বিজ্ঞাপন
বাজারে বিষযুক্ত ও বিষমুক্ত করলার একই দাম
ফলন বেশি, তবে লাভ কম হচ্ছে কৃষকদের
বাজারে বিষমুক্ত করলার আলাদা কর্নার করার দাবি
জমির আইলের চারপাশে নীল রঙের জালের বেড়া। ভেতরে বাঁশ ও জালের মাচা। মাচার ওপরে সবুজ লতা। নিচে থোকায় থোকায় ঝুলছে তরতাজা করলা। কিন্তু এই করলায় নেই কোনো কীটনাশক বা রাসায়নিক বিষ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় প্রথমবারের মতো উত্তম কৃষি চর্চা বা গ্যাপ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে সাড়া ফেলেছেন দুই কৃষক। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম পাওয়ায় হাসি নেই তাদের মুখে।
‘বিষমুক্ত ও বিষযুক্ত সবজির একই বাজার হওয়ায় সঠিক দাম মিলছে না। সমান দামে বিক্রি করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। আমরা চাই বাজারে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার হোক। তাহলে মানুষ বুঝে কিনতে পারবে। আমরাও ন্যায্য দাম পাব’—কৃষক
উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধলনগর গ্রামের জমারত আলীর ছেলে দবির উদ্দিন ফারাজী ও মৃত তোয়াজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল বারী তিন বিঘা জমিতে আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। গত ১০ দিনে দুই হাজার ২০০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন তারা। স্থানীয় বাজারে পাইকারি দর ছিল কেজি ৩০-৫৫ টাকা। এতে ৭০ হাজার টাকার মতো আয় হয়েছে তাদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে আরও চার হাজার কেজির বেশি করলা বিক্রির আশা করছেন তারা। যার বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
তবে দুই ভাইয়ের অভিযোগ, বাজারে বিষমুক্ত ও বিষযুক্ত সবজির আলাদা বাজার বা হাট নেই। ফলে সমান দামে বিক্রি হওয়ায় লাভবান হতে পারছেন না তারা। তাদের ভাষ্য, গতবছর এই সময়ে প্রতিকেজি করলা ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বর্তমান দাম তার অর্ধেক। গতবারের মতো দাম থাকলে কয়েক লাখ টাকা হাতে থাকত তাদের।
বাড়তি খরচ, দাম কম
শহর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরের ধলনগর মাঠে সরেজমিন দেখা যায়, পুরো জমি নীল রঙের নেট দিয়ে ঘেরা। পোকা-মাকড় দমনে ব্যবহার করা হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। মাটিতে দেওয়া হয়েছে জৈবসার। একজন পরিচর্যা করছেন ক্ষেতে। অপরজন তুলছেন করলা।
এসময় উদ্যোক্তা দবির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করতে খরচ বেশি। জাল, ফাঁদ, জৈব সার—সবই কিনতে হয়। কিন্তু ফলন ভালো, সবজিও স্বাস্থ্যকর। তবে ক্রেতারা বিষমুক্ত সবজির দাম দিতে চান না।’
‘গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করতে খরচ বেশি। জাল, ফাঁদ, জৈব সার—সবই কিনতে হয়। কিন্তু ফলন ভালো, সবজিও স্বাস্থ্যকর। তবে ক্রেতারা বিষমুক্ত সবজির দাম দিতে চান না’—কৃষক
তিনি জানান, তিন বিঘা জমিতে জমি চাষ, বীজ, উপকরণ ও পরিচর্যা বাবদ এক লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। বিপরীতে গত ১০ দিনে দুই হাজার ২০০ কেজি করলা উৎপাদন হয়েছে। প্রতিকেজি করলা পাইকারি ৩৫-৫৫ টাকা দরে ৬৫-৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আরও চার হাজার ৪০০ কেজি উৎপাদনের প্রত্যাশা তার।
দবির উদ্দিন ও আব্দুল বারীর স্বপ্ন, একদিন তাদের এই বিষমুক্ত করলা ঢাকা-কুষ্টিয়ার বড় বাজারে যাবে। ক্রেতারা লেবেল দেখে কিনবেন। দামও পাওয়া যাবে ন্যায্য।
আরেক উদ্যোক্তা আব্দুল বারী বলেন, ‘বিষমুক্ত ও বিষযুক্ত সবজির একই বাজার হওয়ায় সঠিক দাম মিলছে না। সমান দামে বিক্রি করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। আমরা চাই বাজারে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার হোক। তাহলে মানুষ বুঝে কিনতে পারবে। আমরাও ন্যায্য দাম পাব।’
তাদের অভিযোগ, গতবছর এই সময়ে করলার দাম ছিল ৭০-৮০ টাকা কেজি। এবার তা নেমে এসেছে ৩৫-৫৫ টাকায়। লোকসান হচ্ছে না, তবে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ খুবই কম হচ্ছে।
আরও পড়ুন
খাদ্যে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ মৌলভীবাজার কেন অন্য জেলার ভরসায়?
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বিষমুক্ত তিন বিঘাসহ এই উপজেলায় প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০০ টন করলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকারও বেশি। এখানে আধুনিক ও মালচিং পদ্ধতিতে করলার চাষ করা হচ্ছে।
ধলনগর গ্রামের কৃষক উজ্জ্বল চৌধুরী প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে হরেকরকম ফসলের চাষাবাদ করেন। তিনি জানান, গতবছর আট কাঠা জমিতে করলা চাষ করেছিলেন। প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ করে ৬০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। অল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় চলতি বছরে ১০ কাঠা জমিতে করলার চাষ করেছেন। গত এক সপ্তাহে ৯০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন। ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করবেন তিনি।
আরও পড়ুন
তামাক চাষ কেন জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘অশনিসংকেত’
একই গ্রামের মোহন শেখ জানান, গতবছর এক বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতি করলা চাষে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। চলতি বছর সমপরিমাণ জমিতে আগাম করলা চাষ করেছিলেন। প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচে তিনি দেড় লাখ টাকার করলা বিক্রি করে ভালেো লাভবান হয়েছেন। কৃষি প্রণোদনা পেলে আগামী বছর মালচিংসহ বিষমুক্ত করলা চাষ করতে চান।
উত্তম কৃষি চর্চা
উত্তম কৃষি চর্চা বা গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস হলো এমন কিছু পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষি পদ্ধতি, যার মূল লক্ষ্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা। পরিবেশের ভারসাম্য ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা। কৃষকদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ ও সুঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি করা।
আরও পড়ুন
সার নিয়ে ‘তুলকালাম’, সরকার বলছে ‘সংকট নেই’
আর মালচিং হলো এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে গাছের গোড়ায় বা মাটির উপরিভাগে খড়, পাতা, কচুরিপানা বা প্লাস্টিকের শিট দিয়ে একটি সুরক্ষা স্তর বা ঢাকনা তৈরি করা। যা আর্দ্রতা রক্ষা, আগাছা দমন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটির ক্ষয়রোধ ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে।
২০ শতাংশ জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে নাবিলা ও আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মাজেদ। তিনি বলের, চারা রোপণের ৪০ দিন পরই ফল ধরা শুরু হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচে ৫৫-৬০ মণ করলা উৎপাদন হচ্ছে। তবে গতবারের তুলনায় দাম কম থাকায় লাভ সীমিত।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে ত্বীন ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা কেমন?
পান্টি তহবাজারের আড়তদার মিলন হোসেন জানান, হাটে বিষমুক্ত সবজির আলাদা কর্নার নেই। ২০ দিন আগে ৫৫-৬০ টাকা কেজি করলা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে পাইকারি দাম ৩০-৩৫ টাকা।
যা বলছে কৃষি বিভাগ
উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বিল্টু হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে উত্তম কৃষি চর্চা এবং অবশিষ্ট জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করেছেন কৃষকরা। কম সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় শুধু ধলনগর গ্রামে প্রায় ২১ বিঘা জমিতে করলা চাষ হয়েছে। বাজারে পৃথক কর্নার করা গেলে বিষমুক্ত সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হতেন কৃষকরা।
আরও পড়ুন
কৃষকদের কাজে আসছে না মিনি হিমাগার
চলতি বছর উপজেলায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলা চাষ হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ মেট্রিক টন। বাজারদর হিসেবে যার মূল্য দেড় কোটি টাকারও বেশি।
কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, ‘গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করা সবজি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তবে বাজারজাতকরণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা দরকার। উপজেলা পর্যায়ে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা হাট বসানোর প্রস্তাব আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’
ব্যাপক হারে উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি হাটে বিষমুক্ত সবজির আলাদা কর্নার বসানোর আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার।
এসআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন