ব্রেকিং নিউজ
সাগর-রুনি হত্যায় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততার তথ্য মিললো ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৪ জনের মৃত্যু গাজীপুর সাফারি পার্কে মারামারির ঘটনায় মামলা, আসামী ৬ জন হবিগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত প্রায় সব ইউপিতে একাধিক প্রার্থী, দুশ্চিন্তা বিএনপিতে দেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে সাতশো ছাড়িয়ে গেছে, তিব্বতে আরেকটি হ্রদের সৃষ্টি হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি টাঙ্গাইলে পরিত্যক্ত বাড়িতে ১০ ঘোড়া জবাই, সাতটির মাংসের হদিস নেই গুমের সাথে জড়িত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি
প্রচ্ছদ

ভাইরাল গল্প ‘কবরের ঠিকানা’, কী লিখেছেন সোহেল আর রানা

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে সোহেল আর রানার ছোটগল্প ‘কবরের ঠিকানা’। গল্পটি প্রকাশের পর নেটিজেনরা প্রশংসা করেছেন। ২৩ আগস্ট লেখকের টাইমলাইনে পোস্ট করা গল্পটি এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৬০০ মানুষ টাইমলাইনে শেয়ার করেছেন। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য গল্পটি তুলে ধরা হলো: কবরের ঠিকানাসোহেল আর রানা আমাদের উঠানে একটা কবর আছে। কবরটা কার, আমি জানি না।জানি না, এই কথাটা মিথ্যা। আমি জানি কার। কিন্তু নামটা বললে বিপদ হতে পারে। তাই নাম বলি না। ​শুধু প্রতি বছর বর্ষার আগে কবরটার চারপাশের মাটি একটু উঁচু করে দিই। শ্যাওলা পরিষ্কার করি। কবরের মাথায় একটা বেলগাছ আছে। বেলগাছটা আমি লাগাইনি। যে মানুষটা এখানে শুয়ে আছে, সে লাগিয়েছিল। বৃক্ষটা বড় হয়েছে। মানুষটা বড় হয়নি। মানুষের কবর বড় হয় না। শুধু চারপাশের পৃথিবীটা ছোট হতে হতে একদিন তার ওপর এসে পড়ে। ​১৯৫০ সালে পাবনার চাটমোহর গ্রামে আমার জন্ম। তার আগের ইতিহাস আমি বাবার মুখে শুনেছি। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কথা বলতে গিয়ে বাবা একদিন বলেছিলেন, ‘ধান ছিল। কিন্তু মানুষের ঘরে ধান ছিল না।’​আমি বুঝিনি।​বলেছিলাম, ‘ধান থাকলে মানুষ না খাইয়া মরলো কেমনে?’বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘সব ক্ষুধা পেটের না, তাহের।’সেই কথাটাও তখন বুঝিনি। দেশভাগের কথাও বাবার কাছ থেকেই শুনেছি। তিনি বলতেন, ‘মানুষের মাথার উপর দাগ টানছিল।’আমি বলতাম, ‘কোথায়?’‘মাটির উপর।’‘দাগ দেখা যাইতো?’‘না।’‘তাইলে?’বাবা বলতেন, ‘যেদিন পাশের বাড়ির মানুষটা আর পাশের বাড়ির মানুষ রইল না, সেদিন দাগ দেখা গেল।’ ​আমাদের পাশের বাড়িতে তখন সেন পরিবার থাকতো। হিন্দু পরিবার। বাড়িতে তিনজন মানুষ। অরুণকুমার সেন। তার স্ত্রী সরলা। তাদের মেয়ে, মাধবী। আমরা ডাকতাম মাধু। মাধু আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট। একসঙ্গে বড় হয়েছি। পুকুরে সাঁতার। আমগাছে ওঠা। বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা। ​একদিন মাধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই বড় হইয়া কী হবি?’আমি বলেছিলাম, ‘বাবার মতো মাটি কাটবো।’সে হেসে বলেছিল, ‘মানুষ হবি না?’আমি বলেছিলাম, ‘মাটি কাটা মানুষ না?’সে মাথা নাড়ছিল—‘মানুষ হওয়া আলাদা জিনিস।’​তখন কথাটার মানে বুঝিনি। ​১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় সেই কথাটার মানে প্রথম বুঝতে শুরু করি। এক রাতে সেন পরিবার কলকাতা চলে গেল। খুব ভোরে। কোনো বিদায় ছিল না। কোনো কান্না ছিল না। শুধু কয়েকটা বস্তা। কিছু কাপড়। দুই তিনটা হাঁড়ি। আর মাধুর চোখ। যাওয়ার আগে সে আমাকে একটা ছোট কাঁসার বাটি দিয়ে বলেছিল, ‘রাখিস।’আমি বলেছিলাম, ‘ক্যান?’‘আমরা আবার আসবো। তুই আর আমি এই বাটিতে আমভর্তা খাবো।’‘কবে?’সে বলেছিল, ‘জানি না।’আমি বলেছিলাম, ‘তাইলে কেমনে জানলি আসবি?’মাধু চুপ করে ছিল। ​তারপর চলে গিয়েছিল। আমি অনেকদিন উঠানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, আজ বুঝি ওরা আসবে। ওরা আসেনি। জীবন অবশ্য থেমে থাকেনি। জীবন জীবনের নিয়মেই চলেছে। ​তারপর এলো ১৯৭১। এই গল্পের সবচেয়ে খারাপ অংশটা আমি বলতে চাই না। আমি তখন একুশ। আমাদের চাটমোহর গ্রামের অনেক তরুণ চলে গেল মুক্তিযুদ্ধে। কেউ গোপনে। কেউ প্রকাশ্যে। ​চাটমোহরের পাশ ঘেঁষে বাওনডাঙ্গা আর ডেমরা গ্রামে তখন পাকিস্তানি বাহিনী আর রাজাকারদের চরম তাণ্ডব। পুরো এলাকার হিন্দু পরিবারগুলোকে ধরে এনে বাওনডাঙ্গার বিলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হতো। পচে যাওয়া লাশগুলো ফেলে রাখা হতো খোলা মাঠে, যেখানে শকুনে খুঁটে খেতো আর কুকুরের দল লাশ নিয়ে টানাটানি করতো। মানুষের রক্তে ভিজে গিয়ে লাল হয়ে গিয়েছিল বিলের পানি। ​অরুণকুমার সেন তখন কলকাতায়। তিনি মুর্শিদাবাদের লালগোলা সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে তরঙ্গপুর ক্যাম্পে চলে তার সামরিক প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। জলঙ্গী নদী পার হয়ে তার দল রাতে ভাঙ্গুড়ার চরাঞ্চলে অপারেশন চালাতো। রাতে নৌকা চালানো, দিনে ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকা। একবার পাকিস্তানি সেনাদের একটা টহলদল খাসবাজারের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তখন অরুণকুমার সেনের দল কাছের এক খালে লুকিয়ে ছিল। একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার কাশি উঠেছিল। অরুণকুমার সেন তার মুখ চেপে ধরেছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। কেউ একজন বলেছিল, ‘ক্যা য়াঁ কোই হ্যায়?’ সেই কয়েক মিনিটে কেউ নড়েনি। পানি কোমর পর্যন্ত। জোঁক পায়ে। শ্বাস বন্ধ। তবু কেউ ওঠেনি। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর অরুণকুমার সেন নাকি বলেছিলেন, ‘আজ যদি একজনের কাশি আরেকজনের জীবন নেয়, তাহলে তার কোনো অধিকার নেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার।’ ​আরেকবার তারা গুহগ্রামের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজে আক্রমণ চালিয়েছিল। অরুণকুমার সেনের সঙ্গে থাকা ছেলেটার মাথায় গুলি লেগে পড়ে যায়। অরুণকুমার সেন তাকে কাঁধে তুলে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসেন। কয়েক মিনিট পর ছেলেটা মারা যায়। অরুণকুমার সেন নাকি বলেছিলেন, ‘ওরে আমি বাড়ি নিয়ে যেতে পারলাম না। কিন্তু দেশ স্বাধীন করেই ফিরবো।’ ​যুদ্ধের শেষ দিকে ঈশ্বরদী-বাঘাবাড়ী রোডে এক অভিযানে অরুণকুমার সেন গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন। বুকের নিচে গুলি। সহযোদ্ধারা তাকে চাটমোহরের সীমানা পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল। তারপর তিনি একাই যেতে চেয়েছিলেন। কারণ দল ধরা পড়লে সবাই বিপদে পড়বে। কীভাবে তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, সেটা আমি পুরো জানি না। ​শুধু এক বর্ষার সন্ধ্যায় আমার বাবা দরজায় এসে আমাকে বলেছিলেন, ‘তাহের, একজন মানুষ আইছে।’ ​আমি বাইরে গিয়ে দেখলাম, অরুণকুমার সেন। চেনা মুখ। কিন্তু চিনতে সময় লাগলো। দাড়ি। শুকনো মুখ। রক্তে ভেজা কাপড়। বুকের কাছে হাত চেপে ধরে আছেন।আমি বললাম, ‘অরুণ কাকা?’তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘তুই তো অনেক বড় হইছিস।’​আমি কিছু বলতে পারিনি। ​বাবা তাকে পেছনের ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন। তখনো আমি জানতাম না, মানুষটার শরীরে কতটা যুদ্ধ জমে আছে। পরের দুই দিন তার জ্বর উঠলো। বাবা ক্ষত পরিষ্কার করলেন। ওষুধ জোগাড় করলেন। কিন্তু গুলিটা ভেতরে ছিল। গ্রামে ডাক্তার নেই। পাবনা শহরে নেওয়া অসম্ভব। রাস্তা তখন নিরাপদ নয়। অরুণ কাকা মাঝে মাঝে জ্ঞান হারাতেন। আবার চোখ খুলতেন। একদিন আমাকে দেখে বললেন, ‘তাহের।’‘জি।’‘মাধু কেমন আছে?’আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। আমি বললাম, ‘জানি না।’তিনি চোখ বন্ধ করলেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘তুই দেখিস এই দেশটা স্বাধীন হবে, হতেই হবে।’ ডেমরা আর বাওনডাঙ্গায় দেখা নরকযন্ত্রণা অরুণ কাকাও জানতেন। রাজাকাররা সেখানে হিন্দুদের লাশ পুড়তে দিতো না, টেনে হেঁচড়ে বিকৃত করে ফেলে রাখতো। মৃতদেহও তাদের ঘৃণা থেকে রেহাই পেত না। অরুণ কাকা খুব আস্তে বলেছিলেন, ‘আমার শরীরটা যদি আগুনে দিস, দূর থেকে ধোঁয়া দেখা যাবে। যারা খুঁজতেছে, তারা বুঝবে। তোরা বিপদে পড়বি।’তিনি একটু থামলেন, ‘মাটিতে দিস।’আমি বললাম, ‘আপনার ধর্ম?’তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘মরার পর ধর্ম দিয়ে কী করবো?’​আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। ​তৃতীয় দিনের ভোরে অরুণকুমার সেন মারা গেলেন। খুব চুপচাপ। কোনো নাটক ছিল না। কোনো শেষ চিৎকারও না। বাবা আমাকে নিয়ে উঠানের একপাশে কবর খুঁড়লেন। হিন্দু মানুষকে মুসলমানের মতো দাফন করা আমাদের ধর্মের নিয়ম ছিল না। আমরা জানতাম। অরুণ কাকাও জানতেন। কিন্তু তখন ধর্মের নিয়মের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল লাশের নিরাপত্তা। আমরা অরুণ কাকাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দাফন করলাম। তার মুখ শেষবার দেখেছিলাম আমি। মনে হয়েছিল, মানুষটা ঘুমাচ্ছেন। কোনোদিন এই ঘুম ভাঙবে না। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘মানুষটা হিন্দু ছিল।’আমি বললাম, ‘জানি।’‘মনে রাখবি।’‘হ।’‘কিন্তু কবরের সামনে দাঁড়াইয়া ধর্মের কথা ভাববি না।’‘তাইলে কী ভাববো?’‘ভাববি, একজন মানুষ শুইয়া আছে।’তারপর বাবা আমার চোখের দিকে তাকালেন। গলার স্বর খুব শক্ত করে বললেন, ‘এই কবরের কথা কেউ জিগাইলে বলবি, আমার বাবার কবর।’আমি অবাক বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকালাম, ‘বাবা, তুমি?’বাবা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর বাজারের ব্যাগে একটা লুঙ্গি আর শার্ট তুলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। ​তারপর অনেকগুলো মাস কেটে গেল। বাবা ফিরলেন না। সেদিন বিকেলে অরুণ কাকার লাগানো বেলগাছটার পাশে আমি বসেছিলাম। চারিদিকে হৈহৈ রৈরৈ উঠলো। দেশ স্বাধীন হলো। ঢাকায় পতাকা টানালো। মানুষ রাস্তায় বের হলো। আমরা আনন্দ করলাম। সেই আনন্দের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। ​কয়েক বছর পর মাধুর খবর পেলাম। সে কলকাতায় আছে। বেঁচে আছে। বিয়ে করেছে। তার নিজের সংসার হয়েছে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। জীবন আবার তার স্বাভাবিক নিষ্ঠুরতায় ফিরে গেল। কিন্তু সংসার আমাকে আর টানলো না। একা রয়ে গেলাম। ততদিনে মানুষ যুদ্ধের গল্প বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেল। নতুন প্রজন্ম জন্ম নিলো। তারা জানতে চাইলো না কে কোথায় মারা গেছে। কে কার লাশ কাঁধে নিয়েছে। কার বাবা ফেরেনি। কার ভাই ফেরেনি। কার স্বামী ফেরেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের প্রয়োজন ছিল বেঁচে থাকা। স্মৃতি দিয়ে ভাত রান্না হয় না। ​তারপর একদিন, প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর, দুপুরে একজন বৃদ্ধা আমাদের উঠানে এসে দাঁড়ালেন। সাদা চুল। পাতলা শরীর। চোখে মোটা চশমা। সঙ্গে আরেকজন তরুণী। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।বৃদ্ধা বললেন, ‘এই বাড়ি কি তাহেরদের?’আমার বুকের ভেতর কিছু একটা থেমে গেল। আমি বললাম, ‘হ।’তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তুই তাহের?’আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি। শুধু বললাম, ‘মাধু?’সে হাসলো। খুব অল্প। কিন্তু আমি চিনে ফেললাম। মানুষের মুখ বদলায়। চোখ বদলায়। চুল বদলায়। কিন্তু কিছু হাসি বদলায় না। আমি বললাম, ‘তুই আসছিস?’সে বললো, ‘বাবার কবর দেখতে।’​আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। এত বছর পর সে বাবার কবর দেখতে এসেছে। আমি বললাম, ‘চল।’ সে আমার পেছনে হাঁটতে লাগলো। খুব আস্তে। উঠানের মাঝখান দিয়ে। তারপর বেলগাছটার সামনে এসে আমি থামলাম। মাধু থামলো না। আরও দুই পা এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। বেলগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল।‘এই গাছটা?’আমি বললাম, ‘তোর বাবা লাগাইছিল।’তার ঠোঁট কাঁপলো। সে গাছটার গায়ে হাত রাখলো। অনেকক্ষণ। তারপর বললো, ‘বাবা গাছ খুব ভালোবাসতো।’আমি বললাম, ‘জানি।’সে আমার দিকে তাকালো। ​সন্ধ্যার আগে মাধু চলে গেল। যাওয়ার সময় কবরটার দিকে ফিরে তাকালো। আমি ভাবলাম, সে হয়তো কিছু বলবে। সে কিছু বললো না। শুধু দুই হাত জোড় করে প্রণাম করলো। তারপর চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। সেদিন প্রথম বুঝলাম, কখনো কখনো মানুষ শুধু বাবার কবর খুঁজতে বর্ডার পেরিয়ে আসে না, সে আসে নিজের ভেতরের একটা খালি জায়গা পূরণ করতে। ​মাধু তার বাবাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেনি। কবরের মাটি নিতে পারেনি। কোনো হাড় নিতে পারেনি। শুধু বুকের খালি জায়গাটা পূরণ করে নিয়ে গেল। ​বছর তিনেক পর কলকাতা থেকে খবর এলো। মাধু অসুস্থ। তারপর একদিন খবর এলো, মাধু মারা গেছে। আমি খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। সন্ধ্যায় উঠানে এলাম। অরুণ কাকার কবরের পাশে বসে বললাম, ‘কাকা।’কোনো উত্তর এলো না। শুধু বেলগাছের পাতাগুলো নড়ছিল।আমি আবারও বললাম, ‘কাকা, মাধু মারা গেছে। সে আর কোনোদিন আসবে না।’পরক্ষণেই আমার মনে হলো, ‘আমার বাবাও আর কোনোদিন আসবে না।’আমি জানি না কেন, সেদিন আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। ​আজও বর্ষার আগে আমি কবরটার মাটি উঁচু করি। আমার হাত কাঁপে। কোদাল আগের মতো ওঠে না। কখনো হাঁপিয়ে যাই। তখন বেলগাছটার নিচে বসি। কবরটার দিকে তাকিয়ে থাকি। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কবরটা কার?’আমি এখন বলি, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার।’সে যদি আবার জিজ্ঞেস করে, ‘মুসলমান?’আমি বলি, ‘না।’‘হিন্দু?’আমি বলি, ‘হ।’ তারপর মানুষটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ সে জানে না, পৃথিবীর সব বড় বড় ইতিহাস রাজা-বাদশাদের নামে লেখা থাকলেও আসল ইতিহাস লেখা থাকে আমাদের উঠানের এই কবরটায়। যেখানে শ্মশানের আগুন আর গোরস্থানের মাটি এক হয়ে যায়। ধর্ম হেরে যায়, আর রক্ত দিয়ে কেনা একটা দেশের জন্য একজন হিন্দু বীর, একজন মুসলিম ভাইয়ের উঠানে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে। আরও পড়ুন উদয় রহমানের ভাইরাল গল্প ‌‘সুর’ নিয়ে কেন তোলপাড় এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>