুরস্কার নয়। ক্ষত শুধু শরীরে থাকে না নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষত অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। শরীরের আঘাত হয়তো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে সেরে যায়, কিন্তু ভয় অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকে। রাস্তায় হয়রানির শিকার হওয়া মেয়েটি পরদিন একই রাস্তা দিয়ে হাঁটলেও আগের মতো হাঁটে না। কর্মক্ষেত্রে অপমানিত নারী পরবর্তী প্রতিটি কর্মস্থলকেই সন্দেহের চোখে দেখতে পারেন। সম্পর্কের মধ্যে হুমকি পাওয়া একজন নারী ভবিষ্যতের সম্পর্কেও হয়তো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। এই ভয় কোনো এক্স-রেতে ধরা পড়ে না। হাসপাতালের রিপোর্টেও লেখা থাকে না। কিন্তু এটি একজন নারীর আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে। তাই নারী নিরাপত্তা শুধু শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি মানসিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন। এমন একটি পরিবেশের প্রশ্ন, যেখানে একজন নারী ভুল করলে যেমন কথা বলতে পারবেন, তেমনি অন্যায়ের শিকার হলেও নির্ভয়ে বলতে পারবেন। আইনের দরজায় পৌঁছেও যদি ভয় থাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যখন নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশের কাছে যান, তখন শুধু অভিযোগ নেওয়াই যথেষ্ট নয়। অভিযোগের পর তিনি কতটা নিরাপদ থাকবেন, তার পরিবার নিরাপদ থাকবে কি না, সাক্ষীরা ভয়ভীতির মধ্যে পড়বেন কি না—এসবও রাষ্ট্রকে দেখতে হবে। কারণ একজন নারী যদি মনে করেন, অভিযোগ করার পর তার বিপদ আরও বাড়বে, তাহলে আইন তার কাছে আশ্রয়ের জায়গা না হয়ে ভয়ের জায়গায় পরিণত হতে পারে। বিচার তখন শুধু আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ থাকে; ভুক্তভোগীর জীবনে তার নিরাপত্তার প্রতিফলন দেখা যায় না। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কত কঠোর শাস্তি দিতে পারে, তার মধ্যে নয়। রাষ্ট্র কত দ্রুত একজন বিপন্ন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে, তার মধ্যেও রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায়। সমাজ কি শুধু দর্শক হয়ে থাকবে? তবে নারী নিরাপত্তার সব দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। সমাজকেও নিজের আয়নায় তাকাতে হবে। পাশের বাড়ির মেয়েটি প্রতিদিন স্বামীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন—আমরা কি শুধু দরজা বন্ধ করে থাকব? কোনো শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে হয়রানি করা হচ্ছে—আমরা কি মোবাইল বের করে ভিডিও করব, নাকি প্রতিবাদ করব? কর্মস্থলে কোনো নারীকে অপমান করা হচ্ছে—আমরা কি হেসে পাশ কাটিয়ে যাব, নাকি বলব, ‘এটা ঠিক হচ্ছে না’? আমরা অনেক সময় অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও নীরব দর্শক হয়ে থাকি। কারণ ঝামেলায় জড়াতে চাই না। কিন্তু একজনের এই নীরবতা অন্য একজন অপরাধীর সাহস হয়ে উঠতে পারে। সব অন্যায় থামানোর ক্ষমতা আমাদের প্রত্যেকের নেই। কিন্তু অন্যায়কে স্বাভাবিক না ভাবার ক্ষমতা আছে। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আছে। ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আছে। প্রয়োজনে সাহায্যের জন্য ফোন করার ক্ষমতা আছে। কখনো কখনো একটি ছোট্ট বাক্য—‘আপনি একা নন’—একজন মানুষের ভেঙে পড়া সাহসটুকু ফিরিয়ে দিতে পারে। ছেলেদেরও শেখাতে হবে অন্য এক ভাষা নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পুরুষকে শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং পুরুষদেরই এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অংশ হতে হবে। একজন বাবা যদি ছেলেকে শেখান, শক্তি মানে কাউকে ভয় দেখানো নয়; একজন শিক্ষক যদি শেখান, সম্মতি ছাড়া কোনো স্পর্শ গ্রহণযোগ্য নয়; একজন বন্ধু যদি বন্ধুর ভুল আচরণের প্রতিবাদ করেন—তাহলে পরিবর্তন শুরু হয়। আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সম্মতি, সীমারেখা, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে। মেয়েকে যেমন বলতে হবে, ‘অন্যায় হলে চুপ থাকবে না’, ছেলেকেও বলতে হবে, ‘কাউকে ভয় দেখিয়ে তুমি বড় হও না।’ একজন নারী মা হতে পারেন, বোন হতে পারেন, স্ত্রী হতে পারেন, বন্ধু হতে পারেন। কিন্তু সবার আগে তিনি একজন মানুষ। তার নিজের ইচ্ছা আছে, অনিচ্ছা আছে, স্বপ্ন আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। এই সহজ কথাটি যদি আমরা সত্যিকার অর্থে আমাদের সন্তানদের শেখাতে পারি, তাহলে হয়তো নারী নিরাপত্তার জন্য আলাদা করে এত কথা বলতে হবে না। নিরাপত্তা মানে দেয়াল নয়, স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নারীকে নিরাপদ রাখার নামে তাকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখা কোনো সমাধান নয়। রাতের শহর যদি নারীর জন্য অনিরাপদ হয়, তাহলে রাতের শহরকেই নিরাপদ করতে হবে। গণপরিবহন যদি অনিরাপদ হয়, তাহলে পরিবহন ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি হলে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বদলাতে হবে। অনলাইনে হুমকি হলে ডিজিটাল নিরাপত্তার ব্যবস্থা শক্ত করতে হবে। নারীকে বলা যাবে না—‘তুমি বের হয়ো না, তাহলেই নিরাপদ থাকবে।’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘তুমি বের হলে কেন নিরাপদ থাকবে না?’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আসলে নারী নিরাপত্তার মূল কথা। একটি মেয়ে রাতে কাজ করতে পারবেন, একা রিকশায় উঠতে পারবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রাত পর্যন্ত পড়তে পারবেন, নিজের পছন্দের পোশাক পরতে পারবেন, নিজের পছন্দের মানুষকে বেছে নিতে পারবেন—এগুলো কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এগুলো একজন স্বাধীন মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। তার এই স্বাধীনতার জন্য তাকে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অপমানের মূল্য দিতে হবে না। কেমন পৃথিবী রেখে যাব আমরা? শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ—আমরা আমাদের মেয়েদের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই? এমন একটি পৃথিবী, যেখানে মা তার মেয়েকে বাইরে পাঠিয়ে বারবার ফোন করবেন—‘কোথায় আছিস? কখন ফিরবি?’ এমন একটি পৃথিবী, যেখানে একজন নারী প্রতিবাদ করার আগে ভাববেন—‘আমার কী হবে?’ এমন একটি পৃথিবী, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসই নতুন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে? নাকি এমন একটি পৃথিবী, যেখানে একটি মেয়ে নির্ভয়ে বলতে পারবে—‘আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।’ আর তার চারপাশ থেকে একসঙ্গে কয়েকটি কণ্ঠ ভেসে আসবে—‘আমরা তোমার পাশে আছি।’ নারীর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহও নয়। এটি একজন মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। একজন নারী নিরাপদে রাস্তায় হাঁটবেন, কর্মস্থলে কাজ করবেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়বেন, নিজের ঘরে থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলো সেই বাস্তবতা, যেখানে তাকে এসব করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের নিরাপত্তার হিসাব কষতে হয়। হয়তো একদিন সংবাদপত্রের পাতায় নারী নির্যাতনের খবর পুরোপুরি বন্ধ হবে না। মানুষের সমাজে অপরাধ একদিনে নিশ্চিহ্ন হয় না। কিন্তু আমরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছাতে পারি, যেখানে একজন নারী অন্যায়ের শিকার হলে তিনি একা থাকবেন না। পরিবার তার পাশে দাঁড়াবে, সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে এবং আইন তাকে নিরাপত্তা দেবে। কারণ একজন নারীকে নিরাপদ রাখার অর্থ শুধু তাকে একটি বিপদ থেকে বাঁচানো নয়; তাকে তার নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। আর যে সমাজ তার নারীদের ভয় নয়, সাহস দিয়ে বড় হতে শেখায়—সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের সভ্য হয়ে ওঠে। লেখক : গণমাধ্যমকর্মী। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>