বিজ্ঞাপন
মো. গফুর হোসেন
দেশব্যাপী পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার যে কোনো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বাগত জানানোর মতো। সম্প্রতি ‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম ২০২৬’-এর আওতায় দেশের নির্বাচিত ১ হাজার ৫০০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বই কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা আমাদের মতো সৃজনশীল বই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে হয়তো দেশের লেখক, পাঠক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সৃজনশীল বই প্রকাশনার মধ্যে একটি নতুন সেতুবন্ধন তৈরি হবে। সৃজনশীল বই প্রকাশনা যখন নানা সংকট, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ চলছে; তখন সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারতো একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে বই কেনার ক্ষেত্রে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু লেখক ও প্রকাশকের বই-ই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সারাদেশে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার নামে সরকারি অর্থ ব্যয় করে যদি বারবার কেবল একটি নির্দিষ্ট বলয়ের লেখক ও প্রকাশকের বই কেনা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, এটি কি সত্যিই একটি সর্বজনীন জাতীয় পাঠাভ্যাস কর্মসূচি, নাকি রাষ্ট্রীয় অর্থের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে?
আরও পড়ুন
আলো ছড়াচ্ছে আদর্শ সমাজকল্যাণ গণপাঠাগার
আমরা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। আমরা চাই, প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য উত্তর। কারণ সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি জাতীয় কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠা যেমন স্বাভাবিক; তেমনই সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। বই নির্বাচন, ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাভাবিকভাবেই জানতে ইচ্ছা করে, এই কর্মসূচির জন্য বই নির্বাচন করেছেন কারা? কোন নীতিমালা ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে বইগুলো নির্বাচন করা হয়েছে? নির্বাচিত বইয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোথায়? তালিকায় স্থান পাওয়া বইগুলোর লেখক ও প্রকাশক কারা? বই নির্বাচনের জন্য কি কোনো কমিটি বা বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছিল? হয়ে থাকলে সেই কমিটিতে কারা ছিলেন, তাদের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিই বা কী ছিল? নির্বাচনের ক্ষেত্রে বইয়ের সাহিত্যমান, বিষয় বৈচিত্র্য, পাঠযোগ্যতা ও শিক্ষার্থীদের উপযোগিতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে, বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে লেখক ও প্রকাশকের পূর্ববর্তী সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক ভূমিকা কি কোনো ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি কর্মসূচিতে জনগণের জানার অধিকারকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যখন সরকারি অর্থে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে হাজার হাজার বই কেনা হচ্ছে; তখন বইয়ের তালিকা, লেখকের নাম, প্রকাশকের নাম, ক্রয় মূল্য এবং নির্বাচন ও ক্রয়ের পদ্ধতি, সবকিছুই জনসম্মুখে থাকা উচিত।
আরও পড়ুন
বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন ছোটবেলা থেকেই
বাংলাদেশের প্রকাশনা জগৎ কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এই দেশের অসংখ্য প্রকাশক বছরের পর বছর নিজেদের শ্রম, মেধা, অর্থ ও ঝুঁকি নিয়ে বই প্রকাশ করে আসছেন। তাদের মধ্যে কেউ প্রতিষ্ঠিত, কেউ নবীন, কেউ বড়, কেউ ছোট। তাই একটি জাতীয় পাঠাভ্যাস কর্মসূচিতে সবার জন্য ন্যায্য সুযোগ থাকা প্রয়োজন। একচোখা নির্বাচন নয়, প্রয়োজন বহুমাত্রিকতা। ব্যক্তিপছন্দ নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ মানদণ্ড। গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা নয়, প্রয়োজন সবার জন্য সমান সুযোগ।
কোনো একটি বলয়ের প্রতি আনুগত্য বা ঘনিষ্ঠতা যেন বই নির্বাচনের যোগ্যতার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই না কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে জাতীয় পাঠাভ্যাস কর্মসূচি পরিচালিত হোক। আমরা চাই, এই কর্মসূচি হোক বইয়ের জন্য, পাঠকের জন্য এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি ও প্রকাশক, রিদম প্রকাশনা সংস্থা।
এসইউ
বিজ্ঞাপন