জাতীয়

নেপালের বিপর্যয়ের কারণ কী ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন কতটা দায়ী এই দুর্যোগের জন্য

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
2 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

নেপালে হঠাৎ নেমে এল পানির এক ভয়ংকর দেয়াল। মুহূর্তেই ভেসে গেল ঘরবাড়ি, রাস্তা ও নানা অবকাঠামো। এই ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষ মারা গেছে, নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন। নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় আঘাত হানা এই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র জানতে হয়তো আরও কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস সময় লাগবে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত বড় দুর্যোগের কারণ কী? এত বড় বিপর্যয়ের কোনো আগাম সতর্কতা কেন পাওয়া গেল না?

নেপালের কর্মকর্তারা বলছেন, হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার কারণেই সম্ভবত এই বন্যার সূত্রপাত। পাহাড়ের ওপর থাকা হিমবাহের বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বড় একটি অংশ হঠাৎ ভেঙে নিচে নেমে এলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কর্মকর্তারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হিমবাহ থেকে খসে পড়া সেই বিশাল বরফ ও পাথর হয়তো একটি হিমবাহ-হ্রদে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর প্রবাহ আটকে যায় এবং সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে পানি, বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত আশপাশের জনবসতির ওপর দিয়ে বয়ে যায়।

ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর প্রবাহ আটকে যায়।

ঘটনাটি অনেকটা তুষারধসের মতো। তবে তুষারের বদলে এখানে পাহাড় থেকে নেমে আসে বরফ, পাথর ও নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষের বিশাল মিশ্রণ। নিচের দিকে নামার সময় এই মিশ্রণ প্রচণ্ড গতি অর্জন করে। একই সঙ্গে ঘর্ষণ ও চাপের কারণে বরফের কিছু অংশ গলে যেতে পারে। ফলে পানির পরিমাণ আরও বেড়ে যায় এবং তৈরি হয় আরও শক্তিশালী বন্যার স্রোত।

তবে ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার নতুন স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, শুধু হিমবাহ নয়, এর সঙ্গে বড় ধরনের একটি শিলাধসও ঘটেছিল বলে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ পাহাড়ের শক্ত শিলাস্তরের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার সময় তার সঙ্গে হিমবাহের একটি অংশও নিচে নেমে আসে।

ঘটনার কেন্দ্র ছিল হিমালয়ের লাংটাং লিরুং পর্বত। ৭ হাজার ২০০ মিটারের বেশি উচ্চতার এই পর্বত লাংটাং উপত্যকায় অবস্থিত। উপত্যকাটি ভ্যালি অব গ্লেসিয়ার্স বা হিমবাহের উপত্যকা নামেও পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, লাংটাং লিরুং থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে ছুটে যায়। এর প্রভাব পড়ে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের নদী ও জনপদে।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার নতুন স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, শুধু হিমবাহ নয়, এর সঙ্গে বড় ধরনের একটি শিলাধসও ঘটেছিল বলে মনে হচ্ছে।

প্রাথমিক ভূকম্পন-সংক্রান্ত তথ্য দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো ভূমিকম্প থেকেই এই ধসের শুরু। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ধসের ঘটনাটিই প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব গ্রাজের ভূবিজ্ঞানী ইয়াকব স্টেইনারের ব্যাখ্যাও বেশ চমকপ্রদ। তাঁর মতে, হিমবাহের নিচের পাথরের স্তর ভেঙে যাওয়ায় হিমবাহের নিচের অংশের ভর ধরে রাখার মতো কিছু আর ছিল না। ফলে প্রায় ৫ হাজার ১০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ভর প্রায় ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় নেমে আসে। পথে সেটি নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি একসঙ্গে বেরিয়ে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।

ঘটনাটির বিশালত্ব বোঝা যায় আরেকটি তথ্য থেকে। ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব আর্থ সায়েন্সের জিওমরফোলজিস্ট ক্রিস্টেন কুক প্রাথমিক ভূকম্পন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, কয়েক শ কোটি টন পাথর, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে ধসে পড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিপদ এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। হিমবাহের ওপর এখনো কিছু উপাদান রয়ে গেছে এবং নিচের দিকে আরও কয়েকটি হ্রদও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে আবারও ধস বা বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত ৩০ বছরে নেপাল তার হিমবাহের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই দুর্যোগের সম্পর্ক কোথায়? কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। তবে একটি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সন্দেহ কম—পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ দ্রুত গলছে। এতে শুধু বরফই কমছে না, হিমবাহ ও আশপাশের পাহাড়ের স্থিতিশীলতাও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে এর প্রভাব স্পষ্ট।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত ৩০ বছরে নেপাল তার হিমবাহের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে গত এক দশকে হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মাটির নিচে জমে থাকা বরফও গলছে। এতে পাথরের স্তর দুর্বল হয়ে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

ক্রিস্টেন কুকের ভাষায়, ‘এই একটি ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা কঠিন। তবে হিমালয়ে তাপমাত্রা বাড়ছে, বরফ গলছে এবং পাহাড়ি পরিবেশ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে—এগুলো সত্য।’

একটি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সন্দেহ কম—পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ দ্রুত গলছে। এতে শুধু বরফই কমছে না, হিমবাহ ও আশপাশের পাহাড়ের স্থিতিশীলতাও নষ্ট হচ্ছে।

কানাডার ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার আরও জোর দিয়ে বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বাড়বে। হিমবাহ গলা, বরফ গলা এবং বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন বদলে যাওয়া—সব মিলিয়েই এই ঝুঁকি বাড়তে পারে।’

তবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই দুর্যোগের ভয়াবহতা ঠিক করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের কর্মকাণ্ডও। পাহাড়ি এলাকায় মানুষ যত বেশি বসতি গড়বে, রাস্তা বানাবে এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করবে, তত বেশি মানুষ ও সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। একই ধরনের ধস যদি কোনো জনবসতিহীন উপত্যকায় ঘটে, তাহলে সেটি হয়তো এত বড় মানবিক বিপর্যয় তৈরি করবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>