বিজ্ঞাপন
২৪ আগস্ট ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে কয়েকজন বিপথগামী পুলিশের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন কিশোরী ইয়াসমিন। এ ঘটনায় দোষীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে ফুঁসে উঠেন দিনাজপুরের সর্বস্তরের জনগণ। এরপর থেকে এই দিনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের ৩১ বছর পার হলে এখনো নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা। নারী নির্যাতনের বিচার সঠিকভাবে না হওয়া ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেঁচে যাওয়ায় নারী নির্যাতন বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট জেলার কাহারোল উপজেলার দশমাইলের অদূরে সাধনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কতিপয় বিপথগামী পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার হন তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী কিশোরী ইয়াসমিন। শুধু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হননি কিশোরী ইয়াসমিন, পরদিন স্থানীয়রা মরদেহ উদ্ধার করলে পুলিশ বলে, মরদেহটি একজন পতিতার। এতে ক্ষোভ তৈরি হয় দিনাজপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে। শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। আন্দোলনের একপর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বিনা উসকানিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে সামু, কাদের, সিরাজসহ সাতজনকে হত্যা করে। আহত হয় তিন শতাধিক আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষ।
নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩১ বছর পার হলে এখনো নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি। গত ১ আগস্ট রাতে দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার ৭ নম্বর বিজোড়া ইউনিয়নের বিজোড়া (সুতারপাড়া) গ্রামে স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার শ্যামলীকে (৫০) প্রথমে কুপিয়ে ও পরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে হত্যা করেন তার স্বামী মাহবুবুর রহমান। পরে পুলিশ ঘাতককে গ্রেফতার করে। গত ১৭ আগস্ট দিনাজপুর সদর উপজেলার মুরাদপুরের হাজীপাড়ায় পারিবারিক কলহের জেরে কানিজ ফাতেমা (৪৩) নামে এক নারীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি সহিংসতা, হামলাসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে।
দিনাজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা, নির্যাতনের মামলা হয়েছে ২১০টি। শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯৫টি। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে চার হাজারের অধিক মামলা চলমান।
কিশোরী ইয়াসমিন স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ
এদিকে দিনাজপুর জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসে লিগ্যাল এইড অফিসে ১৯২টি অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। যার মধ্যে ৮৬টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
সঠিক বিচার না হওয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না বলে দাবি করেন মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কানিজ রহমান। তিনি বলেন, ‘আজ সারাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হলেও দিনাজপুরে পালিত হচ্ছে ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস। ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩১ বছরেও সমাজে এখনো নারীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মূলত আইনের সঠিক প্রয়োগ ও আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে দ্রুত জামিনে বের হয়ে যাওয়ায় নারীর প্রতি নির্যাতন বেড়েছে। চাঞ্চল্যকর রামিসা হত্যা মামলার বিচার হয়েছে। কিন্তু সেই বিচারের রায় কার্যকর হয়নি।’
এদিকে ২০২৪ সালের ৩ মে রাতে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হয় ইয়াসমিনের মা শরীফা বেগমের।
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে দশমাইল মোড়ে অবস্থিত ইয়াসমিনের স্মৃতিসৌধে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করা কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, ইয়াসমিনের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি মহিলা পরিষদ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
যেভাবে ঘটেছিল ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ভোরে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী হাছনা এন্টারপ্রাইজ নৈশ কোচের সুপারভাইজার ১৮ বছর বয়সী ইয়াসমিন নামে এক তরুণীকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামিয়ে দেয় এবং এক চায়ের দোকানদারকে বলে, সকাল হলে তরুণীটিকে যেন দিনাজপুর শহরগামী বাসে উঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেখানে পৌঁছে নৈশ টহল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান। পুলিশ সদস্যরা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে থাকা তরুণী ইয়াসমিনকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে, একপর্যায়ে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে জোরপূর্বক পুলিশ ভ্যানে তুলে নেয়। এরপর তারা দশমাইল সংলগ্ন সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে দিনাজপুর শহরের রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে রাস্তার ধারে মরদেহ ফেলে রেখে চলে যায়।
এ ঘটনায় দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে দোষীদের শাস্তি দাবি করা হয়। ২৬ আগস্ট রাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে। ২৭ আগস্ট সকাল থেকে প্রতিবাদী মানুষে শহরে মিছিল বের করে। দুপুর ১২টার দিকে কয়েক হাজার জনতা মিছিল সহকারে দোষীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিতে যায়। এ সময় পুলিশ বিনা উসকানিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে সামু, কাদের, সিরাজসহ সাতজনকে হত্যা করে। আহত হয় তিন শতাধিক মানুষ। শহরের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে ১৪৪ ধারা (কারফিউ) জারি করা হয়। শহরে নামানো হয় তৎকালীন বিডিআর। দিনাজপুর থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ ১৩ উপজেলার সব পুলিশকে একযোগে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনায় তিনটি আদালতে ১২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মঈনুল, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মণের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান ‘৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেন। আলামত নষ্ট, সত্য গোপন ও অসহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এএসআই মঈনুলকে আরও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
অন্যদিকে দণ্ডবিধির ২০১/৩৪ ধারায় আলামত নষ্ট, সত্য গোপন, অসহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত আসামি দিনাজপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেব, ডা. মহসীন, এসআই মাহতাব, এসআই স্বপন চক্রবর্তী, এসআই জাহাঙ্গীর, এএসআই মতিয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের খালাস দেন।
চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় ৮ বছর পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে মামলার অন্যতম আসামি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার বিশ্রামপাড়ার জসিমউদ্দীনের ছেলে এএসআই মইনুল হক, নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চন্দনখানা গ্রামের এসএম খতিবুর রহমানের ছেলে কনস্টেবল আব্দুস সাত্তারকে রংপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে মামলার অন্য আসামি নীলফামারী সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের লক্ষ্মীকান্ত বর্মণের ছেলে পুলিশের পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মণকে রংপুর জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।
এমদাদুল হক মিলন/কেজে/জেআইএম
বিজ্ঞাপন