এ যেন শতবর্ষ পেছনে ফিরে যাওয়া এক সন্ধ্যা! একদল গানেই ছুড়ে দিচ্ছে প্রশ্ন, প্রতিপক্ষ দল তার উত্তর দিচ্ছে সুরে-ছন্দে। কখনো ব্যঙ্গ, কখনো হাস্যরস, কখনো তর্ক; এর সঙ্গে অভিনয় আর বাদ্যের মিশেল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে যেন ফিরে এসেছিল শতবর্ষ আগের বাংলার লেটোর আসর। যে আসরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিশোর কাজী নজরুল ইসলামের কবি ও শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প।
নজরুল বর্ষ উদ্যাপনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করে বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘নজরুলের লেটোগান ও কবিগান’। বহুল পরিচিত গান-কবিতার বাইরে নজরুলের সৃষ্টির লোকায়ত একটি অধ্যায় দর্শকের সামনে তুলে ধরাই ছিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
আয়োজনটি তাই শুধু বাংলার পুরোনো দুটি লোকধারাকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; পরিচিত নজরুলের আড়ালে থাকা আরেক নজরুলকেও সামনে এনেছে। সেই নজরুল কৈশোরে লেটোর আসরে গান বেঁধেছেন, পালা লিখেছেন, অভিনয় করেছেন, প্রতিপক্ষকে ছন্দে জবাব দিয়েছেন। এই লোকায়ত পাঠশালার অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর কবি ও সংগীতস্রষ্টা হয়ে ওঠার ভিত তৈরি করেছিল।
যে নজরুলকে কম জানা
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ‘কাজী নজরুল ইসলামের লেটোগান ও কবিগান: লোকঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও বিদ্রোহী চেতনার উৎসসন্ধান’ শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠ করেন সরকারি সংগীত কলেজের লোকসংগীত বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক কমল খালিদ।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন নজরুলের কৈশোরের এই অধ্যায়ের দিকেই দৃষ্টি ফেরান। তাঁর ভাষ্যে, নজরুল লেটোগান করতেন—এ তথ্য অনেকের জানা; কিন্তু লেটোগান আসলে কী এবং কবির পরবর্তী সৃষ্টিজীবনে এর প্রভাব কতটা গভীর, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানাশোনা তুলনামূলক কম। রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘নজরুলের একটা দিক এখনো খুব বেশি করে আমরা জানি না, সেটা হলো তাঁর কৈশোর। তিনি লেটোগান করতেন, আমরা জানি; কিন্তু লেটোগানটা কী—তা আমরা অনেকে জানি না।’ লেটোগানের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, এতে নাটক থাকে, নানা ধরনের বক্তব্য থাকে। একটি দল কোনো বক্তব্য তুলে ধরলে অন্য দল এসে তার জবাব দেয়। তর্ক, পাল্টা তর্ক ও পরিবেশনার এই ধরন মানুষ কৌতূহল নিয়ে উপভোগ করত।
রেজাউদ্দিন স্টালিনের বক্তব্যে উঠে আসে, লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় নজরুলকে শুধু গান জানলেই চলত না, প্রতিপক্ষের সঙ্গে গানের লড়াইয়ে নামতে হলে ধর্ম, পুরাণ, সমাজ ও নানা বিষয়ে জানাশোনা থাকতে হতো। কারণ, প্রতিপক্ষের প্রশ্ন বা বক্তব্যের জবাব দিতে হতো তখনই, অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে।
রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, লেটো দলে থাকার কারণে নজরুলকে মহাভারত, বেদ, পবিত্র কোরআনসহ নানা বিষয় জানতে হয়েছে। ‘কবির লড়াই’-এ ভুল তথ্য দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁর মতে, এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই কবিতা ও গান নজরুলের জীবনাচরণের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে পরবর্তী সময়ে তিনি অত্যন্ত দ্রুত গান রচনা করতে পারতেন।

নজরুলের জীবন নিয়ে গবেষণাতেও এই সময়ের গুরুত্ব পাওয়া যায়। তাঁর কবি ও শিল্পীজীবনের শুরু লেটো দল থেকেই। সেখানে অভিনয় ও পালা রচনার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক গান-কবিতা তৈরির যে অনুশীলন হয়েছিল, তা তাঁর পরবর্তী বহুমুখী সৃষ্টিজীবনের ভিত গড়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিল।
কথা প্রসঙ্গে রেজাউদ্দিন স্টালিন নজরুলের আরেকটি নাট্যরচনা ‘হারাধনের বিয়ে’ দেখার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। তাঁর কাছে রচনাটির হাসি, কান্না, বিরহ, প্রেম ও দ্রোহের মিশেল বিশেষভাবে ধরা দিয়েছে। তাঁর ভাষ্যে, এসবের মধ্যেই নজরুলের জীবনের মূল সুর খুঁজে পাওয়া যায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক মেহবাজীন রহমান।
মঞ্চে ফিরল ‘অন্ধরাজা’
আলোচনা শেষ হতেই বদলে যায় মিলনায়তনের আবহ। তত্ত্ব ও ইতিহাসের আলোচনা থেকে দর্শক এবার সরাসরি প্রবেশ করেন লেটোগানের জগতে। সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতে পরিবেশিত হয় নজরুলের লেটোগান ‘অন্ধরাজা’। পরিচালনা ও রূপায়ণে ছিলেন কমল খালিদ। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সায়মা আহমেদ। পরিবেশনায় অংশ নেয় ‘নিমশা লেটো দল’ ও ‘মেদেনীপুর লেটো দল’।
গান, সংলাপ, অভিনয় ও বাদ্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে পরিবেশনা। লেটোগানের বৈশিষ্ট্যই এমন—এখানে গান কোথায় শেষ হচ্ছে আর অভিনয় কোথায় শুরু হচ্ছে, তা আলাদা করা কঠিন। একটি অন্যটির সঙ্গে মিশে তৈরি করে সামগ্রিক পরিবেশনা। ব্যঙ্গ-রসিকতা, কথার পিঠে কথা আর গানের মধ্য দিয়ে বক্তব্য তুলে ধরার সেই পুরোনো ধরনই মঞ্চে তুলে ধরেন শিল্পীরা।

গানে গানে ‘কবির লড়াই’
‘অন্ধরাজা’র পর মঞ্চে আসে নজরুল রচিত ‘কবির লড়াই’। পরিচালনা ও রূপায়ণ করেন জীবন চৌধুরী। কবিয়াল জীবন চৌধুরীর সঙ্গে গানে গানে লড়াইয়ে নামেন কবিয়াল গুমানী বাবু। এই পর্বে কথার লড়াই চলে গানে। এক কবিয়াল প্রশ্ন, কটাক্ষ কিংবা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, প্রতিপক্ষ কবিয়াল তার উত্তর দেন গান বেঁধে। প্রশ্ন-উত্তর, যুক্তি-পাল্টাযুক্তি আর ছন্দের এই লড়াইয়ে দর্শকের মনোযোগও থাকে দুই পক্ষের পরবর্তী জবাবের দিকে।
নজরুলের কৈশোরের লেটোপর্বের সঙ্গে এই ‘কবির লড়াই’-এর যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এমন আসরেই তাৎক্ষণিকভাবে ছন্দ ও গান তৈরি এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে নজরুলের লেখায় যে তীক্ষ্ণ প্রত্যুত্তর, ব্যঙ্গ, প্রশ্ন ও প্রতিবাদের ভাষা দেখা যায়, তার শুরুর সময়টির দিকে তাকালে লেটোর এই জগতের কথাও সামনে আসে।
বৃহস্পতিবারের পরিবেশনায় জীবন চৌধুরী ও গুমানী বাবুর পাশাপাশি ছিলেন বাবুল হোসাইন ও মামুন হোসাইন। দোহার হিসেবে অংশ নেন শান, সৈয়দ মাসুমুর রহমান, জয়ন্ত বিকাশ দাস, মাহমুদা আক্তার রুপা, আরবী ইসলাম স্বর্ণা, জান্নাত আরা শ্যামলী, অনন্যা রায় ও নারায়ণ দেব। তবলায় ছিলেন তুষার কান্তি সরকার, বাঁশিতে মো. নয়ন, ঢোলে আকাশ কবির এবং খঞ্জনি ও মন্দিরায় মো. সোহেল মিয়া।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি দেখতে এসেছিলেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দর্শক। একাডেমির ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলেও সরাসরি সম্প্রচার করা হয় অনুষ্ঠানটি।

এর দুই দিন আগে, মঙ্গলবার শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয় নজরুলের দুটি লেটো নাটক—‘সুদখোর ব্রজেন মুখার্জি’ ও ‘বিলাতী ঘোড়ার বাচ্চা’। জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে ‘কবির স্মরণে, কবির চরণে’ শিরোনামে নাটক দুটি মঞ্চে আনে থিয়েটার ’৫২। একই সপ্তাহে দুই ভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এভাবেই আলোয় আসে নজরুলের অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত সৃষ্টির এই অধ্যায়।

গান-কবিতার বহুল পরিচিত নজরুলের বাইরে বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যা যেন চিনিয়েছে অন্য এক নজরুলকে। গান, অভিনয়, তর্ক আর ছন্দে ফিরে এসেছে চুরুলিয়ার সেই কিশোরের দিনগুলো—যিনি লেটোর আসরে গান বেঁধেছেন, অভিনয় করেছেন, গানে গানে প্রতিপক্ষের জবাব দিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার ছাপ পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বহুমুখী সৃষ্টিতে। শতবর্ষ পেরিয়ে শিল্পকলার মঞ্চে তাই ফিরে দেখা গেল কবি হয়ে ওঠার আগের নজরুলকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>