বিজ্ঞাপন
‘স্মার্ট উপায়ে বিদ্যুৎ বিল কমান’, ‘বিদ্যুৎ খরচ কমবে ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ’, ‘যে কোনো সকেটে লাগালেই সাশ্রয়’—এমন নানান চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক সয়লাব।
এক শ্রেণির প্রতারক ব্যবসায়ী চক্রের সদস্যরা চটকদার এসব বিজ্ঞাপনে দাবি করছেন, ছোট্ট একটি ‘স্মার্ট এনার্জি সেভার’ বা ‘পাওয়ার সেভার’ ডিভাইস বাসার যে কোনো সকেটে লাগিয়ে রাখলেই প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারের বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে।
ইদানিং কম্পিউটার বা মোবাইলের মাউস স্ক্রল করলেই ইংরেজি ও বাংলায় এমন প্রলুদ্ধকর বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ডিভাইসের দাম মাত্র ৪৯০ থেকে ৬৯০ টাকা হাকা হচ্ছে।
সরকারিভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি ইউনিটপ্রতি বিভিন্ন স্ল্যাবের কারণে বিদ্যুতের বিল অতিরিক্ত আসার অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে বিল তুলনামূলক বেশি আসায় চিন্তিত সাধারণ গ্রাহকরা। তাদের অনেকেই না বুঝে প্রতারকদের এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন।
রাজধানীর দক্ষিণখানের বাসিন্দা নুরুল আলম (ইলেকট্রনিক সামগ্রী সম্পর্কে ভালো পড়াশোনা রয়েছে) জানান, তার পরিচিত অনেকেই ফেসবুকে দেখা এসব বিজ্ঞাপনের সত্যতা জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে এই ধরনের ডিভাইসের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল কমানোর দাবিকে একেবারেই ‘অমূলক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন
কারিগরি ত্রুটিতে আদানির এক ইউনিট বন্ধ, বাড়ছে লোডশেডিং
গত দুই-তিন দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রল করে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে হরেক নামে অনলাইন পেজ ও শপের বিজ্ঞাপনে বিল কমানোর এসব ভিত্তিহীন দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—Best Shop (বেস্ট শপ), 2inshop (টু ইন শপ), Allion Shop (অ্যালিয়ন শপ), Sellerybd.com (সেলারি বিডি ডট কম” Osthir Collection (অস্থির কালেকশন), Sarashopbd.com (সারা শপ বিডি ডট কম), Daily Spark Bd (ডেইলি স্পার্ক বিডি), Carry Bd (ক্যারি বিডি), Best Shopping (বেস্ট শপিং), EG SaleBd (ইজি সেল বিডি), One Stop Galaxy (ওয়ান স্টপ গ্যালাক্সি), TRT Shop (টিআরটি শপ), Discount Shop (ডিসকাউন্ট শপ), Kinelio (কিনেলিও), The Asia Express (দ্য এশিয়া এক্সপ্রেস), Good Shop (গুড শপ), Vat 30 (ভ্যাট ৩০), Nobo Mart Bd (নোবো মার্ট বিডি), Genious Mart Bd (জিনিয়াস মার্ট বিডি), Zero.O (জিরো ডট ও), Instant Product (ইনস্ট্যান্ট প্রোডাক্ট), Naturo Mart.com (ন্যাচুরো মার্ট ডট কম), Paikari.com (পাইকারি ডট কম), Dorkari Bazar (দরকারি বাজার)।
তবে বিদ্যুৎ প্রকৌশল ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা এবং আন্তর্জাতিকভাবে একই ধরনের ডিভাইস নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষার তথ্য বলছে, সাধারণ আবাসিক গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এই ধরনের ‘পাওয়ার সেভার’ ডিভাইস নিয়ে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের অভিযোগ উঠেছে।
যে কোনো সকেটে লাগালেই বিল কম!
ফেসবুকের বিজ্ঞাপনে দাবি করা হচ্ছে, ডিভাইসটি বাসা, অফিস কিংবা দোকানের যে কোনো বৈদ্যুতিক সকেট বা মাল্টিপ্লাগে সংযুক্ত করলেই বিদ্যুতের অপচয় কমে যাবে। এর জন্য কোনো ধরনের সেটিং, মিটার পরিবর্তন কিংবা আলাদা সংযোগের প্রয়োজন নেই।
কিছু বিজ্ঞাপনে আরও বলা হচ্ছে, ডিভাইসটি বিদ্যুতের ‘ভোল্টেজ স্থিতিশীল’ করবে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের আয়ু বাড়াবে, শর্ট সার্কিট ও সার্জ থেকে সুরক্ষা দেবে এবং একই সঙ্গে মাসিক বিল কমাবে।
কম দাম, ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা এবং ‘বিল ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমবে’ এমন প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে অনেক গ্রাহক পণ্যটি কিনছেন। কিন্তু পণ্যটির কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য বিজ্ঞাপনগুলোতে কোনো স্বীকৃত পরীক্ষাগার প্রতিবেদন, স্বাধীন পরীক্ষার ফল কিংবা বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বিজ্ঞান কী বলছে?
বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব মূলত কিলোওয়াট-আওয়ার (kWh) বা ইউনিটে করা হয়। অর্থাৎ, কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র কত সময় ধরে কী পরিমাণ সক্রিয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে তার ভিত্তিতেই ব্যবহৃত ইউনিট নির্ধারিত হয়।
এ ধরনের ‘এনার্জি সেভার’ ডিভাইসের ভেতরে সাধারণত ক্যাপাসিটর, ছোট সার্কিট ও একটি এলইডি ইন্ডিকেটরের মতো সাধারণ উপাদান থাকে। ক্যাপাসিটর দিয়ে ‘পাওয়ার ফ্যাক্টর’ সংশোধনের প্রযুক্তি শিল্পকারখানায় বাস্তব ও কার্যকর হলেও সেটিকে বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ বিল ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমানোর উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। আবাসিক গ্রাহকের কিলোওয়াট-আওয়ার ব্যবহারের পরিমাণ এতে উল্লেখযোগ্য হারে কমে না।
আরও পড়ুন
বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে বাড়লো ১ টাকা ৫২ পয়সা
একই ধরনের ডিভাইস নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন স্বাধীন ফ্যাক্টচেক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে প্লাগ-ইন ‘পাওয়ার সেভার’ সাধারণ আবাসিক বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য মোটেও কার্যকর নয়। কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহারের কারণে এগুলো বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
‘পাওয়ার ফ্যাক্টর’ নিয়ে বিভ্রান্তি
এই প্রতারণার অন্যতম কৌশল হলো ‘পাওয়ার ফ্যাক্টর’ শব্দটির অপব্যবহার। বৈদ্যুতিক প্রকৌশলে পাওয়ার ফ্যাক্টর সংশোধনের জন্য ক্যাপাসিটর ব্যবহারের বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে, বিশেষ করে বড় শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
তবে শিল্পকারখানার পাওয়ার ফ্যাক্টর সংশোধনের বিষয়টিকে সাধারণ বাসার মাসিক বিদ্যুৎ বিল কমানোর সঙ্গে এক করে দেখানো যুক্তিযুক্ত নয়। সাধারণ গ্রাহকের ক্ষেত্রে একটি ছোট প্লাগ-ইন ক্যাপাসিটর লাগিয়ে ২০, ৩০ কিংবা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বিল কমানোর দাবি তাই চরম বিভ্রান্তিকর ও সন্দেহজনক।
বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য গ্রাহকদের যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় বাতি ও ফ্যান বন্ধ রাখা, দক্ষ বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার এবং এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) তাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নির্দেশনায় ব্যবহার শেষে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সুইচ বন্ধ রাখা, অপ্রয়োজনে লাইট-ফ্যান না চালানো, চার্জার ব্যবহারের পর সকেট থেকে খুলে রাখা, শক্তি সাশ্রয়ী আলো ব্যবহার এবং ফ্রিজ ব্যবহারে সচেতন হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি ডেসকোর ওয়েবসাইটেও গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহার ও খরচ নিয়ন্ত্রণে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতামূলক তথ্য দেওয়া রয়েছে।
সস্তা ডিভাইসে অগ্নিঝুঁকি
বিদ্যুৎ বিল কমানোর দাবি প্রমাণিত না হলেও নিম্নমানের কোনো বৈদ্যুতিক ডিভাইস সার্বক্ষণিক সকেটে লাগিয়ে রাখলে নিরাপত্তার বিষয়টি চরমভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। নিম্নমানের প্লাস্টিক, তার, ক্যাপাসিটর বা সার্কিটে ত্রুটি থাকলে অতিরিক্ত তাপ সৃষ্টি হয়ে শর্ট সার্কিট বা বড় ধরনের বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবেও এই ধরনের ‘পাওয়ার সেভার’ ডিভাইসের নিরাপত্তাঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
বাড়িতে মিটার নেই, তবুও এল ৬৯২ টাকার বিদ্যুৎ বিল
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অচেনা কোনো ডিভাইস সকেটে লাগানোর আগে এর বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদনের বিষয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
মিটারে কারসাজি করলে শাস্তি
বিদ্যুৎ বিল কমানোর নামে মিটার বা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের কারসাজি করা আরও গুরুতর অপরাধ। বিদ্যুৎ আইনে মিটার বা পরিমাপক যন্ত্রে হস্তক্ষেপ এবং অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
তাই কোনো বিজ্ঞাপনে মিটারের রিডিং কমানো, মিটার ‘ধীর’ করা বা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপের কথা বলা হলে গ্রাহকদের তা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তাহলে কীভাবে কমবে বিদ্যুৎ বিল?
বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ বিল কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যবহারের পরিমাণ কমানো। অপ্রয়োজনে এসি, ফ্যান, লাইট ও অন্যান্য যন্ত্র চালু না রাখা, শক্তি সাশ্রয়ী এলইডি ব্যবহার, এসির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমায় রাখা, পুরোনো ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎখেকো যন্ত্রের পরিবর্তে দক্ষ যন্ত্র ব্যবহার এবং প্রিপেইড মিটারে নিয়মিত ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করাই একমাত্র বৈজ্ঞানিক উপায়। ডেসকো তাদের নির্দেশনায় এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
অতএব ‘সকেটে লাগান, বিল ৩০ শতাংশ কমান’—এমন চটকদার বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস করার আগে পণ্যের বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন গ্রাহকরা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ফেসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার বা ভুয়া তথ্য দেখা যায়, যার সবগুলো তৎক্ষণাৎ বিটিআরসির নজরে আসে না। তবে কোনো বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তা বন্ধ বা সরানোর মতো হলে বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মকে (যেমন: ফেসবুক) অনুরোধ জানাতে পারে। এছাড়া বিষয়টি মূলতঃ বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেই বেশি সম্পৃক্ত।
বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) মনিটরিং সেলের নির্বাহী প্রকৌশলী এ.টি.এম রাসেল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এমইউ/এমকেআর
বিজ্ঞাপন