জাতীয়

রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত সমাধান কোথায়?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট হলো রোহিঙ্গা সমস্যা। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ যে দরজা খুলে দিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়; কিন্তু প্রায় এক দশক পরও সংকটের টেকসই সমাধান অনিশ্চিত। প্রশ্ন উঠছে- সমাধানের রূপরেখা কোথায় এবং কে তা বাস্তবায়ন করবে? ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এই সংকটের সমাধান নিহিত রয়েছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিকত্ব আইন এবং দেশটির সরকারের অনীহার মধ্যে। ফলে এর স্থায়ী সমাধানও সম্ভব কেবল মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু গত নয় বছর ধরে আমরা দেখছি, জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা এবং এনজিও প্রতিনিধিরা নিয়মিত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন। এসব পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ প্রকাশ এই সংকটের মূল কারণকে স্পর্শই করতে পারছে না। এতে লাভবান হচ্ছে মূলত বিদেশি তহবিলনির্ভর বিভিন্ন সংস্থা। আর ক্ষতির ভার বহন করছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও সার্বভৌমত্ব। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান রয়েছে মিয়ানমারে। কারণ, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা এবং তাদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করেছে সে দেশের সামরিক জান্তা। অতএব, এ সমস্যার সমাধানও করতে হবে মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে, কার্যকর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে। যা আমরা বার বার বলে আসছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, সমস্যাটি যেন বাংলাদেশের সৃষ্টি। জাতিসংঘের মহাসচিব, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রতি বছর কক্সবাজারের ক্যাম্পে আসেন। তাঁরা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা শোনেন, ছবি তোলেন, উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কিছু আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ফিরে যান। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের যে কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, তা মূল সংকটের সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। পারবেও না। এই সংকট বিদেশি নানা সংস্থার অর্থ উপার্জন বা ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের এসব প্রতীকী ক্যাম্প পরিদর্শন মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। মূল সমস্যা—অর্থাৎ মিয়ানমারের অনীহা—উপেক্ষা করে কেবল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি বা ক্যাম্প পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বর্তমান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। এটা এখন সচেতন নাগরিকদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। মূলত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একমাত্র কার্যকর পথ হলো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দৃঢ়, বাস্তবসম্মত এবং ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। এ প্রক্রিয়ায় চীন, ভারত কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু গত নয় বছরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কয়েক দফা প্রত্যাবাসন চুক্তিতে সই করলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি। রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সমাধানের রূপরেখা হতে হবে বহুমাত্রিক—কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তার সমন্বিত কাঠামো। আমাদের সরকার যখনই আন্তর্জাতিক মহলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়েছে, তখনই দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি দুর্বল হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়া বা নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হওয়া তুলনামূলক সহজ; কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে কার্যকর আলোচনার টেবিলে এনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করা অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের আনুষ্ঠানিক সফরের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি মিয়ানমার এবং দেশটির প্রধান সমর্থক রাষ্ট্রগুলোর—বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার—সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক দরকষাকষি জোরদার না করে, তাহলে এ সংকটের রাজনৈতিক সমাধান অধরাই থেকে যাবে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির এই স্থবিরতাই প্রমাণ করে, আমরা সমস্যার মূল কারণের পরিবর্তে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েই বেশি ব্যস্ত। বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি এবং সীমান্ত পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। তবুও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। বহুপাক্ষিক ফোরামে ইস্যুটি অগ্রাধিকার দেওয়া, আন্তর্জাতিক জনমত সক্রিয় রাখা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান জোরদার করা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কার্যক্রমও সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে সামাজিক টানাপোড়েন কমে। সবচেয়ে বড় কথা, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সমাধানের রূপরেখা হতে হবে বহুমাত্রিক—কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তার সমন্বিত কাঠামো। সমাধানের রূপরেখা নির্ধারণে কয়েকটি স্তর বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, সময়বদ্ধ ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা। রাখাইনে নিরাপদ অঞ্চল তৈরি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি এবং নাগরিকত্ব ও অধিকার-স্বীকৃতির স্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক কূটনীতি জোরদার করা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। আঞ্চলিক সংলাপ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর সমন্বিত চাপ তৈরি করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তী সময়ে পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা। দাতা দেশগুলোর সহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্পে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবায় সংকোচন দেখা দিচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে হতাশা ও অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। একটি শিক্ষাবঞ্চিত ও কর্মহীন প্রজন্ম শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়; তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই অর্থায়নকে স্বল্পমেয়াদি সহানুভূতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। লেখক : সাংবাদিক। এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>