বিজ্ঞাপন
স্কুলে থাকতেই এলাকার দিকে ভয়াবহ বন্যা ধেয়ে আসার খবর পান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। সঙ্গে সঙ্গে দেন দ্রুত স্কুল খালি করার নির্দেশ। আর তার এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে নেপালের নুওয়াকোট জেলায় প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যা থেকে বেঁচে যায় প্রায় ৯০০টি শিশুর প্রাণ।
৪৭ বছর বয়সী দাওয়াদি নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে তার এক বন্ধু তাকে ফোন করে জানান, আকস্মিক বন্যায় পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম ভেসে গেছে। তিনি দাওয়াদিকে দ্রুত স্কুল ত্যাগ করে আত্মরক্ষা করতে বলেন।
দাওয়াদি শুরুতে ভেবেছিলেন তার স্কুলটি নিরাপদ। তিনতলা এই ভবন নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এক অভিভাবক দৌড়ে স্কুলে এসে জানান, পানি খুবই দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ওই অভিভাবকের কথা শুনে দাওয়াদি আর দেরি না করে স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বাজান ও শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম থেকে বের করে নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি স্কুলের বাস চালকদের ফোন করে তাদের ফিরে আসতে বলেন।
প্রধান শিক্ষকের কথামতো শিশুরা উঁচু স্থানের দিকে যেতে শুরু করে। এ সময় একটি মেয়ে তীব্র আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে পাহাড়ের ওপরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাকি শিশুরা হেঁটে বা দৌড়ে নিরাপদে সরে যায়। আর দাওয়াদি তাদের পেছনে থেকে নজর রাখেন। শেষ পর্যন্ত শিশুরা একটি বোধি (অশ্বত্থ) গাছের নিচে আশ্রয় নেয়।
এর কিছুক্ষণের মধ্যে পাহাড়ি ঢলের পানি পুরো এলাকা প্লাবিত করে। কাদা, পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ এসে স্কুল ভবনসহ আশপাশের অন্যান্য স্থাপনা ও সেতু গুঁড়িয়ে দেয়। অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায় প্রায় ৯০০ শিশুর সবাই। স্কুলের অধিকাংশ কর্মীও বেঁচে যান। তবে দুর্ভাগ্যবশত দুজন কর্মচারী প্রাণ হারান।
রাজেন্দ্র দাওয়াদি বলেন, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আমি চারটি সতর্কবার্তা পাই। এই ফোনকলগুলোর মধ্যে এমন খবরও ছিল যে উজানের বেত্রাবতী বসতি দিয়ে বন্যার পানি এরই মধ্যে নামতে শুরু করেছে। সেই সময়ই আমি সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আর দেরি করা উচিত হবে না।
তারা যখন উঁচু স্থানে সরে যাচ্ছিলেন, তখন দাওয়াদি দেখতে পান নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার (৩২৮ ফুট) দূরে থাকা একটি হোস্টেল ভবন বন্যার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা যদি ১০ মিনিট পরে এই সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে শিক্ষার্থীদেরসহ আমি নিজেও আজ আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না।
প্রধান শিক্ষকের সিদ্ধান্তে রক্ষা পাওয়া ৯০০ শিক্ষার্থীর একজন ১৬ বছর বয়সী ইউনিশা। সে বলে, বন্যা আঘাত হানার মাত্র কিছু মুহূর্ত আগে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই। আমি ও আমার বন্ধুরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে গেছি।
ইউনিশা জানায়, সে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুলের পেছনের সরু ও কাদাময় পথ দিয়ে দৌড়ে উঁচু স্থানে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, চোখের পলকে আমার সামনেই পুরো বাজার ভেসে গেল।
ইউনিশার মা সাবিনা শ্রেষ্ঠা বলেন, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। মেয়েকে ও তার বাবাকে বহুবার ফোন করেছি, কিন্তু কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। অবশেষে যোগাযোগ করতে সক্ষম হলে কিছুটা স্বস্তি পান বলে জানান শ্রেষ্ঠা। তবে ইউনিশা তিন দিন পর বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত পরিবারটির উদ্বেগ কাটেনি।
তিনি বলেন, আমি খুবই খুশি ও স্বস্তি অনুভব করছি। ঈশ্বর আমার মেয়েকে রক্ষা করেছেন।
এদিকে, হিমবাহধসে নেপাল ও তিব্বতে সৃষ্টি হওয়া দুর্যোগে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৪৮ জন। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। তবে বড় সংকট দেখা দিয়েছে মরদেহগুলো নিয়ে। পানিতে ভেসে আসা শত শত অর্ধগলিত মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় গণকবর দেওয়া শুরু করেছে নেপাল কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন