জাতীয়

পিআইওর দপ্তরে প্রকেল্পর অর্থ হরিলুট, বাদ যায়নি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
সরকারি বরাদ্দে হওয়ার কথা ছিল রাস্তা, মসজিদ-মন্দির ও কবরস্থান উন্নয়ন। তবে গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের এসব প্রকল্পে মিলেছে ভিন্ন চিত্র। কোথাও দুই লাখ টাকার প্রকল্পে মিলেছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা, কোথাও ৭২ হাজারের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার। আবার অস্তিত্বহীন রাস্তা ও ব্যক্তিগত স্থাপনার নামেও বরাদ্দ ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথি এবং কয়েকদিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে এমন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, পিআইও কার্যালয়ের কর্মকর্তা, প্রকল্প সভাপতি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। অভিযোগের তালিকা থেকে বাদ যায়নি মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থানও। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে মোট বরাদ্দের এক-পঞ্চমাংশ, কোনো প্রকল্পে অর্ধেক অর্থ দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রকল্প কাগজে-কলমে দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রকল্প এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং অর্থবঞ্চিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা। তারা বরাদ্দের অর্থ ফেরত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মসজিদ-মন্দির-কবরস্থানের বরাদ্দেও লুট তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিআর প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ‘আমি মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা পিআইও স্যারের। পিআইও কার্যালয় থেকে অর্ধেক অর্থ দেওয়ার শর্তেই প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছিল। পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প দেবে না। বর্তমান পিআইও রিয়াজুল সাহেব মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও খান’ তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে মসজিদটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরাদ্দের বিপরীতে মসজিদে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। এমনকি মসজিদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যদের অনেকেই এই ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়টিও জানেন না। আরও পড়ুন কাজ না করেই চার প্রকল্পের পুরো টাকা লোপাট মসজিদের সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মসজিদের জন্য কোনো সরকারি টাকা পাওয়ার বিষয়ে তিনি জানেন না। কমিটির অন্য সদস্যরাও একই কথা জানান। প্রকল্পের সভাপতি ও মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার বলেন, প্রকল্প কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যাংক হিসাবের চেকে তিনি স্বাক্ষর করেছেন। এর বাইরে প্রকল্পের অর্থ বা কাজের বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না। তার ভাষ্য, ‘এ সংক্রান্ত প্রকল্পের বিষয়গুলো সারোয়ার ভাই দেখেন। চেকে স্বাক্ষর নেওয়ার পর তিনি ও মসজিদ কমিটি কী করেছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই।’ যেসব প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। পিআইও অফিস সম্পর্কে মনে হয় আপনি নতুন করে জানেন। এখানে সবাই হাত দেয়। আমার পক্ষে এগুলো অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব কি?- গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম। প্রকল্প পরিচালনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা সারোয়ার গিদারী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা সদস্য জরিফুল বেগমের স্বামী। মোবাইল ফোনে তিনি মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। সারোয়ার বলেন, ‘মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প ধরানো হয়েছে।’ বাকি টাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবই তো জানেন? পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনাবেচা হয়। আমি এটি কিনে নিয়েছি।’ আরও পড়ুন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় / শতকোটি টাকার প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি একই অর্থবছরে লক্ষীপুর ইউনিয়নের ‘বালাআটা উত্তরপাড়া জামে মসজিদ উন্নয়ন’ টিআর প্রকল্পে ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মসজিদ কমিটি পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। মসজিদের সেক্রেটারি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তা তাদের জানানো হয়নি। ওয়ার্ডের মোস্তফা মেম্বার তিন দফায় ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। প্রকল্প সভাপতি ও আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য স্থানীয় জাকিরুল ইসলাম বলেন, মেম্বার তার কাছ থেকে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন। লক্ষীপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা পিআইও স্যারের। পিআইও কার্যালয় থেকে অর্ধেক অর্থ দেওয়ার শর্তেই প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছিল। পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প দেবে না।’ নিজে মাত্র তিন হাজার টাকা পেয়েছেন দাবি করে এই ইউপি সদস্য আরও বলেন, ‘বর্তমান পিআইও রিয়াজুল সাহেব মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও খান।’ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর প্রকল্পের আওতায় বাদিয়াখালী ইউনিয়নের ‘৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছাট চকবরুল শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের উন্নয়ন’ প্রকল্পে ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে মন্দির পরিচালনা কমিটির দাবি, তারা পেয়েছে মাত্র ২৬ হাজার টাকা। আরও পড়ুন আগের কাজে অনিয়ম, ফের দেওয়া হলো পৌনে ৯ কোটি টাকার কাজ মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘আমাদের প্রথম দফায় ২৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় বাকি টাকার জন্য পিআইও অফিসে গেলে জানানো হয়, ওই টাকা নেই।’ প্রকল্পের সভাপতি ও মন্দিরের পুরোহিত নিকুঞ্জ কুমারশীল (দয়াল)ও একই কথা জানান। কবরস্থানের বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা হারুণ মিয়া বলেন, উত্তরপাড়া কবরস্থানটি অনেক পুরোনো। বরাদ্দের অর্থ পাওয়া গেলে সেখানে প্রাচীর নির্মাণ করা যেত। তিনি বরাদ্দের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি আত্মসাতে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন। রাস্তা নেই, তবু বরাদ্দ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাদিয়াখালী ইউনিয়নের হিরু মহুরীর বাড়ি থেকে পশ্চিমে মোস্তফার বাড়িগামী রাস্তা সংস্কারে দুই লাখ ২৩ হাজার ৭৫৬ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও ওই রাস্তার কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পটির সভাপতি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাফায়েতুল হকের নাম রয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই জানি না ওই কাজের সভাপতি আমি।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন আনন্দ টিভির সাংবাদিক মিলন খন্দকার। একই অর্থবছরের কাবিখার তৃতীয় পর্যায়ে ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ প্রকল্পে প্রায় সাড়ে পাঁচ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে ওই প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্পে রাস্তা সংস্কারের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের ভাষ্য, জায়গাটি কয়েকটি পরিবারের বাড়ির উঠান। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘এখানে কোনো রাস্তা নেই, এটা বাড়ির উঠান। এখানে কোনো কাজ করা হয়নি।’ একই কথা জানান ছাইফুল ইসলাম ও মাহফুজার রহমান। প্রকল্পটির সভাপতি রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম। মোবাইল ফোনে কথা বলার শুরুতে তিনি ইটের কাজ করার দাবি করলেও এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘অনেকদিন আগের কথা, দেখতে হবে কোন প্রকল্প।’ আরও পড়ুন তিস্তা সেচ ক্যানেল / ১৪০০ কোটি টাকার ‘অপরিকল্পিত’ প্রকল্পের পদে পদে অনিয়ম এ ছাড়া নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার কফিন ও ঘর নির্মাণের নামে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পটির সভাপতি করা হয় অ্যাভোকেট আমিনুল ইসলাম ফকুকে। তবে তিনি বরাদ্দের টাকা তোলার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। সরেজমিনে দেখা যায়, রেলের জমি দখল করে নিজের বাড়ির সামনে নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার অফিসঘর নির্মাণ করছেন যুবলীগ নেতা কায়ছার প্লাবন। সেখানে টিনের একটি ঘর ছাড়া ওই সংস্থার কার্যক্রমের আর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। জেলা পরিষদের গত অর্থবছরের বরাদ্দ থেকেও ওই সংগঠনের নামে দুই লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কায়ছার প্লাবন করোনার সময় থেকে লাশ দাফনের নামে মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেন। পরে সেটিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। পিআইও অফিসের অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পিআইও অফিস সম্পর্কে মনে হয় আপনি নতুন করে জানেন। এখানে সবাই হাত দেয়। আমার পক্ষে এগুলো অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব কি? যা বলছেন কর্তৃপক্ষ গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক বলেন, প্রকল্পগুলো নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি অর্থ লুটপাট বা আত্মসাতের সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থের এমন অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র বের করা জরুরি। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের অর্থ কোথায় গেল, কারা উত্তোলন করল এবং কীভাবে ব্যয় দেখানো হলো—এসব বিষয় খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। আনোয়ার আল শামীম/কেএইচকে/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>