ব্রেকিং নিউজ
জামায়াত চায় বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিতে: হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঐতিহ্য উৎসবে ইতিহাসের রঙে মেতেছে বেরোবি মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগে তেজগাঁওয়ে যানবাহনের চাপ কমবে  সরকারও আশির দশকে ফিরে যেতে চাইছে: নাহিদ ইসলাম চট্টগ্রাম বন্দরে চার শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের লাইসেন্স স্থগিত অনিয়ম-বাড়তি ভাড়া আদায় রোধে গণপরিবহনে বসবে জিপিএস শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা পাঁচ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মৌসুমের শেষে দামি হয়ে উঠেছে কাঁঠাল, একেকটি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকায় এআই যেভাবে বদলে দিচ্ছে সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ
জাতীয়

ফিরোজা বেগমের শেষ সাক্ষাৎকার: নজরুল বললেন, ‘তুমি আরেকটা গান শোনাও’

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

২০০৯ সালের ২১ মে নজরুলের জন্মজয়ন্তীতে উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমের (২৮ জুলাই ১৯৩০-৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪) এই দুর্লভ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন কবির বকুল। সে বছরই প্রথম আলোর আনন্দ পাতার বিশেষ আয়োজনে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘আমাকে দেব না ভুলিতে’ শিরোনামে। পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ‘প্রথম আলোকে ফিরোজা বেগম’ শিরোনামে সাক্ষাৎকারটির আরেকটি অনলাইন সংস্করণ দেখা যায়। আজ ফিরোজা বেগমের প্রয়াণ দিবসে সেই দুর্লভ সাক্ষাৎকারটি আবারও অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

কবির বকুল: নজরুলসংগীত ও ফিরোজা বেগম—এটি যেন ঠিক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নজরুলের গানকে কণ্ঠে ধারণ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্যও আপনার হয়েছিল। কবির সঙ্গে আপনার পরিচয়ের সেই দুর্লভ মুহূর্ত মনে করে যদি একটু স্মৃতিচারণা করতেন।

ফিরোজা বেগম: আমি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে। আমার বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরকারি আইনজীবী। সেই সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি আদালতে কাজ করতেন। আমরা থাকতাম ফরিদপুরে। বিভিন্ন ছুটিতে কলকাতায় ঘুরতে যেতাম। একবার গ্রীষ্মে এক মাস ছুটি পেলাম। ছোট মামা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ করছেন। মামা গান-বাজনা পছন্দ করতেন। আমার এক কাজিন ইমদাদুল হক, পড়ালেখার পাশাপাশি তখন ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতেন। তাঁর ছোট ভাই এম এ হক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন। (পরে তিনি তত্কালীন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।) দুই ভাই গানের ভক্ত। আমার বয়স তখন এগার-বারো হবে। অল ইন্ডিয়া বেতারের সুনীল বোসের সঙ্গে আমার এই দুই ভাইয়ের সুসম্পর্ক ছিল। একবার এক অনুষ্ঠানে সুনীল বোস আমার গান শুনে বললেন, ‘ওকে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একদিন নিয়ে এসো তো। ওর অডিশন নেব। এইচএমভিতেও একদিন নিয়ে এসো। দেখো, ওরা কী বলে।’ তাঁর কথা শুনে আমি বোকা বোকা চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ‘অডিশন’, ‘এইচএমভি’ শব্দগুলো আমার কাছে অপরিচিত। এরপর একদিন ভাই আর মামা মিলে আমাকে এইচএমভিতে নিয়ে গেলেন। সেখানে ঢুকেই দেখলাম এইচএমভির লোগো কুকুরের ছবিটা। দেখেই বললাম, ‘আরে, আমি তো এই ছবিটা রেকর্ডে দেখেছি।’ ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। এখান থেকেই সেই রেকর্ডগুলো বের হয়।’ শুনে তো আমার গলা শুকিয়ে গেল। এরপর আমাকে রিহার্সেল রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেই প্রথম কাজী নজরুল ইসলামকে দেখলাম। উনি তখন এইচএমভির প্রধান প্রশিক্ষক।

কবির বকুল: তারপর?

ফিরোজা বেগম: সেদিন তিনি ঘিয়া রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। মাথায় টুপি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। আমাকে ডেকে তাঁর পাশে বসালেন। আমি কিন্তু তখনো জানি না—ইনিই কাজী নজরুল ইসলাম। আমি মনে মনে ভীষণ বিরক্ত। একটা রুমে গাদাগাদি করে এত মানুষ! তার ওপর হারমোনিয়ামসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। মামা এইচএমভির এক কর্মকর্তার মাধ্যমে কবিকে জানালেন যে আমার গান শোনাতে নিয়ে এসেছেন। শুনে কাজী নজরুল ইসলাম হো হো করে হেসে উঠলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাহ্, বেশ তো। তা কী গান শোনাবে আমাদের?’

গান করছেন ফিরোজা বেগম

কবির বকুল: আপনি তখন গান করেছিলেন?

ফিরোজা বেগম: আমি তাঁর কথার উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অনেকটা বিরক্তি নিয়েই গান ধরলাম—‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা/ শুধু চোখে দেখা দিতে এস না’। গানটি খুবই কঠিন। গান শেষ করেই উঠে দাঁড়ালাম, বাইরে চলে আসব। আমাকে কাজী নজরুল ইসলাম হাত টেনে ধরে বসালেন। বললেন, ‘ওরে সর্বনাশ! এ কী গান শোনালে তুমি। এতটুকু মেয়ে এ গান কীভাবে, কোথা থেকে শিখলে?’

একটু চুপ থেকে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, আমার কয়েকটা কথার জবাব দেবে তুমি?’

মাথা নেড়ে বললাম দেব। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ গান তুমি কোথা থেকে শিখেছ? কার কাছ থেকে?’

আমি বললাম, ‘কারও কাছ থেকে নয়। ওই বাসায় কালো মোটা ভাঙা ভাঙা রেকর্ডগুলো আছে না, ওইগুলো শুনে শুনেই শিখেছি।’ আমার এমন বোকার মতো উত্তর শুনে উনি হো হো করে অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন, আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম।

যা-ই হোক, আমার মা-বাবা, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন। উত্তর দিলাম। এরপর বললেন, ‘এত কঠিন গান তুমি একা একা তুলেছ। বলো কী, এত মিষ্টি কণ্ঠে মাত্র একটা গান শুনে কি ছাড়া যায়? আমরা কি আরেকটা শুনতে পারি না?’ তাঁর কথায় আমার প্রচণ্ড অস্বস্তি আর বিরক্ত লাগছিল। মাথা নেড়ে বললাম, না। কাজী নজরুল ইসলাম বললেন, ‘তুমি হারমোনিয়াম বাজাতে পারো?’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।

‘বলে কী! সেটাও কি নিজে নিজে শিখেছ?’ আবারও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। তিনি বললেন, ‘একটা রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে নিজে নিজে এত সুন্দর গান শিখে ফেলেছে। এত দিন গান করছি, এ রকম প্রতিভা তো এর আগে পাইনি।’ তিনি আবারও বললেন, ‘তুমি আরেকটা গান শোনাও।’ একটা হারমোনিয়াম নিজে এনে আমার সামনে দিলেন। আমি খানিকটা বাজানোর পর দেখি—একটা রিড উঠলে দূরের আরেকটা উঠে যায়। (পরে জেনেছি, ওটা ছিল স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম।) আমি বললাম, এই হারমোনিয়াম বাজাব না। এটার আওয়াজ কেমন ভাঙা ভাঙা। আমাদের হারমোনিয়ামটা ভালো। কথা শুনে উনি আরও জোরে হেসে উঠলেন। আমার অস্বস্তিও আরও বেড়ে গেল। বললেন, ‘এ কী দেখছি! এ মেয়ে তো সবই বোঝে। এই কেউ যাও তো। কমলকে (কমল দাশগুপ্ত) ডেকে আনো। এ মেয়ের গান ওর শোনা উচিত।’ তাঁর কথা শুনে কেউ একজন বেরিয়ে গেল। একটু পরই বেশ সুদর্শন একজন পুরুষ এলেন। বয়স ২২ কি ২৩। কাজী নজরুল ইসলাম বললেন, ‘কমল, আমরা এই বাচ্চা মেয়ের গান শুনে তো হতবাক হয়ে গেছি। তুমিও একটু শুনে দেখো।’ আমি দ্বিতীয় গান ধরলাম—‘কালো পাখিটা মোরে কেন করে এত জ্বালাতন’।

কবির বকুল: গানটি কার?

ফিরোজা বেগম: এটি ডিএল রায়ের গান। গানটার মধ্যে সূক্ষ্ম কারুকাজ ছিল। ১০-১১ বছরের একটা মেয়ের গলায় ওই গান ওঠার কথা নয়। কখনো হালকা, কখনো ভারী কারুকাজ, ওঠা-নামা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই গান এখন আর শোনাই যায় না। তো, গানটি অর্ধেক গেয়ে আমার আর গাইতে ইচ্ছে করল না। বললাম, আমি আর গাইতে পারব না। কাজী নজরুল ইসলাম বললেন, ‘ঠিক আছে, যা গেয়েছ তাতেই আমরা অবাক। তবে বলে যাও, আবার আমাকে গান শোনাতে আসবে।’ এরপর ওখান থেকে বাইরে এলাম।

কবির বকুল: আপনি কি তখনো জানতেন না, উনি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম?

ফিরোজা বেগম: না। কী করে জানব? কেউ তো আমাকে বলেনি। আমার তখন দুই চোখ ফেটে পানি ঝরছে। মামা-ভাইয়েরা কেন এখানে নিয়ে এলেন—এই অভিমানে। মামা আমার অবস্থা দেখে বললেন, ‘তুই যে বিরক্ত হচ্ছিস, তুই কি জানিস কার সামনে আজ গান করেছিস? ওই যে তোকে ডেকে পাশে বসালেন, তাঁর নাম হচ্ছে কাজী নজরুল ইসলাম।’

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, কোন কাজী নজরুল ইসলাম? ‘বল বীর’? বাবার মুখে ‘বল বীর’ কবিতাটা অনেকবার শুনেছিলাম। ওই কবিতা দিয়েই কবির নামটি আমার কাছে পরিচিত। পরে শুনেছিলাম, সেদিন আমি চলে আসার পর কাজী সাহেব মহড়াকক্ষে সবার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এই মেয়ে গান না শিখেই এত ভালো গায়। শেখালে না জানি কী গাইবে। আমি হয়তো সেদিন থাকব না, কিন্তু তোমরা দেখে নিয়ো, এই মেয়ে অনেক ভালো শিল্পী হবে। এই মেয়েকে গানের ব্যাপারে যা যা সাহায্য করতে হয় তোমরা করো।’ তিনি সুস্থ থাকা অবস্থায় এর পরও তাঁর সঙ্গে পাঁচ-ছয়বার দেখা হয়েছে।

ফিরোজা বেগম

কবির বকুল: আপনার প্রথম রেকর্ড বের হয় কত সালে, কীভাবে?

ফিরোজা বেগম: ১৯৪২ সালে। মানে কবির কাছে যাওয়ার এক বছর পর একদিন এইচএমভি থেকে আমাকে বলল, ‘তুমি রেকর্ড বের করবে?’ আমি বললাম, করব, কিন্তু কীভাবে? কারণ, এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। চিত্তরঞ্জন রায় ছিলেন কাজী নজরুলের প্রধান সহযোগী। তিনি তখন বাসায় এসে আমাকে গান শেখাতেন। চিত্তরঞ্জন বাবুই এইচএমভিকে বললেন, ‘আমাকে দিন। ওর রেকর্ডটা আমি করে দিই। আমি তো ওকে গান শেখাচ্ছি। আমি বোধ হয় ওকে ভালো ম্যানেজ করতে পারব। আর কাজীদা তো বলেই গেছেন ওর কথা।’ এরপর রেকর্ড হয়ে গেল। তখন তো আর লংপ্লে ছিল না। সেভেন্টি এইটে (78 rpm) বের হলো আমার প্রথম রেকর্ড। এক দিকে ছিল ‘মোর আঁখিপাতে’, আরেক দিকে ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’। তখন আমার কতই–বা বয়স, ১২-১৩ বছর হবে। কলকাতার কাগজগুলোতে আমাকে নিয়ে লেখা হলো ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’ সেটা আমরা জানি।

কবির বকুল: আপনার প্রথম রেকর্ডকৃত গান কি কবি শুনেছিলেন?

ফিরোজা বেগম: ১৯৪২-এর ডিসেম্বরে আমার প্রথম রেকর্ড বের হয়। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম অল্পের জন্য আমার রেকর্ড শুনতে পাননি। কারণ, এর মাত্র মাস কয়েক আগেই উনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর একের পর এক রেকর্ড বের হতে লাগল। আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, গীত, গজল, ভজন—সবকিছু করছি। সবাই খুব প্রশংসাও করছে। কিন্তু নজরুলসংগীত নয়। আমার তখন একটাই চিন্তা, কবে নজরুলসংগীত করব। কেন যেন বারবার মনটা ওই দিকেই যেতে চাচ্ছে। সবাই বললেন, যা গাইছি, ভালোই গাইছি। নজরুলসংগীতে ঢোকার কী দরকার। ওদিকে চিত্তরঞ্জন রায়, বিশেষ করে কমল দাশগুপ্তের প্রচুর আধুনিক গান করছি। কমল দাশগুপ্তের কাছে গান শেখাও শুরু করলাম। ঠুমরি, দাদরা, খেয়াল—নানা কিছু উনি শেখালেন। দেখলাম—আমার গলা ভালো হয়ে উঠল, ধীরে ধীরে গানগুলো আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম।

এদিকে আমি যা গাইছি, সেটাই হিট হয়ে যাচ্ছে। সবাই ধরেই নিয়েছিল—আমার জন্মই হয়েছে রবীন্দ্রসংগীতের জন্য। আধুনিক গানগুলোও ঘুরছে সবার মুখে মুখে। আমার গাওয়া গীত তখন দিল্লি, হায়দরাবাদ, আহমেদাবাদে ভীষণ জনপ্রিয়। ওই সময় আমি নজরুলসংগীত শেখা শুরু করলাম। সবাই নিষেধ করলেও আমার গুরু কমল দাশগুপ্ত আমাকে উত্সাহ দিয়ে গেলেন। খাতা খুলে একের পর এক নজরুলের গান শুনিয়ে যাচ্ছেন। সুন্দর কথা ও সুর। রেডিওতে নজরুলের গানের রেকর্ড বের করতে চাইলাম। রেকর্ড কোম্পানি বলল, তাঁর গান ওভাবে চলবে না। আর এত ভালো আধুনিক, রবীন্দ্রনাথের গান করি, কেন নজরুল করব। কিন্তু আমি রীতিমতো যুদ্ধ করে নজরুলসংগীতের রেকর্ড বের করলাম। শ্রোতারা সাদরে গ্রহণ করল। আসলে কমল দাশগুপ্তের মতো গুরুর শিষ্য যে, তাকে কে আটকায়। একজন শিল্পীকে কীভাবে তৈরি করতে হয়, তা তিনি খুব ভালো জানতেন। একটা একটা করে অনেক নজরুলের গান গাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু রেকর্ড আর করা হচ্ছিল না। দেশভাগের আগে কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলাম। কিন্তু এপারে চলে আসার পর ওরা আমার গানগুলো বের করেনি। ওই সময় রেডিওতে শুনতাম আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালাসহ অনেকেই নজরুলের গান গাইছেন। কিছু নজরুল চাপা পড়ে থাকছে। বলা হচ্ছে, ‘আধুনিক গান করতে আসছেন অমুক, গানটি লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম।’ নজরুলের শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি—এগুলো তো হরদম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া হচ্ছে। নামটা পর্যন্ত বলছে না। আমি তো সেগুলো একদমই মেনে নিতে পারছিলাম না। এরপর ১৯৫৯ সালের দিকে ‘সাঁঝের তারকা’সহ কয়েকটি গান রেকর্ড করলাম। এই হচ্ছে আমার নজরুলের গানে প্রবেশ।

ফিরোজা বেগম

কবির বকুল: কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে আপনার বিয়ে কবে হয়েছিল? বিয়ের পর কি নিয়মিত গান করেছেন?

ফিরোজা বেগম: ১৯৫৬ সালে কমলের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। শাকিল জন্ম নেওয়ার পর গানের রেকর্ড করাতে একটু ছন্দপতন ঘটে। তবে ওই সময়ই নজরুলের গানের দিকে আমি আরও ঝুঁকে পড়ি। ছেলেরা কিছুটা বড় হয়ে উঠল। (ফিরোজা বেগমের তিন ছেলে—শাকিল, হামিন, শাফিন।) ১৯৬০ সালের দিকে আবারও গাইতে গেলাম ভারতে। কলকাতায় আকাশবাণীতে আমাকে তখন অডিশন দিতে হলো। খুবই অপমানিত বোধ করলাম। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে আসার জন্য ওটাই ছিল নিয়ম। সেখানেই নজরুল ইসলামের গান গেয়ে অডিশন দিলাম। সবাই তো বেশ অবাক। এর পর থেকে ‘এবার নজরুল ইসলামের গান গাইছেন ফিরোজা বেগম’—এমন ঘোষণা আকাশবাণীতে প্রায়ই যেতে লাগল।

কবির বকুল: নজরুলগীতি নয়, বলতে হবে নজরুলসংগীত—এই আন্দোলনটা আপনিই শুরু করেছিলেন।

ফিরোজা বেগম: হ্যাঁ। কোম্পানি, রেডিও—সবাইকে বললাম, ‘এখন থেকে নজরুলসংগীত বলতে হবে। আমার রেকর্ডেও থাকবে ফিরোজা বেগমের সংগীত।’ সবাই বলল, ‘না না, এটা কীভাবে হয়। আমরা তো নজরুলগীতিই বলি।’ আমি বললাম, ‘তাহলে কেন এটা নজরুলগীতি, কেন নজরুলসংগীত নয়, সেটা ব্যাখ্যা করতে হবে।’ তাঁরা সেটা পারলেন না। শেষ পর্যন্ত আমার জয় হলো। বলা শুরু হলো নজরুলসংগীত। ওই বছর, মানে ১৯৬০ সালে আমি উদ্যোগ নিয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র মঞ্চে তিন দিনব্যাপী নজরুলসংগীত সম্মেলন করলাম। আমি ছিলাম প্রোগ্রাম সেক্রেটারি। ওই সম্মেলনে নিভৃতচারিণী আঙ্গুরবালাকে অনেক দিন পর সবার সামনে গান গাইতে নিয়ে এলাম। রাঁধারানী, কমলা ঝরিয়া, ইন্দুবালা, রাইচাঁদ বড়াল, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, শান্তিদেব ঘোষ, পংকজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ কলকাতার নামীদামি এমন কোনো শিল্পী ছিলেন না যে ওই তিন দিনের সম্মেলনে এসে নজরুলসংগীত পরিবেশন করেননি। শৈলজানন্দ, সন্তোষবাবু, প্রবোধ সান্যাল, প্রমথনাথ, তারাশঙ্কর বাবু, রজনীকান্ত দাশ—সবাই এসেছিলেন। আর ওই সময় কমল দাশগুপ্ত আর চিত্তরঞ্জন রায় ছিলেন আমার দুই পাশে। সবাই আমাকে দেখে অবাক। এত ছোট মেয়ে এত বড় একটা আয়োজন করে ফেলল! সেই থেকে এ সম্মেলন নিয়মিত হয়ে গেল।

কবির বকুল: নজরুলগীতির স্বরলিপির কাজটাও তো আপনি অনেকটা করেছিলেন?

ফিরোজা বেগম: হ্যাঁ। তিনি অসুস্থ হওয়ার ১৮ বছর পর স্বরলিপির কাজে আমি হাত দিই। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত আমি কলকাতায় ছিলাম, এর মধ্যে স্বরলিপির তিন–তিনটি বই করে আমি কলকাতা থেকে বাংলা একাডেমিতে পাঠাই। কলকাতা থেকে শ্যামাসংগীতের স্বরলিপির বইও বের হলো। এর পর থেকেই সবার টনক নড়তে লাগল।

১৯৬২ সালে একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলাম। এইচএমভি নজরুল ইসলামের গানের রেকর্ড বের করবে না। আমি বললাম, ‘আমি নজরুল ইসলামের গান ছাড়া কোনো রেকর্ড করব না।’ আড়াই বছর আমার কোনো রেকর্ড বের হলো না। এরপর আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে সেবারের পুজোয় ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ ও ‘মোমের পুতুল’—নজরুলের দুটো গান করলাম। রেকর্ডটি বের হওয়ার আগে বিস্তর হাসাহাসি, সমালোচনা হলো। কিন্তু রেকর্ড বের হওয়ার পর সেবার পুজোয় সব কপি বিক্রি হয়ে গেল। তিরের মতো চারদিকে গান দুটো ছড়িয়ে গেল। গান দুটোর সংগীতায়োজন করেছিলেন আমার গুরু কমল দাশগুপ্ত।

কবির বকুল: নজরুলের গানের ওপর কলকাতা থেকে আপনার লংপ্লে পেলেও এ দেশ থেকে আপনার কোনো লংপ্লে বা অডিও অ্যালবাম বের হয়নি কেন?

ফিরোজা বেগম: কেউ উদ্যোগ নেননি তাই। অবশ্য কলকাতা থেকে বের হওয়া লংপ্লেগুলো এ দেশে পাইরেসি করে অনেকেই বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছেন। আমার কাছে নজরুলের অপ্রচলিত ও অপ্রকাশিত অনেক গান এখনো রয়ে গেছে। আমি ছাড়া সেগুলোর সুর কেউ আর এখন জানে না। দুঃখের কথা কী বলব! নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে আমার গাওয়া গানগুলোর একটিরও স্বরলিপি করা হয়নি। জীবনেও গানের সঙ্গে যাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল না, তাঁদের ভাষ্য হচ্ছে, গানগুলোর সুর নাকি ঠিক নেই। এমন অপমানিতও এই দেশে আমাকে হতে হচ্ছে।

কবির বকুল: অসুস্থ হওয়ার পর কি কবিকে দেখতে যেতেন?

ফিরোজা বেগম: এটা আমার আর কমলের নিয়মিত কাজ ছিল। আমি ও কমল প্রায়ই তাঁকে দেখতে যেতাম। কমল বলত, ‘কি কাজীদা চিনতে পারছেন? একসঙ্গে কত গান করলাম।’ তিনি কোনো উত্তর দিতেন না। তাঁর প্রতিটি জন্মদিনে আমরা যেতাম। মনে পড়ে, ‘দৃষ্টিতে আর হয় না সৃষ্টি আগের মতো গোলাপ ফুল’—নজরুলের অসাধারণ এই গান শুধু আমিই করেছি। কাজী নজরুল ইসলাম তখন অসুস্থ। এই গান তখন তাঁকে শুনিয়েছিলাম।

কবির বকুল: নজরুলের গান নিয়ে এই যে আপনার দীর্ঘ আন্দোলন, ত্যাগ—এর জন্য অনেক সমালোচনার মুখোমুখিও আপনাকে নিশ্চয়ই হতে হয়েছে।

ফিরোজা বেগম: শুধু কলকাতায় নয়, ঢাকায় আসার পরও আমার নজরুলপ্রীতি নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কলকাতায় একবার এক সংবাদ সম্মেলনে একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি ছাড়া তো নজরুলকে নিয়ে কেউ তেমন কিছু করছে না। আমরা কি ধরে নিতে পারি যে এর পেছনে আপনার সাম্প্রদায়িক মনোভাব কাজ করছে?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘আমার ব্যক্তিগত জীবন কি আপনার এ প্রশ্নের জবাব দেয় না?’ ব্যস, সবই চুপ হয়ে গেল।

কে সারা জীবন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন? দেশ স্বাধীন করার জন্য বারবার কে জেলে গিয়েছেন? কার সব বই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল? তিনি তো কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে এত অবহেলা কেন? আজকের এই শিক্ষিত সমাজেও নজরুল কেন চাপা পড়ে আছে? সবার কাছে আমার এই প্রশ্ন! নজরুলকে তাঁর যোগ্য সম্মানটা কি আমরা দিতে পেরেছি?

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>