জাতীয়

যে সিনেমা আনোয়ার হোসেনকে বানিয়েছিল ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘নবাব’

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের নাম চিরস্মরণীয়। দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে প্রায় সাড়ে তিনশ সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলেও একটি চরিত্রই তাকে দর্শকের কাছে চিরস্থায়ীভাবে পরিচিত করে তোলে-নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করে রাতারাতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান আনোয়ার হোসেন। তার অসাধারণ অভিনয়ে ফুটে ওঠে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার দেশপ্রেম, বেদনা, আত্মমর্যাদা ও পরিণতির করুণ অধ্যায়। এই সিনেমার পরই দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ঢাকাই সিনেমার ‘নবাব’ হিসেবে। তবে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছিল তার অভিনয়জীবনের শুরু নয়। এর অনেক আগেই মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার মুরুলিয়া গ্রামের মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ার হোসেন। তার বাবা এ কে এম নাজির হোসেন ছিলেন জেলা সাব-রেজিস্ট্রার। ১৯৪০ সালে দেওয়ানগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৫১ সালে জামালপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন ময়মনসিংহ কলেজে। আরও পড়ুন জেমসের সঙ্গে দেখা হতেই পা ছুঁয়ে সালাম রূপমের কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে অভিনয় করেন আনোয়ার হোসেন। এরপর থেকেই নাটকের প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে বাবার বন্ধু আবদুল্লাহ খানের ‘সেলকন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ফার্মে সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। ১৯৫৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ননী দাসের পরিচালনায় ‘এক টুকরো জমি’ নাটকে অভিনয় করেন। পরে ঢাকা বেতারে অডিশন দিয়ে নির্বাচিত হয়ে ‘হাতেম তাই’ নাটকে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সুবাদে আব্দুল জব্বার খান, মোহাম্মদ আনিস ও হাবিবুর রহমানসহ অনেক গুণীজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে ঝিনুক পত্রিকার সম্পাদক আসিরুদ্দিনের সহযোগিতায় মিনার্ভা থিয়েটার গড়ে তোলেন আনোয়ার হোসেন। এই নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম, ফতেহ লোহানী, মেহফুজ, সুভাষ দত্ত ও চিত্রা সিনহাসহ অনেকে। ১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ সিনেমায় ভিলেনের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। এরপর সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ সিনেমায় নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৮টি সিনেমায় কাজ করেন তিনি। তবে ১৯৬৭ সালে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় অভিনয় তার ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ঐতিহাসিক এই চরিত্রে আনোয়ার হোসেন এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন যে, নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে তার নামটিও যেন একাকার হয়ে যায়। তার অভিনয়ে সিরাজের দেশপ্রেম ও যন্ত্রণা দর্শকের মনে গভীর রেখাপাত করে। আরও পড়ুন রুমি কারিমকে ঘিরে জয়ের মন্তব্য, বললেন ‘হিরো আলমই ভালো ছিল’ এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আনোয়ার হোসেনকে। ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সাহিত্যনির্ভর, শিশুতোষ, লোককাহিনিভিত্তিক, ফ্যান্টাসি, সামাজিক ও পারিবারিক গল্পের সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন তিনি। সালাহউদ্দিন, খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, আমজাদ হোসেন, ইবনে মিজান, আলমগীর কবির, কামাল আহমেদ, জহির রায়হান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, সুভাষ দত্ত, নজরুল ইসলাম, আজিজুর রহমান, মোস্তফা মেহমুদ, এ জে মিন্টু, চাষী নজরুল ইসলাম ও কাজী হায়াৎসহ দেশের বহু খ্যাতিমান পরিচালকের সিনেমায় অভিনয় করেছেন এই অভিনেতা। ‘সূর্যস্নান’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘জয় বাংলা’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘পালঙ্ক’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘নাজমা’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘সূর্যসংগ্রাম’, ‘দায়ী কে’ ও ‘সত্য মিথ্যার’ মতো উল্লেখযোগ্য সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকের মনে আজও অমলিন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রায় ৩৫০টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন আনোয়ার হোসেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন নিগার পুরস্কার। ১৯৮৫ সালে তাকে দেওয়া হয় একুশে পদক। এছাড়া দুবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে। ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আনোয়ার হোসেনকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও ঢাকাই চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেনের অবদান মুছে যাওয়ার নয়। বিশেষ করে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় তার অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। যে চরিত্র তাকে ‘নবাব’ বানিয়েছিল, সেই অভিনয়ের মধ্য দিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন আনোয়ার হোসেন। এমএমএফ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>