কল্পনা করুন, রাতে আপনি রাস্তায় বা পার্কে হাঁটতে বের হয়েছেন। মাথার ওপর স্ট্রিটলাইট জ্বলছে, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দারুণ একটা এস্থেটিক পরিবেশ! মনে হতে পারে, এই মুহূর্তে স্ট্রিটলাইটের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারলে মন্দ হয় না। কিন্তু জানেন কি, আমাদের কাছে যা চমৎকার পরিবেশ বলে মনে হয়, রাস্তার পাশের গাছগুলোর জন্য তা ক্ষতিকর?
রাতে রাস্তার বাতির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে দেখে মনে হতে পারে, গাছগুলো নিশ্চিন্তে রাত কাটাচ্ছে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা এত সহজ নয়। দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার উভয়ই গাছের জীবনযাত্রার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মতো গাছও দিন-রাতের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের নানা শারীরবৃত্তীয় কাজের সময় মিলিয়ে নেয়। সূর্যের আলো ওঠা-নামার এই নিয়মিত চক্রকে বলা হয় আলোকপর্যায় বা ফটোপিরিয়ড। কৃত্রিম আলো এই চক্রে বাধা দিলে গাছের ফুল ফোটা, কুঁড়ি গজানো, পাতা ঝরা, বৃদ্ধি, এমনকি রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মানুষের মতো গাছও দিন-রাতের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের নানা শারীরবৃত্তীয় কাজের সময় মিলিয়ে নেয়। সূর্যের আলো ওঠা-নামার এই নিয়মিত চক্রকে বলা হয় আলোকপর্যায় বা ফটোপিরিয়ড।
শহরে এখন রাত পুরোপুরি অন্ধকার থাকে না। রাস্তা, অফিস, পার্ক, খেলার মাঠ কিংবা বিজ্ঞাপনের বোর্ড—সবখানেই রাতভর আলো জ্বলতে দেখা যায়। মানুষের জন্য এসব আলো সুবিধাজনক হলেও শহরের গাছপালার জন্য তা সব সময় সুখবর নয়।

প্রাকৃতিকভাবে রাতে চাঁদ, তারা ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু থেকে সামান্য আলো আসে। কিন্তু মানুষের তৈরি অতিরিক্ত আলোর কারণে রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার কমে গেলে একে বলা হয় আলোকদূষণ। বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার আলোকদূষণের মধ্যে বাস করে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এই হার প্রায় ৯৯ শতাংশ, এশিয়ায়ও তা দ্রুত বাড়ছে।
প্রাকৃতিকভাবে রাতে চাঁদ, তারা ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু থেকে সামান্য আলো আসে। কিন্তু মানুষের তৈরি অতিরিক্ত আলোর কারণে রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার কমে গেলে একে বলা হয় আলোকদূষণ।
গাছের ঘুমানোর জন্য দিন-রাতের পরিবর্তন দরকার—বিষয়টা ঠিক এমন নয়। বরং আলো ও অন্ধকারের দৈর্ঘ্য দেখে গাছ তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ঠিক করে। গাছের কোষে থাকা বিভিন্ন জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সার্কাডিয়ান ঘড়ি। প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই জৈবিক ছন্দের সঙ্গে গাছের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা ও নানা প্রক্রিয়া সমন্বিত থাকে। দিনের আলোয় গাছ সালোকসংশ্লেষণ করে। আবার রাতে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে কোষের ডিএনএ প্রতিলিপি তৈরির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে।

আলো চিনতে গাছের শরীরে রয়েছে ফাইটোক্রোম নামের বিশেষ রঞ্জক। এটি মূলত দুটি অবস্থায় থাকতে পারে—একটি নিষ্ক্রিয় রূপ, যাকে বলা হয় ‘Pr’ (Red) এবং একটি সক্রিয় রূপ, যাকে বলা হয় ‘Pfr’ (Far-red)। আলো পড়লে Pr রূপান্তরিত হয় Pfr-এ। আবার অন্ধকারে Pfr ধীরে ধীরে Pr-এ ফিরে যায়। এই দুই রূপের অনুপাতের ওপর কুঁড়ি গজানো ও ফুল ফোটার মতো অনেক প্রক্রিয়া নির্ভর করে। দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য ঋতুভেদে বদলায়। গাছও সেই পরিবর্তন বুঝে নিজের জীবনচক্র সাজায়। তাই রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কৃত্রিম আলো জ্বলে উঠলে গাছের কাছে যেন দিনের হিসাবটাই বদলে যায়।
গাছের কোষে থাকা বিভিন্ন জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সার্কাডিয়ান ঘড়ি। প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই জৈবিক ছন্দের সঙ্গে গাছের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা ও নানা প্রক্রিয়া সমন্বিত থাকে।
সন্ধ্যার পর অনেক গাছের পাতা বা ফুল বন্ধ হয়ে যায়। ক্লোভার, টিউলিপ কিংবা প্রেয়ার প্ল্যান্টের মতো উদ্ভিদের পাতা রাতে ভাঁজ হয়ে যেতে দেখা যায়। দেখে মনে হতে পারে, গাছ বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনও গাছের এই আচরণে আগ্রহী ছিলেন।

১৮৮০ সালে ছেলে ফ্রান্সিস ডারউইনের সঙ্গে লেখা দ্য পাওয়ার অব মুভমেন্ট ইন প্ল্যান্টস বইয়ে তিনি উদ্ভিদের রাতের এই নড়াচড়াকে স্লিপ মুভমেন্টস বা ঘুমের মতো নড়াচড়া হিসেবে বর্ণনা করেন।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এই আচরণকে বলেন নিকটিন্যাস্টি। তবে এটি প্রাণীর ঘুমের মতো নয়। গাছের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র কিংবা চোখের পাতা নেই। পাতার গোড়ায় থাকা পালভিনি নামে ছোট, স্ফীত অংশের কোষে পানির পরিমাণ পরিবর্তনের কারণে পাতা ওঠানামা করে। রাতে একপাশের কোষ থেকে পানি বেরিয়ে গেলে পাতা নুয়ে পড়ে; আবার পানি ফিরে এলে পাতা উঠে যায়।
রাতে সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ থাকলেও গাছ কিন্তু নিষ্ক্রিয় থাকে না। দিনের আলোয় তৈরি করা শর্করা ব্যবহার করে তখন শ্বসন, বৃদ্ধি ও কোষ মেরামতের মতো কাজ চলে। অর্থাৎ গাছ রাতেও ব্যস্ত থাকে।
১৮৮০ সালে ছেলে ফ্রান্সিস ডারউইনের সঙ্গে লেখা দ্য পাওয়ার অব মুভমেন্ট ইন প্ল্যান্টস বইয়ে তিনি উদ্ভিদের রাতের এই নড়াচড়াকে স্লিপ মুভমেন্টস বা ঘুমের মতো নড়াচড়া হিসেবে বর্ণনা করেন।
শহর ও শহরতলিতে কৃত্রিম আলো দিন-রাতের স্বাভাবিক ছন্দ বদলে দেয়। তীব্র আলো থাকলে কোনো কোনো উদ্ভিদ রাতেও সালোকসংশ্লেষণ চালিয়ে যেতে পারে। এতে কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হতে পারে, এমনকি কোষ মারাও যেতে পারে।
বিশেষ করে স্বল্পদিবসী উদ্ভিদ এ ক্ষেত্রে বেশি সংবেদনশীল। তারা মূলত দীর্ঘ রাত বা একটানা অন্ধকারের ওপর নির্ভর করে ফুল ফোটায়। রাতে সামান্য কৃত্রিম আলোও তাদের ফুল ফোটার সময় পিছিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিবসী উদ্ভিদ (যেমন পালংশাক ও মুলা) রাতের অতিরিক্ত আলোর কারণে স্বাভাবিক সময়ের আগেই ফুল বা বীজ ধরার দিকে ধাবিত হতে পারে। টমেটো ও শসার মতো দিন-নিরপেক্ষ উদ্ভিদ অবশ্য দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল।

যুক্তরাজ্যে ১৩ বছর ধরে চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের কৃত্রিম আলোয় আলোকিত এলাকায় পাতাঝরা গাছের কুঁড়ি অন্য এলাকার তুলনায় গড়ে ৭.৫ দিন আগে ফুটেছে। অর্থাৎ রাস্তার বাতির আলো গাছের ঋতুভিত্তিক জীবনচক্রও বদলে দিতে পারে। কিছু ক্যাকটাস আবার শুধু রাতেই ফুল ফোটায়। সারা রাত কৃত্রিম আলোয় থাকলে এসব ক্যাকটাসের ফুল ফোটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যে ১৩ বছর ধরে চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের কৃত্রিম আলোয় আলোকিত এলাকায় পাতাঝরা গাছের কুঁড়ি অন্য এলাকার তুলনায় গড়ে ৭.৫ দিন আগে ফুটেছে।
রাতের কৃত্রিম আলো গাছের পাশাপাশি নিশাচর পতঙ্গদেরও প্রভাবিত করে। যেমন, মথ গুরুত্বপূর্ণ একটি পরাগবাহক। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোয় আলোকিত এলাকায় মথের মোট সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। স্ট্রিটলাইট মথকে আকৃষ্ট করে। ফলে ফুলের কাছে যাওয়ার বদলে তারা বাতির চারপাশে ঘুরতে থাকে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মথের মাত্র ২৩ শতাংশের শরীরে পরাগ পাওয়া গেছে। এতে ফুলে পরাগ পৌঁছানোর হার এবং গাছে ফল ধরার হারও কমে যায়। কৃত্রিম আলো কোনো কোনো মথ ও মাকড়সার প্রজনন আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে পরাগবাহীর সংখ্যা কমে গেলে উদ্ভিদের বংশবিস্তার ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। এমনকি রাতের কৃত্রিম আলো পরিযায়ী পাখিদের পথও বিভ্রান্ত করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে বীজ ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>