বিজ্ঞাপন
একবিংশ শতাব্দীতে এসে অনেকেই হয়তো কল্পনা করতে পারবেন না অতীত কেমন ছিল। আদিকাল থেকে বর্তমান নানান উত্থান-পতন, গল্প-ইতিহাস, শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে গেছে। এ যাপতকালে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসক এসেছেন। শাসন করেছেন, কেউ বা ছিলেন প্রজাদের রক্ষাকর্তা, কেউ বা রক্ষক থেকে হয়েছেন ভক্ষক।
তবে এই শাসকদের জীবনও কম ইতিহাসময় নয়। যেমন ধরুন রানি প্রথম এলিজাবেথের কথাই ধরুন। রানি প্রথম এলিজাবেথ, এই নামটির সঙ্গে মিশে আছে একজন সফল শাসকের ইতিহাস। তার সময়ে ইংল্যান্ডের মানুষ সবচেয়ে সুখের সময় কাটিয়েছে। তবে বিতর্ক কখনোই পিছু ছাড়েনি রানির। সারাজীবন ছিলেন একজন কুমারী। বিয়ে তো দূরের কথা কোনো পুরুষের সঙ্গে কখনো মেশেননি তিনি। যে কারণে তিনি নারী কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
প্রথম এলিজাবেথ ১৫৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লন্ডনের গ্রিনউইচে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন অষ্টম হেনরি এবং মা তার দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলিন। শৈশব থেকেই তার জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। তার যখন মাত্র দুই বছর বয়স তখন তার মা অ্যান বোলেনকে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দেন তার বাবা রাজা হেনরি অষ্টম। এরপর তিনি পালিত হয়েছেন সেবিকাদের কাছে। কিছুদিন সৎ মায়ের কাছেও পালিত হয়েছেন।
১৫৩৭ সালে সৎভাই এডওয়ার্ডের জন্মের পর তিনি সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী হন। যদিও রোমান ক্যাথলিকরা তাকে অবৈধ সন্তান মনে করত। ১৫৫৪ সালে রানি মেরির বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের পর তিনি অল্পের জন্য মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পান।
১৫৫৮ সালের নভেম্বরে সৎবোন মেরির মৃত্যুর পর এলিজাবেথ ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত এবং পাঁচটি ভাষায় সাবলীল ছিলেন। তার মধ্যে ছিল বুদ্ধিমত্তা, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা। যা একজন শাসক হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তার ছাপও রেখেছিলেন তিনি বাস্তবে।
তার ৪৫ বছরের শাসনকাল ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। তার শাসনামলে চার্চ অব ইংল্যান্ড সুসংহত হয়। ১৫৬৩ সালের ৩৯টি ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট (খ্রিস্টধর্মের একটি প্রধান শাখা) মতবাদের মধ্যে একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। এই ধর্মীয় সমঝোতা ইংল্যান্ডকে ফ্রান্সের মতো দীর্ঘ ধর্মীয় যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এলিজাবেথ ছিলেন কখনো স্বৈরাচারী ও খামখেয়ালি। তবে তার রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ। তিনি দক্ষ মন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন উইলিয়াম সেসিল (লর্ড বার্লি), স্যার ক্রিস্টোফার হ্যাটন ও স্যার ফ্রান্সিস ওয়ালসিংহ্যাম।
তার শাসনামলে ফ্রান্সিস ড্রেক, ওয়াল্টার র্যালি ও হামফ্রে গিলবার্ট-এর মতো অভিযাত্রীরা আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রযাত্রা করেন। এসব অভিযান ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ উপনিবেশ স্থাপন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ তৈরি করে। ১৫৯৯ সালের শেষ দিকে এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেন।
এ সময় ইংল্যান্ডে শিল্প-সংস্কৃতিরও ব্যাপক বিকাশ ঘটে। লংলিট ও হার্ডউইক হল নির্মিত হয়, চিত্রশিল্প ও থিয়েটারের প্রসার ঘটে। শেক্সপিয়ারের ‘এ মিডসামার নাইটস ড্রিম’ নাটকের প্রথম মঞ্চায়নে এলিজাবেথ উপস্থিত ছিলেন। উইলিয়াম বার্ড ও থমাস ট্যালিসের মতো সুরকাররাও তার দরবারে কাজ করতেন।
এলিজাবেথের শাসনামলের অন্যতম বড় সংকট ছিল স্পেনের সঙ্গে সংঘাত। ১৫৬৯-৭০ সালে উত্তর ইংল্যান্ডে বিদ্রোহ হয় এবং ১৫৭০ সালে পোপ এলিজাবেথের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তার প্রজাদের আনুগত্য থেকে মুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর রানি রোমান ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন।
এ সময় স্কটল্যান্ডের রানি মেরি এলিজাবেথের জন্য বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে ওঠেন। ১৫৬৮ সালে ইংল্যান্ডে পালিয়ে আসার পর মেরি ১৯ বছর এলিজাবেথের বন্দি ছিলেন। ১৫৮৬ সালের ব্যাবিংটন ষড়যন্ত্রে তার নাম জড়ালে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং ১৫৮৭ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
১৫৮৮ সালে স্প্যানিশ আর্মাডার পরাজয় এলিজাবেথের শাসনামলের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। প্রায় ১৩০টি জাহাজ নিয়ে স্পেন ইংল্যান্ড আক্রমণ করেছিল। খারাপ আবহাওয়ার সহায়তায় ইংরেজ নৌবাহিনী স্প্যানিশ আর্মাডাকে পরাজিত করে। এই বিজয় ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও শক্তি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
তবে এলিজাবেথের শাসনামলে অর্থনৈতিক সংকটও ছিল। বিশেষ করে ১৫৯০-এর দশকে উচ্চ মূল্য ও অর্থনৈতিক মন্দায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। স্পেনের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধও ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তার শাসনামলের যুদ্ধগুলোতে তৎকালীন মূল্যে ৫০ লাখ পাউন্ডের বেশি খরচ হয়েছিল এবং উত্তরসূরির জন্য তিনি বড় ঋণ রেখে যান।
রানি ছিলেন যেমন মেধাবী তেমনি রূপবতী। এলিজাবেথ কখনো বিয়ে করেননি। বিদেশি রাজপুত্রকে বিয়ে করলে ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি প্রভাবিত হতে পারত, আর কোনো ইংরেজকে বিয়ে করলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারত। তাই তিনি বিয়ের সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করেন। ‘ভার্জিন কুইন’ হিসেবে তাকে এমন এক নারী হিসেবে তুলে ধরা হয়, যিনি ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়ে দেশকে নিজের জীবনের কেন্দ্র করে তুলেছিলেন।
১৬০১ সালের ‘গোল্ডেন স্পিচ’-এ তিনি পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন হলো তার প্রজাদের ভালোবাসা। তিনি তার শাসনামলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
কিন্তু রানি যে বিয়ে করেননি তার পেছনে আরেকটি গুজব বা বিতর্ক ছিল। অনেকেই মনে করতেন-রানি যে নারী নন, পুরুষ এবং তিনি যে রাজা হেনরি অষ্টম এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলেনের আসল কন্যা এলিজাবেথ নন, এ কথাও একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ডজুড়ে। ১৮০০ শতকে বিসলেতে একটি কফিন আবিষ্কার করেন একজন ধর্মগুরু। যিনি দাবি করেন কফিনে থাকা মৃতদেহটি রেনেসাঁর উচ্চ-শ্রেণির কোনো অল্পবয়সী মেয়ের। তার পরনের পোশাক ছিল সে সময়ের অত্যন্ত দামি। যা ওয়ি গ্রামের কোনো মেয়ের পরার কথা না। আবার সেই মেয়ের চুল ছিল লালচে। যা থেকে ধারণা করা হয় সেই কফিনে রানি এলিজাবেথের মৃতদেহই ছিল। যা গোপনে তার সেবিকা কবর দিয়েছিলেন।
এই মিথের জোড়ালো হওয়ার আসল কারণ হলো, এলিজাবেথের বয়স ১০ বছর তখন ইংল্যান্ডে বুবোনিক প্লেগের মহামারি শুরু হয়েছিল। যার কারণে অনেক মানুষ মারা যায়। রাজা হেনরি তার মেয়েকে বাঁচাতে সৈন্য সামন্তসহ পাঠিয়ে দেন বিসলে নামে একটি গ্রামে। সেখানেই থাকতে শুরু করে ছোট্ট এলিজাবেথ। তবে তিনি কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে মারা যান। যা রাজার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে তার সেবিকা।
প্লেগের প্রাদুর্ভাব কেটে যাওয়ার পর রাজা তার মেয়েকে আনতে যান। এ খবর শুনে আকাশ ভেঙে পরে সেই সেবিকার মাথায়। নিজেকে বাঁচাতে তিনি এক সিদ্ধান্ত নেন। রাজাকে তার মেয়ের মৃত্যুর কথা কিছুতেই জানাবেন না। এতে তার জীবনটাই হারাতে হবে। লাল চুলের কোনো মেয়েকে রাজকন্যা এলিজাবেথ সাজাবেন। কিন্তু এমন কোনো মেয়েকেই গ্রামে খুঁজে পাননি। শেষ পর্যন্ত একটি ছেলেকে রাজকন্যা এলিজাবেথের পোশাক ও পরচুলা পরিয়ে নিয়ে যান রাজার সামনে।
এলিজাবেথ নারী নন পুরুষ। এই প্রমাণের কখনো চেষ্টাই করেননি তিনি। এই বিশ্বাস তার প্রজাদের মধ্যে আরও জোড়ালো হয় তখন, যখন তিনি বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে থাকেন একের পর এক এবং ১৫৫৮ সালে সিংহাসনে বসার পর প্রথম এলিজাবেথ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিয়ে করবেন না। এছাড়া নির্বাচিত কয়েকজন দাসী ছাড়া তার কক্ষে কেউ ঢুকতে পারত না। তার বিশ্বস্ত কয়েকজন চিকিৎসকই কেবল তার চিকিৎসা করতেন। তিনি জনসম্মুখে পরচুলা পরতেন। এছাড়া তার মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করা নিষেধ ছিল কঠোরভাবে। লেখক স্টিভের দাবি, এই সত্য শুধু জানতেন এলিজাবেথের চিফ মিনিস্টার উইলিয়াম সেসিল। সেসিল অবশ্য শেষ দিন পর্যন্ত সেই রহস্য ফাঁস করেননি। স্টিভের মতে, এর কারণটা ছিল সত্যিটা ফাঁস হয়ে গেলে ব্রিটেনে গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ত। কারণ টিউডর বংশের উত্তরাধিকারি হিসেবে তখন সে অর্থে সিংহাসনের আর কেউ দাবিদার নেই। তাই বাধ্য হয়েই মুখ বন্ধ রেখেছিলেন সেসিল।
স্টিভ তার বইতে আরও দাবি করেন, লন্ডনে ফেরার পর যখন ফের লেখাপড়া শুরু করেন কিশোরী এলিজাবেথ, তখন তার স্বভাব, আচরণের পরিবর্তন দেখে প্রচণ্ড বিস্মিত হন তার গৃহশিক্ষক। এমনকি নরম, পেলব এলিজাবেথের শারীরিক গড়ন পাল্টে পুরুষালি হতে থাকে। এলিজাবেথের আগের ও পরের ছবির মধ্যে সেই ফারাক স্পষ্ট।
তবে অনেক ইতিহাসবিদ এই যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন। যে রাজা গোটা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শাসন করেছেন তিনি তার নিজের মেয়েকে চিনতে পারবেন না তা কিছুতেই হতে পারে না। এছাড়া রানির শারীরিক গড়ন ছিল মেয়েদের মতোই। রানির অন্যান্য নারীদের মতোই নিয়মিত পিরিয়ড হতে বলে তার চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন তার মৃত্যুর পর।
সে যাই হোক আজ রানি প্রথম এলিজাবেথের জন্মদিন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন খুবই সাধাসিদে। নাটক, নাচ খুব ভালোবাসতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তার ফ্যাশনে বেশ সচেতন ছিলেন। তিনি গহনা এবং চমৎকার পোশাক পছন্দ করতেন এবং তার পোশাকগুলো প্রায়শই সোনা এবং রৌপ্য দিয়ে তৈরি ছিল। তিনি মেকআপের সাহায্যে একটি আকর্ষণীয়ভাবে ফ্যাকাশে চেহারা অর্জন করেছিলেন। তার এই আকর্ষণীয় চেহারা এবং রূপচর্চা নিয়েও আছে নানান বিতর্ক।
তিনি চেহারাকে ধূসর, সাদা ও আরও সুন্দর করে তুলতে মুখে জোঁক লাগিয়ে রাখতেন। জোঁকেরা মুখ থেকে রক্ত চুষে নিতো। ফলে রক্তহীনতায় মুখ হয়ে যেত ফ্যাকাশে। কথিত আছে, চারশো বছর আগেই রূপচর্চার কারণে মারা যান রানি প্রথম এলিজাবেথ। নিখুঁত মেকআপের বহরই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল রানিকে। এ তথ্য একেবারেই মনগড়া নয়। চিকিৎসক এবং ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণই ইঙ্গিত দেয় এমনটার।
১৬০৩ সালের ২৪ মার্চ রিচমন্ড প্যালেসে এলিজাবেথের মৃত্যু হয়। জীবদ্দশাতেই তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হন। তার মৃত্যুর পর স্কটল্যান্ডের ষষ্ঠ জেমস ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসে প্রথম জেমস নামে রাজত্ব শুরু করেন। এভাবেই টিউডর (ইংল্যান্ডের একটি বিখ্যাত রাজবংশ, যারা ১১৮ বছর দেশটি শাসন করেছিল) রাজবংশের অবসান ঘটে।
সূত্র: দ্য রয়েল ফ্যামেলি, হিস্টোরি মিস্টেরিয়াস
কেএসকে
বিজ্ঞাপন