ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গুলশান-বনানী লেক নিস্তব্ধ। অধিকাংশ মানুষের কাছে শুক্রবার মানে একটু বেশি ঘুম, একটু অবসর। কিন্তু একজন মানুষ ছোট্ট একটি চারাগাছ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। মাটি খুঁড়ে চারাটি সেখানে লাগিয়ে সেটির গোড়ায় পানি দেন। কাজটি শেষ করে আবার কাঁধে ক্যামেরা তুলে নেন। কারণ, কয়েক ঘণ্টা পরই হয়তো তাঁকে ছুটতে হবে এমন কোনো ঘটনাস্থলে, যেখানে ঘটছে কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা। এই মানুষটিই এস এম আরিফুল আমিন প্লাবন। পেশায় ফটোসাংবাদিক পরিচয়টি কিন্তু তাঁর পুরো জীবনকে ধারণ করে না। কারণ, দিনের এক অংশে তিনি সংবাদচিত্রের মানুষ, আর অন্য অংশে তিনি স্বেচ্ছাসেবক, বৃক্ষপ্রেমী, জলবায়ু-সচেতন নাগরিক এবং মানুষের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা একজন। ক্যামেরা তাঁর পেশা আর মানবিকতা পরিচয়।
আরিফুল আমিন প্লাবন একটি জাতীয় দৈনিকে ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। করোনা মহামারি, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, বাংলাদেশের রাজনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন-সমসাময়িক বাংলাদেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে তিনি বছরের পর বছর ধরে ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। সংবাদচিত্রের দৈনন্দিন ব্যস্ততার বাইরে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ডকুমেন্টেশন একজন আলোকচিত্রীর ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং বিষয়ের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের পরিচয় বহন করে।
২০২০ সালে করোনা মহামারিতে মানুষ ঘরবন্দী, হাসপাতালের সামনে আতঙ্ক। সেই সময়ে নিজের জন্মস্থান বগুড়ার ধুনট উপজেলায় দীর্ঘ সময় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী উদ্ধার, অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া, আক্রান্ত পরিবারের জন্য খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ, জীবাণুনাশক স্প্রে, মাস্ক ও পিপিই বিতরণ, প্রশাসনকে লকডাউন বাস্তবায়নে সহায়তা—কাজের তালিকা ছিল দীর্ঘ।
করোনা শেষ হয়েছে, কিন্তু আরিফুল আমিনের স্বেচ্ছাসেবী জীবন থেমে যায়নি। ধুনট উপজেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে ‘স্বপ্নসেবা’ সংগঠনের মধ্য দিয়ে নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঈদে নতুন পোশাক, নগদ সহায়তা, জীবিকা নির্বাহের জন্য গরু-ছাগল প্রদান—এসব উদ্যোগের লক্ষ্য একটাই; অসহায় মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করা।
এস এম আরিফুল আমিন প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘হেল্প দ্য নেশন’ নামের পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। গত এক দশকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তালবীজ রোপণ করেছেন। সেই বীজের অনেকগুলোই এখন পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হয়েছে। শুধু তাল নয়, কয়েক হাজার দেশীয় ফলদগাছও তিনি রোপণ করেছেন। দেশের যেখানেই যান, তাঁর সঙ্গে থাকে গাছের চারা কিংবা বীজ। যেন প্রতিটি সফরের স্মৃতি হিসেবে তিনি রেখে যেতে চান একটি নতুন গাছ।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com
এসব ছোট ছোট উদ্যোগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরিফুল আমিনের বড় দর্শন—পৃথিবীকে আগের চেয়ে একটু ভালো রেখে যাওয়া। গাছ লাগানো তাঁর কাছে শখ নয়, ভবিষ্যতের সঙ্গে এক নীরব চুক্তি। তালগাছের পাশাপাশি তিনি রোপণ করেছেন কয়েক হাজার দেশীয় ফলদ বৃক্ষ। তাঁর কাছে বৃক্ষরোপণ মানে শুধু সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনার একটি চেষ্টা। এই কাজের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। বন্যা ও নদীভাঙন এলাকার মানুষ হিসেবে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্রকৃতির রুদ্ররূপ। দেখেছেন, কীভাবে নদী মানুষের বসতভিটা কেড়ে নেয়, কীভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন একটি পরিবারের জীবিকা বদলে দেয়। তাই চরাঞ্চল তাঁর পরিবেশ আন্দোলনের বিশেষ ক্ষেত্র। সেখানে গাছ লাগানো মানে শুধু সবুজ বাড়ানো নয়; ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিকে আরও টেকসই করার ধারাবাহিক চেষ্টা।
সম্প্রতি প্লাবন বিলুপ্তপ্রায় করঞ্জগাছের পাঁচ শ বীজ সংগ্রহ করেছেন। সেগুলো থেকে চারা উৎপাদনের কাজ চলছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, দেশি গাছের এসব চারা একদিন আবার সব জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। পরিবেশ নিয়ে তাঁর কাজ শুধু বৃক্ষরোপণে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। আহত কিংবা বিপদে পড়া বন্য প্রাণী উদ্ধারের কাজেও নিয়মিত অংশ নেন।

ঢাকায় প্রতি শুক্রবার ভোরে ৫৫ কদমতলা সংগঠনের সঙ্গে গুলশান-বনানী লেক এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও প্লাবনের নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায়। সপ্তাহের অন্য ছয় দিন সংবাদ সংগ্রহের ব্যস্ততা থাকলেও ছুটির দিনটি তিনি প্রকৃতির জন্য উৎসর্গ করেন। তিনি চান, আমাদের সন্তান এমন এক পৃথিবীতে বড় হয়ে উঠুক, যেখানে বাতাস একটু বেশি নির্মল, গাছ একটু বেশি সবুজ, প্রকৃতি একটু বেশি নিরাপদ।
এই চিন্তা থেকেই মাত্র এক মাস বয়স থেকেই নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত বিশটি গাছ লাগোনোর কর্মসূচি শুরু করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগের নাম দিয়েছেন-‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’। এটি তাঁর কোনো ঘোষণা নয়, প্রতীকী অঙ্গীকার। একজন বাবার পক্ষ থেকে নিজের সন্তানের জন্য রেখে যাওয়া সবুজ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে গাছ লাগানোর সেই দৃশ্য আসলে একটি পরিবারের গল্পের চেয়েও বড় কিছু। এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দায়িত্ববোধের উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার গল্প।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>